রপ্তানির আড়ালে বাংলাদেশ থেকে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করে দিচ্ছে একটি চক্র। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে (ইপিবি) পণ্য রপ্তানির রেকর্ড থাকলেও এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে আসছে না। চলতি অর্থবছরের (২০১২-২০১৩) প্রথম ছয়মাসে রপ্তানির বিপরীতে ৩২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার দেশে আসেনি। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুধু এ সময়েই নয়, দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়াটি চলে আসছে রপ্তানি খাতে। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এ কাজটি করে আসলেও নানা ছল-চাতুরির কারণে তাদের ধরা যাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, দেশ থেকে কি পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয় তার একটি হিসাব রাখে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবি। সে রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশে আসা অর্থের হিসাব থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। যেসব বাণিজ্যক ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি হয় কেন্দ ীয় ব্যাংক সেসব ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।
ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসে মোট এক হাজার ২৫৯ কোটি ৯৭ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। কেন্দ ীয় ব্যাংকের হিসাবে এর বিপরীতে বাংলাদেশে অর্থ এসেছে ৯৩৬ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। অর্থাত্ ৩২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার বাংলাদেশে আসেনি।
রপ্তানির অর্থ বাংলাদেশে না আসার কারণ সম্পর্কে রপ্তানিকারকরা সুনির্দিষ্ট কোন কথা বলেননি। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু অসাধু রপ্তানিকারক নানা অজুহাতে এ অর্থ দেশে আনেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন রপ্তানিকারক উদাহরণ দিয়ে বলেন, অর্থ দেশে ফিরিয়ে না আনার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি উপায় আছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আমদানিকারক এবং রপ্তানিকারক একই ব্যক্তি হওয়া। যেমন বাংলাদেশ থেকে ‘ক’ নামের একটি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে ‘খ’ নামক কোম্পানির কাছে পণ্য রপ্তানি করবে। এক্ষেত্রে ‘খ’ কোম্পানির মালিক ‘ক’ কোম্পানির মালিকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এর ফলে নানা অজুহাতে বাংলাদেশি কোম্পানির কাছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অর্থ পাঠান না। অথচ বাংলাদেশে অর্থ না আসলে ‘ক’ কোম্পানির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক, ইপিবিসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করা হয়। এতে মনে হয়, ‘খ’ কোম্পানি এ অর্থ আটকে দিয়েছে।
অপরদিকে, রপ্তানির বিপরীতে অর্থ না আসার জন্য কেউ কেউ আবার শিপিং এজেন্টকে দায়ী করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এ ধরনের বেশ কয়েকটি অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগে বলা হয়, রপ্তানিকারকের অনুমোদন ছাড়া আমদানিকারকের বিপরীতে পণ্য খালাস করে দেয়া হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা জানান, পণ্য রপ্তানি করার পর অনেক সময় আমদানিকারক সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিষয়ে নানা ধরনের অভিযোগ তোলে। বিশেষ করে পণ্যের মান খারাপ, প্যাকিং লিস্টের সাথে পণ্যের মিল নেই— ইত্যাদি। এসব অভিযোগ তুলে অনেক সময় অর্থ আটকে দেয়া হয়।
জানা গেছে, রপ্তানিকৃত পণ্যের অর্থ দেশে না এনে অনেকে তা বিদেশের ব্যাংকে জমা রাখেন। এ অর্থ দিয়ে উদ্যোক্তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কারখানা গড়ে তুলেছেন। জানা গেছে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় নীটওয়্যার কারখানার মালিক একজন বাংলাদেশি। তবে বাংলাদেশ থেকে তিনি কিভাবে অর্থ নিয়ে ওই কারখানা গড়ে তুলেছেন- তা জানা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই কোম্পানির নামে কোন অর্থ ভিয়েতনামে নেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়নি। শুধু ভিয়েতনাম নয়, পাকিস্তান, দুবাই, রাশিয়া, সৌদিআরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা কারখানা গড়ে তুলেছেন। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন বিভাগে এসব দেশে কারখানা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিয়ে যাবার আবেদনই পড়েনি।
রপ্তানিকারকরা তাদের মোট রপ্তানিমূল্যের ১০ শতাংশ আলাদা একাউন্টে রাখতে পারেন। সাধারনত: বিদেশে বাজার উন্নয়নের জন্য অফিস, আপ্যায়ন ইত্যাদি খাতে এ অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী যে অর্থ রপ্তানিকারকরা বাইরে রাখেন, তার পরিমাণ একেবারেই কম। ছয়মাসে এটা ৩২৩ কোটি ডলার হতেই পারে না।
এদিকে শুধু চলতি অর্থবছরেই নয়, গত অর্থবছরেও একই অবস্থা দেখা গিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইপিবির হিসাবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসে যে ৩২৩ কোটি ডলার বাংলাদেশে আসেনি তার অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের। এর পরিমাণ ২০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এ বিষয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রাক্তন এবং বর্তমান কয়েকজন নেতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
