বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী লাইব্রেরিয়ান নিয়োগে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিয়ে বিপাকে পড়েছে শিক্ষা প্রশাসন। এ কারণে এমপিও প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত বেসরকারি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করা সনদগুলোর বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দারুল ইহসান ভার্সিটি থেকে লাইব্রেরি সাইন্সে ডিপ্লোমা বা এমএ ডিগ্রি নিয়ে যারা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ পেয়ে এমপিওর জন্য আবেদন করেছেন তাদের এমপিও দেয়া হবে কিনা তা নির্ভর করবে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর। তথ্য অনুযায়ী দেশে ভিন্ন ভিন্ন চারটি গ্রুপের মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে শতাধিক শাখা। অভিযোগ রয়েছে, কোন ক্লাস-পরীক্ষা না নিয়েই টাকার বিনিময়ে লাইব্রেরি সাইন্সের সনদ বিতরণ করছে। এখন কোন আবেদন সঠিক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সনদ বাণিজ্যের অভিযোগে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে মন্ত্রণালয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হলে সেখান থেকে বলা হয়, আদালতের আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়টি চলার কারণে বন্ধ করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন জানিয়েছে, দারুল ইহসানের একমাত্র ধানমন্ডি শাখা ছাড়া আর কোন শাখার বৈধতা নেই। তবে দারুল ইহসান ২৯টি শাখার কার্যক্রম আদালতের আদেশ নিয়ে চালাচ্ছে।
আবেদনকারী একজন জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় দারুল ইহসান ভার্সিটি চালানোর সুযোগ দেবে; কিন্তু ওখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে যোগদানের পর সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে এটা অযৌক্তিক। যদি দারুল ইহসান ভার্সিটি অবৈধ হয়ে থাকে তবে সরকার কেন বন্ধ করছে না ?
আবেদনকারীদের সংযুক্ত সনদগুলোর ৭১৬টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ৪ হাজার ৬৮৫টি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের। এর মধ্যে ৫২০টি লাইব্রেরি সাইন্সের ডিপ্লোমার সনদ যাচাইয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। যাচাইয়ের জন্য পাঠানো এসব সনদের অধিকাংশই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের এমপিও যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক প্রাথমিকভাবে ভুয়া বা জাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গত মাসে। কিছু আছে যেগুলোর রেজাল্ট ইন্টারনেটে নেই সেগুলো প্রাথমিক যাচাইয়ে ভুয়া বা জাল সন্দেহ হয়নি। সব মিলিয়ে ৫২০টি সনদ অধিকতর যাচাই করতে পাঠানো হয়েছে। যেগুলো ভুয়া বা জাল চিহ্নিত হবে সেগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় লিখিতভাবে জানিয়ে দেবে শিক্ষা অধিদফতরকে । দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধানমন্ডি শাখার ১৭১টি সনদ প্রাথমিক যাচাইয়ে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
লাইব্রেরিয়ানদের এমপিওভুক্তিতে প্রয়োজনীয় টাকা ছাড় করে অর্থ মন্ত্রণালয় জানুয়ারি মাসে চিঠি লিখেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে এমপিওর জন্য আবেদন করেছেন কয়েক হাজার। এদের কেউ কেউ নিয়োগ পেয়েছেন ২০১০ সালে, কেউ ২০১১ ও ২০১২ সালে। দীর্ঘদিন এসব আবেদন পড়েছিল শিক্ষাভবনে।
প্রকৃত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় কোনিট
২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কাজী এবাদুল হকের সমন্বয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সুপারিশ করে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি অর্থের বিনিময়ে সনদ বিক্রি করছে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের বিভিন্ন ধারা লংঘন করেছে । তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ধানমন্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি সরকারের সাময়িক অনুমোদন পায় ১৯৯৩ সালে। তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দারুল ইহসান ট্রাস্ট নামে ট্রাস্টি বোর্ড ছিল। ট্রাস্টের সেক্রেটারি ছিলেন সৈয়দ আলী নকী ও সদস্য ছিলেন ছয়জন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ২০০৭ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক আউটার ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ জারি করার পর ২০০৬ সালের ২ এপ্রিল সংঘ স্মারক নিবন্ধনের মাধ্যমে গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী নকী হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করেন। এর মাধ্যমে তারা ২৯টি আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনা সম্পর্কে স্থগিতাদেশ লাভ করে বিভিন্ন স্থানে ৩৩টি আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনা করে। ঐ স্থগিতাদেশের সুযোগ গ্রহণ করে অপর ৩টি ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত ৩টি ক্যাম্পাস বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৭০টি আউটার ক্যাম্পাস চালাচ্ছে । এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোন স্থগিতাদেশ না থাকার ফলে তা চালানো বেআইনি। ২টি ট্রাস্টি বোর্ডের রিট পিটিশনে প্রদত্ত আদালতের আদেশের মাধ্যমে ২টি ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত হচ্ছে এবং তাদের নিযুক্ত দুই ব্যক্তি ভিসি পদের দায়িত্ব পালন করছেন।
গত বছরের ৫ এপ্রিল মাউশির সহকারী পরিচালক স্বাক্ষরিত পত্রে ইউজিসির কাছে সনদ সঠিক কি-না জানতে চাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জবাব ছিল—কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত সনদ সঠিক কি-না ইউজিসি থেকে যাচাই করা হয় না। এ ব্যাপারে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এরপর ইউজিসি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা উল্লেখ করে বাড়ি ২১ (নতুন), রোড নং ৯/এ নতুন ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২০৯।
