প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা পিরোজপুরে এক জনসভায় বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, এখানে এনে দেখে যান পিরোজপুরবাসী যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বিচার চান। তিনি বলেন, বিরোধী দলের নেত্রীকে হত্যা, রক্তঝরা আর লাশের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। নচেত্ যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টার দায়ে তারও বিচার হবে। আওয়ামী লীগ জনগণের উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। তাই আগামী নির্বাচনে আবারো আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করতে হবে।
তিনি গতকাল বিকালে পিরোজপুরে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় বলেন, আমরা গত নির্বাচনের আগে ওয়াদা করেছিলাম আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেয় এবং আমরা সরকার গঠন করি তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে আমরা করব, বাংলাদেশকে কলংকমুক্ত করব। সংসদে তিন-চতুর্থাংশ আসন নিয়ে আমরা সরকার গঠন করেছিলাম। পাঁচ বছরের জন্য আমরা সরকার গঠন করে একদিকে জনগণের উন্নয়ন করছি অপরদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। আপনারা জানেন এই পিরোজপুরে অনেক কুলাঙ্গার ছিল। যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে আমাদের মা-বোনদের তুলে দিয়েছিল। যারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যারা গণহত্যা চালিয়েছিল তাদেরও বিচার আমরা শুরু করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের বিরোধী দলের নেত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চায়। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য বায়তুল মোকাররম মসজিদে আগুন দিয়েছে, কোরআন শরীফ ও জায়নামাজ পুড়িয়েছে, খতিবকে নামাজ পড়াতে দেয়নি, জুমার নামাজের সালাম ফিরিয়েই সন্ত্রাস করেছে। এটা হচ্ছে জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি। আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করছে। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে কিভাবে আগুনে পুড়িয়ে মারে, নির্দোষ পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আজ বিরোধী দলের নেত্রী বলে আরো অনেক প্রাণহানি ঘটবে। অর্থাত্ তিনি আরো মানুষকে হত্যা করবেন। একদিকে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবেন অপরদিকে তিনি ক্ষমতায় যাবেন রক্তের উপর দিয়ে, লাশের উপর দিয়ে এটাই উনি চান। উনি চেষ্টা করেছিলেন জাতির পিতার হত্যাকারীদের বাঁচাতে। কিন্তু তিনি পারেননি। মা-বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী হানাদার বাহিনীর দোসরদের বাঁচানোর জন্য আজ তিনি পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করছেন। আপনি খুনিদের বাঁচাতে পারবেন না, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো যাবে না। বাংলাদেশের মানুষ চায় ঐ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় জনসভায় উপস্থিত পিরোজপুরবাসীর কাছে জানতে চান কুলাঙ্গার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে কিনা। তখন উপস্থিত হাজার হাজার জনতা দুই হাত তুলে তার প্রতি সমর্থন জানান। তখন তিনি বিএনপির নেত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার প্রিয় যুদ্ধাপরাধী মাওলানা সাঈদীর বিরু্দ্ধে ফাঁসির রায় হয়েছে, এই রায়ে সমর্থন জানিয়েছে পিরোজপুরবাসী। এসে দেখ যান পিরোজপুরবাসী সাঈদীর বিচার চান।’ তিনি দেশবাসীকে উদ্দেশ করে বলেন, পিরোজপুরের মানুষ যদি ফাঁসির রায় কার্যকর চায় তাহলে মানুষ হত্যা কেন। বিএনপির নেত্রীকে বলব আপনি এটা বন্ধ করুন। আর জামায়াতকে বলব আপনাদের ধর্মের নামে রাজনীতি বন্ধ করুন। তারা ইসলামের নামে মিথ্যাচার করে, সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখা যায় বলে ফেসবুকে প্রচার করে, সাঈদীকে দেখায় চাঁদের কলংক বলে। তারা কাবাশরীফের গিলাফ পরিবর্তনের ছবিকে সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন বলে মিথ্যা প্রচার করে। কাবাশরীফ নিয়ে যারা মিথ্যাচার করে ইসলাম ধর্ম নিয়ে অপপ্রচার করে তাদের বিচারের জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১’র নির্বাচন-উত্তর পিরোজপুরে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার হয়েছিল। ঘর-বাড়ি পুড়িয়েছে, মানুষের উপর নির্যাতন হয়েছে। পিরোজপুরের মানুষ গোপালগঞ্জ-টুঙ্গীপাড়ায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। অনেক আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। পিরোজপুরে সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন হয়েছিল। আজকেও তারা সাংবাদিকদের উপর হামলা চালাচ্ছে। ২০০৪ সালে তাদের হুমকি-বাধা-বিপত্তির মুখেও আমি পিরোজপুরে এসে নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, প্রতিবাদ করেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। আমরা চাই ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করুক। আমাদের লক্ষ্য অসম্প্রদায়িক দারিদ্র্যমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা। ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ২০০৮-এ আপনারা আমাদের নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন। আগামীতে আবার নৌকায় ভোট দিলে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা তথা বিশ্বসভায় মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, বাংলাদেশকে কলংকমুক্ত করতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে। যারা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করছে তাদের বিচার করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি ঘৃণা জানাই সেই সব আলবদর, রাজাকার, আলশামসকে। যারা এদেশের সন্তান হয়েও, মুসলমান হয়েও আমাদের মা-বোনদেরকে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল পাশবিক নির্যাতনের উদ্দেশ্যে। আমি সেসব মা-বোনের অবদান স্মরণ করে তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাই। জেনারেল জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা নিয়ে সেই যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে দিয়েছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী বানিয়ে রাজনীতিতে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী জনসভার আগে নাজিরপুরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কলেজের একাডেমিক ভবন ও ছাত্রী নিবাস, বলেশ্বর নদীর উপর নির্মিত শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি সেতু, ইন্দুরকানী থানা ভবন, জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ভবন, স্বরূপকাঠী (নেছারাবাদ) ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ভবন, স্বরূপকাঠী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ভবন, জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নির্মিত ৬টি প্রাইমারি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার উদ্বোধন করেন। এছাড়া তিনি পিরোজপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা ভবন, কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র্র, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের হোস্টেল, সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের একাডেমিক ভবন কাম পরীক্ষা হল ও ক্যাটেল গবেষণা কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের মাস্টার ডিগ্রি কোর্স, সরকারি মহিলা কলেজের অনার্স কোর্স, কঁচানদীর উপর ব্রিজ, পিরোজপুর সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা, নদীভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিশ্রুতি দেন।
পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক এডভোকেট আকরাম হোসেন। বক্তব্য রাখেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, কেন্দ্রীয় সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএমএ আউয়াল এমপি, অধ্যক্ষ মো. শাহ আলম এমপি, ডা. আনোয়ার হোসেন এমপি, সাধনা হালদার এমপি, কেন্দ্রীয় নেতা ইসাহাক আলী খান পান্না, শাহে আলম, খলিলুর রহমান খলিল প্রমুখ। এ সময় মঞ্চে বসা ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ আ স ম ফিরোজ, বাগেরহাটের শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, ডা. মোজাম্মেল হোসেন এমপি, মীর শওকত আলী বাদশা এমপি, বরিশালের এমপি মনিরুল ইসলাম, সাফিয়া খাতুন এমপি, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজা প্রমুখ।
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সরকার প্রধান হিসাবে শেখ হাসিনার পিরোজপুরে এটাই প্রথম সফর। প্রধানমন্ত্রী বিকাল চারটায় সভাস্থলে আসেন এবং পৌনে পাঁচটায় ভাষণ দিতে শুরু করেন। প্রায় ৩০ মিনিট তিনি বক্তব্য রাখেন। স্বরূপকাঠি-বানারীপাড়া এলাকা থেকে আসা অনেক মানুষকে প্রধানমন্ত্রী সভামঞ্চে আসার আগেই চলে যেতে দেখা যায়।
পটুয়াখালীতে বৃহত্তম বীজ
উত্পাদন ক্ষেত্র উদ্বোধন
পটুয়াখালী প্রতিনিধি নির্মল রক্ষিত জানান, এর আগে সকালে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়ায় দেশের সর্ববৃহত্ বীজ উত্পাদন ক্ষেত্র “দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে(বরিশাল ও পটুয়াখালী) বীজ বর্ধন খামার” উদ্বোধন ও দুপুরে লেবুখালীতে পায়রা নদীর উপর চতুর্থ বৃহত্তম পায়রা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর তিনি পটুয়াখালী কৃষি বিমান অবতরণ ক্ষেত্রে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। এর আগে মতবিনিময় সভাস্থলের পাশে জেলার বিভিন্ন এলাকার ১২টি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
মতবিনিময় সভা মূলত সমাবেশে রূপ নেয়। সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লেবুখালীতে পায়রা নদীর উপর সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এখানে এসেছি। এই সেতু নির্মাণে কুয়েত সরকার অর্থ দিচ্ছে। এর আগে অন্য সেতু নির্মাণ করে দিয়েছি। এই সেতু নির্মাণ হওয়ার পর ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা পর্যন্ত যেতে আর কোন কষ্ট থাকবে না। আমরা কুয়াকাটায় পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করেছি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন এই এলাকার উন্নয়ন হয়। ১৯৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় এসে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করেছি। আপনারা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ অনেক কষ্ট করেন। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেন না। আমরা মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে বই দিচ্ছি। যাতে ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে এই এলাকার মানুষের কাছে ভোট দাবি করে বলেন, আপনারা বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন। আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে এখানকার প্রতিটি প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছেন এজন্য আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। সামনে নির্বাচন, সেই নির্বাচনেও আমি আপনাদের কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চাই। আপনারা নৌকায় ভোট দেবেন কিনা হাত তুলে ওয়াদা করেন। এসময় জনতা দুই হাত তুলে সমর্থন জানান।
জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব এডভোকেট মো. শাহজাহান মিয়া। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ন, জাতীয় সংসদের হুইপ আ.স.ম ফিরোজ এমপি, সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেন।
দশমিনার বাঁশবাড়িয়ায় প্রধানমন্ত্রী বীজ বর্ধন খামার উদ্বোধন শেষে সেখানে মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখের কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, জাতীয় সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি, বিএডিসির চেয়ারম্যান নাজমুল ইসলাম ও কৃষি সচিব মঞ্জুর হোসেন।
