আমরা যদি বঙ্গবন্ধুকে পেতাম...

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৬
ছোট্টবেলায় সাতই মার্চ কী বুঝতাম না। তবে সেদিন অলিতেগলিতে মাইক ভাড়া করে এনে ফুল ভলিউমে বঙ্গবন্ধু নামের একজনের ভাষণ ছেড়ে রাখা হতো। কী ভাষণ রে বাবা! শুনলেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়! একটু যখন বড় হলাম জানতে থাকলাম বিষয়গুলো। আমাদের আজকের এই দেশটা এমন ছিল না। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের দলবেঁধে স্কুলে যাওয়ার মতন অপরূপ দৃশ্যের দেখা মিলতো না। রঙিন বাতি দেওয়া বিপণিবিতানগুলোর কথা কয়েক দশক আগে আমাদের বাবামায়েরা ভাবতেই পারতেন না। বাংলাদেশ নামের এই দেশটা ছিল পাকিস্তান নামের এক দেশের অধীন, তারা কী নির্মম অত্যাচারই না করেছে আমাদের ওপর! বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন বাঙালির সেই আপনজন যিনি কীনা এই কথাগুলো আমাদের হয়ে প্রকাশ করেছিলেন। আমরা এই প্রজন্ম তাঁকে দেখিনি, শুনেছি আর পড়েছি কিছু কিছু। দুঃখের বিষয় একাধিকবার এই তরুণ প্রজন্মকে দ্বিধাবিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে মিথ্যা ইতিহাস দিয়ে। সময়ের পট পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাস বইয়ের পাতার ছবি পালটেছে। এর পরেও কিছু সত্য চাপা থাকে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাময়িক অস্থিরতার বাইরে গিয়ে দেখলে তাঁর মতো বিশ্বমানের নেতা পাওয়া আমাদের জন্য ছিল পরম সৌভাগ্যের। নেতা অনেকেই হতে পারেন, নেতৃত্বদানের ক্ষমতাও অনেকের থাকতে পারে, কিন্তু এমন নেতা পেয়েছি কজন— যিনি বলবেন— আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না! আমি বাংলার মানুষের অধিকার চাই—সেটা শুধু গালসর্বস্ব বক্তৃতাই ছিল না, ছিল এক ধরনের অঙ্গীকার। তরুণ প্রজন্মের চোখে আজ বাংলাদেশের হাজারটা সমস্যা দৃশ্যমান হতে পারে— হরতাল, জঙ্গিবাদ, যানজট, দারিদ্র্য অথবা রাজনৈতিক অস্থিরতা। এতোকিছুর পরেও আমাদের কিন্তু গর্ব করার মতন অনেক বিষয় রয়েছে। রাত পোহালেই অন্য কোনও দেশের কাছে কতক্ষণ কুপি বেশি জ্বালিয়েছি সেইজন্য কৈফিয়ত দিতে হয় না। সাময়িক অস্থিরতা কখনোই আমাদের মান বিচারের মাপকাঠি হতে পারে না। আর বঙ্গবন্ধু নিজেই অধিকার আদায়ের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন ছিলেন। আর আমাদের এ সময়ের আন্দোলন তো সেই খাতিরেই। তিনি তখন স্কুলের ছাত্র, মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন স্কুলে। শেরে বাংলা সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী, সঙ্গে রয়েছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুলের চাল ফুটো হয়ে পানি পড়ে, ছাত্রদের বই-খাতা ভিজে যায়। তো স্কুল-পড়ুয়া মুজিব সেদিন বই-খাতা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দাবির মুখে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিলেন মন্ত্রী সেদিন। তারুণ্যের এই যে শক্তি, সেটা বুঝি তাঁর সেদিনের কর্মকাণ্ড থেকেই বোঝা যায়। আজকের তরুণদের নবজাগরণ দেখলে তিনি কি খুশি হতেন? পাশে এসে দাঁড়াতেন? তিনি তো এমনটাই চেয়েছিলেন? ঘরে ঘরে অন্যায়ের প্রতিবাদে দুর্গ গড়ে তুলতে বলেছিলেন তিনি। ফিরে তাকাই একাত্তরে ! মুখে জয়বাংলা আর হূদয়ে বঙ্গবন্ধু—একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাঙালির এ দুটিই ছিল মূল অস্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনায় আজ দেশের তরুণ প্রজন্ম জেগে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের এই মহাপুনর্জাগরণে যোগ দিয়েছেন দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ সর্বশ্রেণি-পেশার মানুষ। তারুণ্যের এই মহাউত্থান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে সাহস জুগিয়ে বলছে— ভয় পাবার কিছু নেই। আজ আমরা মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখর করছি চারপাশ। ঠিক তেমনি একদিন সাতই মার্চের ভাষণে সারা জাতিকে এক করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ৭ই মার্চের ভাষণ যুগ যুগ ধরে বাঙালি জাতিকে অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো উজ্জীবিত করে রাখবে। আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রেরণাও একই সূত্রে গাঁথা। কেউ কেউ ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটেনের জনগণকে জার্মানির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিলের ঐতিহাসিক বেতার ভাষণটির সঙ্গে মিল খুঁজে পান। কিন্তু এটি ছিল লিখিত বক্তৃতা। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণ কোনো লিখিত বক্তৃতা নয়, আত্মোপলব্ধি থেকে তিনি এই জয়গান শুনিয়েছেন। এটা ছিল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্বপ্ন, সাধনা, সংগ্রাম ও ত্যাগের ফসল। গত ৪২ বছর ধরেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি আবেগ ধরে রেখেছে, যা সারাবিশ্বেই নজিরবিহীন। বঙ্গবন্ধুর বিশাল নেতৃত্বের সহজাত বৈশিষ্ট্যই ছিল বাঙালি জাতির সঙ্গে তাঁর হূদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলা। জনগণের প্রতি তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল বলেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি তাঁর প্রবল দায়বদ্ধতার কথা ফুটে উঠেছে। আজীবন অসামপ্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই সারাটা জীবন সামপ্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। তবুও মনে হয় আজ যদি তিনি থাকতেন, অনেক কিছুই অন্যরকম হতে পারতো। বাঙালির যুদ্ধ, সন্নিবদ্ধ জাতিসত্তা গঠন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সাহসিকতাপূর্ণ অসাধারণ নেতৃত্ব। আজ ২০১৩ সালেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর আদর্শ, কর্ম, প্রতিটি শব্দ, বাক্য আমাদের জন্য উপযুক্ত ও প্রেরণাদায়ক। আজকে দেশে স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির মধ্যে যে বিরোধ তাতেও তাঁর বক্তব্য আমাদের জন্য নির্দেশনাস্বরূপ। আজকে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অনেকেই এ লেখার বিরোধিতা করে দলিলপত্র নিয়ে হয়তো বঙ্গবন্ধুর কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কথা বলতে আসবেন। আমরা সেই বিচারে যাবো না। একজন যোগ্য নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে দেশটা স্বাধীন করে তিনি আজকে আমাদের বড় গলায় এত কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন! এই এত অবদানের কাছে স্বাধীনতাপরবর্তী কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কথা আমলে এনে সংকীর্ণতার পরিচয় দিতে চায় না তরুণ প্রজন্ম। আজ স্বাধীনতার মাসে তাঁর স্মৃতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার— বঙ্গবন্ধুর অবাস্তবায়িত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যাবো আমরা। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একসূত্রে গাঁথা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সোনার বাংলা গড়াই হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন। স্বাধীনতার এ মাসে জাতির জনকের প্রতি আমাদের গভীর সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ঢাকা