ঘন ঘন হরতাল-অবরোধসহ চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন দেশের ব্যবসায়ী সমাজ। সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে সৃষ্ট এই পরিস্থিতির আশু কোন সমাধানও দেখছেন না তারা। তবে আর বসে থাকার পক্ষপাতী নন তারা। তাই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের পর বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সাক্ষাত্ করতে চাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর পক্ষ থেকে গতকাল মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার কাছে দ্বিতীয় দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে অন্য ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদেরও স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু গতকাল রাত আটটা পর্যন্ত চিঠির জবাব পাওয়া যায় নি। এদিকে হরতালে ব্যবসায়ে অচলাবস্থা ও অর্থনীতির ক্ষতির দিক তুলে ধরতে আজ বিকাল তিনটায় ফেডারেশন কার্যালয়ে এফবিসিসিআই সাংবাদিক সম্মেলন করবে বলে জানা গেছে ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে এর প্রতিকার চাইতেই মূলত ব্যবসায়ীরা বিরোধী নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে চাইছেন। এছাড়া চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সরকারের সংলাপের আহ্বানে সাড়া দেয়ার জন্যও তারা বিরোধী নেতার প্রতি আহ্বান জানাবেন। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা চরম খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমদানি-রফতানি বন্ধ হওয়ার পথে। স্থানীয় উত্পাদনও বন্ধ। আমাদের নিরাপত্তা নেই। বিরোধী নেতার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেলে চলমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় চাইব।’ তবে ওই বৈঠকে এফবিসিসিআই সুনির্দিষ্ট কোন প্রস্তাব দেবে কি না - এ বিষয়ে তিনি মুখ খোলেন নি । প্রসঙ্গত, এর আগে এফবিসিসিআই’র নবনির্বাচিত বোর্ড সৌজন্য সাক্ষাত্ চেয়ে খালেদা জিয়ার কাছে একটি চিঠি পাঠায়। সেই চিঠির বিষয়েও বিরোধী দলীয় নেত্রীর দপ্তর থেকে গতকাল পর্যন্ত কোন সাড়া মেলেনি।
পরিত্রাণ পেতে দফায় দফায় বৈঠক :চলমান সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। গত ৬ মার্চ ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদের বাসায় নৈশভোজ সভা করেন এফবিসিসিআই’র বেশ কয়েকজন সাবেক সভাপতি। এর দুই দিন পর গুলশানের একটি হোটেলে তারা বৈঠকে বসেন। সর্বশেষ গত ১১ তারিখেও এফবিসিসিআই’র সাবেক সাত সভাপতি বৈঠক করেছেন। এর আগে এফবিসিসিআই’র বৈঠকে পরিচালকেরা সংগঠনের বর্তমান সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদকে সংকট নিরসনে দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানান।
ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন পরিচালক ইত্তেফাককে বলেন, ‘ব্যাংক থেকে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ সুদে টাকা নিয়ে দিনের পর দিন বসে থাকব- এটা মেনে নেয়া যায় না। পরিস্থিতি এমন নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও হামলা-অগ্নিসংযোগ হচ্ছে। এ অবস্থায় রাজনীতির মত অর্থনীতিও রক্তাক্ত হয়ে গেছে। বিদেশিরা আগ্রহ হারাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘৪২ বছরের অর্থনীতি ধসে পড়তে ৪২ দিনই যথেষ্ট। এই অবস্থায় আমাদের বসে থাকলে চলবে না। অতীতেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উভয় দলের প্রধানরা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আমরা আশা করি, যথাযথ উপায়ে উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হলে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে এবারও আমরা আশাব্যঞ্জক সাড়া পাব।’
হরতালের বিকল্প কর্মসূচি দাবি :এই অবস্থায় ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে হরতালের বিকল্প উপায় বের করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন-বিজিএমইএ। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পোশাক শিল্প হরতালের আওতামুক্ত হলেও এ শিল্পের বাস্তবতা হচ্ছে, একটি অর্ডার সম্পন্ন করতে বস্ত্র কারখানা, এক্সেসরিজ, ওয়াশিং, ডাইং, প্রিন্টিং, প্যাকেজিংসহ সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। কাঁচামাল বন্দর থেকে আনা ও উত্পাদিত পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে হয়। তাই যেকোন সামান্য প্রতিবন্ধকতা এ শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিঘ্নিত করে। এক ঘণ্টা বিলম্বের জন্য যদি তৈরি পোশাক জাহাজীকরণ করা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে ক্রেতার সাথে চুক্তি অনুযায়ী ডিসকাউন্ট, অর্ডার বাতিল এমনকি অর্থ প্রাপ্তিও (ক্রেতার কাছ থেকে) পিছিয়ে যায়। ফলে উদ্যোক্তাকে লোকসানের বোঝা বইতে হয়।
চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় অনেক ক্ষুদ্র শিল্প রুগ্ন শিল্পে পরিণত হতে পারে বলে দাবি করেছেন রফতানিকারকদের সংগঠন ইএবি’র সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী। এ সংকট নিরসনে দুই দলের সংলাপকেই গুরুত্ব দিলেন তিনি। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, লিড টাইমের মধ্যে আমদানিকারকের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে ১০ গুণ বেশি খরচে বিমানপথে পাঠাতে হচ্ছে। বিমান বন্দরে এখন ট্রাকে ট্রাকে পণ্য অপেক্ষা করছে। লোকসান কিছুটা কমিয়ে আনতে এই ভাবে পাঠানোর চেষ্টা করছেন তারা। তবে এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়বে বলে তার আশংকা।
ক্রয় আদেশ কমিয়ে দিচ্ছে বিদেশি ক্রেতারা ! :এদিকে হরতালসহ চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অর্ডার দেবে কি না - তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছে বিদেশি ক্রেতারা । চুক্তিবদ্ধ সময়ের মধ্যে (লিড টাইম) রফতানি করতে না পারলে তারা ক্রয় আদেশ বাতিলেরও হুমকি দিয়েছে বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফ্যাশন ও বিউটি বিষয়ক একটি দৈনিকে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যতম ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট বাংলাদেশে তাদের ক্রয় আদেশ কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় তাদের অর্ডার নিয়ে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের আস্থার বন্ধন দুর্বল হওয়ার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা।
