পাকিস্তানের জলিল চাচা বা ভারতের সুধীর চৌধুরীর মতোই বিশ্ব ক্রিকেটের পরিচিত মুখ পার্সি আবেসেকেরা। ক্রিকেটের ‘খ্যাপাটে দর্শক’ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা জলিল বা সুধীরের চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয়। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট হলেই বাউন্ডারির পাশে তাকে দেখা যায়। একটা পতাকার ছায়ায় ব্যাটসম্যানদের একটু এগিয়ে দেন বা আউট হলে এগিয়ে নিয়ে আসেন। আবেসেকেরার কাছ থেকে সম্মানটা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের জন্যই বরাদ্দ থাকে।
গতকাল বিকালে কলম্বোর রনসিংহে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে একটু অন্যরকম দৃশ্য দেখা গেল। ‘সেরা বাংলাদেশি খেলোয়াড়’-এর পুরস্কার নিয়ে মুশফিকুর রহিম যখন ফিরে আসছেন; তাকে এগিয়ে আনতে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন আবেসেকেরা! শ্রীলঙ্কানরা তাহলে মুশফিককে বাড়তি সম্মান দেয়া শুরু করেছে?
শুধু মুশফিক নন; বাড়তি সম্মান আসলে পেতে শুরু করেছে পুরো বাংলাদেশ দলই। কাল কলম্বো টেস্ট শেষে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের কথায় একটা ব্যাপার বোঝা গেল—টেস্টের ফলাফল যাই হোক, শ্রীলঙ্কানদের নজরে বাংলাদেশ অন্য এক উচ্চতায় উঠে গেছে।
গল টেস্ট ড্রয়ের পর কলম্বো টেস্টে কাল ৭ উইকেটে হেরে গেল বাংলাদেশ। রঙ্গনা হেরাথ ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করে, কুমার সাঙ্গাকারা নিজের অভাবনীয় ফর্ম ধরে রেখে বাংলাদেশকে ছিটকে দিলেন এই ম্যাচের লড়াই থেকে। ম্যাচ সেরা হলেন হেরাথ, সিরিজ সেরা হলেন সাঙ্গাকারা। তারপরও সাঙ্গাকারাই রায়টা দিলেন বাংলাদেশ সম্পর্কে, ‘বাংলাদেশ আসলেই বদলে গেছে। তারা খুব দ্রুত উন্নতি করছে। এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, আমরা এই দু টেস্টেই বাংলাদেশের পারফরম্যান্স দেখে বিস্মিত হয়েছি।’ বাংলাদেশকে দেখছেন দলটির টেস্টের প্রায় শুরুর সময় থেকে, নিজে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রায় হাজার দেড়েক রান করেছেন; ফলে বাংলাদেশ উন্নতি করল কি না, এ বিষয়ে সাঙ্গাকারার সার্টিফিকেট দেয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। আসলে সাঙ্গাকারার সার্টিফিকেটের দরকারও নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রবল শক্তিশালী দলের বিপক্ষে নিজেদের মাটিতে পরপর দুটি টেস্টে জয়ের কাছাকাছি যাওয়ার পর গল টেস্টের অভাবনীয় ব্যাটিংই বলে দেয় উন্নতির ধারায় আছে বাংলাদেশ।
গল টেস্টে উন্নতিটা একেবারে সাদা চোখেই বোঝা গেছে। মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরি, আশরাফুলের ১৯০ রানের ইনিংস, নাসির হোসেনের প্রথম সেঞ্চুরি এবং মোমিনুলের অভিষেক ফিফটিই বলে দিচ্ছিল সব। পরে ফলাফল হিসেবেও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে; কার্যত বড় শক্তির টেস্ট দলের বিপক্ষে প্রথম পাঁচদিন খেলে ড্র করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু কলম্বো টেস্টে ফলাফলটা বলছে, এখানে আর উন্নতি ধরে রাখতে পারেনি মুশফিকুরের দল। এখানেই স্কোরবোর্ডের ভ্রান্তি।
সাঙ্গাকার তার কথোপকথনে চোখে আঙ্গুল দিয়েও এই হারা টেস্টে বাংলাদেশের দাপটটা বোঝালেন। বললেন, ম্যাচের তৃতীয় দিন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশ ম্যাচে একই অবস্থায় ছিল; এতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের দাপটটা। একই কথা বললেন এই ম্যাচে ১২ উইকেট নেয়া রঙ্গনা হেরাথ, ‘কাল (পরশু) যখন ওদের স্কোর বিনা উইকেটে ৯১ বা ২ উইকেটে ১৪৩ ছিল; তখন পর্যন্ত খেলা একেবারেই ভারসাম্যপূর্ণ ছিল।’ যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একসময় দ্বিতীয় দিনে, এমনকি কোনো কোনো সময় প্রথম দিনেও ফলাফল ঠিক হয়ে যেত; তাদের বিপক্ষে কলম্বোর মতো স্পোর্টিং উইকেট ও প্রতিকূল আউটফিল্ডে বাংলাদেশ তিনদিন লড়াইয়ে ছিল, এটাই বা কম কীসে!
কলম্বো টেস্টটা ফিরে দেখতে গেলে দেখা যাবে, প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ বাজে ব্যাটিং করার পর শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ের সময়ই প্রবল প্রতাপে ফিরে এসেছিল। বাংলাদেশ ২৪০ রানে অলআউট হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার ৪ উইকেট ফেলে দিয়েছিল তারা ৬৯ রানে। এরপর সাঙ্গাকারা ও চান্দিমাল দুটো সেঞ্চুরি করে ম্যাচ বের করে নিয়ে গেলেন। আবার ব্যাট হাতে ফিরে এসেছিল বাংলাদেশ। তামিম ইকবালের ফিফটি ও জহুরুলের ‘সাবেকী’ ব্যাটিংয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিজেদের সেরা উদ্বোধনী জুটিটা করেছিল। এমনকি গতকাল সকালে মোমিনুল ও মুশফিক যখন তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করলেন ৪ উইকেটে ১৫৮ রান নিয়ে তখনও স্বপ্ন দেখতে পারত বাংলাদেশ। কিন্তু দুজনই সেট হয়েও আউট হয়ে যাওয়ায় আপাতত শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের স্বপ্ন।
তবে বাংলাদেশের কৃতিত্ব এই যে, এই জয়ের স্বপ্ন শেষ হওয়ার ভেতর দিয়ে নতুন একটা যুগের স্বপ্ন অন্তত দেখতে পারছে তারা।
স্কো র কা র্ড
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৪০
শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংস: ৩৪৬
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ১৫৬/৪। মমিনুল ৩৬*, মুশফিক ৭*(তৃতীয় দিন শেষে)
মমিনুল ক করুনারত্নে ব হেরাথ ৩৭
মুশফিক ক ম্যাথিউস ব হেরাথ ৪০
নাসির ব হেরাথ ০
সোহাগ ক লাকমল ব হেরাথ ২৬
আবুল হাসান অপরাজিত ২৫
রুবেল ব দিলশান ৭
রবিউল ব এরাঙ্গা ১০
অতিরিক্ত (বাই ১, লেগ বাই ৪, নো বল ৪) ৯
মোট (১০০.৪ ওভার, অলআউট) ২৬৫
উইকেট পতন: ১-৯১ (তামিম), ২-৯৬ (আশরাফুল); ৩-১৪৩ (জহুরুল), ৪-১৪৩ (মাহমুদুল্লাহ), ৫-১৬০ (মমিনুল), ৬-১৭১ (নাসির), ৭-২০২ (সোহাগ), ৮-২২৮ (মুশফিক), ৯-২৩৯ (রুবেল), ১০-২৬৫ (রবিউল)।
বোলিং:
কুলাসেকারা: ১২-০-৩৬-০, লাকমল: ৯-১-২৬-০, হেরাথ: ৩৬-৯-৮৯-৭, দিলশান: ২৫-৪-৬২-১, এরাঙ্গা: ১৫.৪-৩-৩৯-২, ম্যাথিউস: ৩-২-৮-০।
শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় ইনিংস:
করুনারত্নে এলবিডব্লিউ ব রবিউল ১৬
দিলশান ব রবিউল ৫৭
সাঙ্গাকারা ব সোহাগ ৫৫
থিরিমান্নে অপরাজিত ১৩
ম্যাথিউস অপরাজিত ১৩
অতিরিক্ত (বাই ২, লেগ বাই ১, নো বল ৩) ৬
মোট (৩ উইকেট, ৪১.৪ ওভার) ১৬০
উইকেট পতন:
১-৩১ (করুনারত্নে), ২-১২৫ (দিলশান), ৩-১৩৫ (সাঙ্গাকারা)।
বোলিং:
রবিউল: ১১-০-৪২-২, আবুল হাসান: ৪-০-২১-০, সোহাগ: ১৩-১-৪৭-১, রুবেল: ৩-০-১৬-০, নাসির: ৪-০-১১-০, মাহমুদুল্লাহ: ৩-০-১২-০, আশরাফুল: ৩.৪-০-৮-০।
ফল: শ্রীলঙ্কা সাত উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: শ্রীলঙ্কা ১-০ তে জয়ী।
ম্যান অফ দ্য ম্যাচ: রঙ্গনা হেরাথ।
ম্যান অফ দ্য সিরিজ: কুমার সাঙ্গাকারা।
