সারা পৃথিবীর বোলারদের শরীর কাঁপে তার সামনে যাওয়ার সময়। তাকে একটা বল করার আগে বোলারকে দিতে হয় স্নায়ুর পরীক্ষা। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন; বোলারদের জীবন বিভীষিকাময় করে তোলা এই শচীন টেন্ডুলকার নিজেই সমপ্রতি খুব বড় পরীক্ষার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। তার হাত-পা নাকি কাঁপছিল, তারও মনে হচ্ছিল—কিভাবে নিজেকে শক্ত রাখা যায়।
না, কোনো ক্রিকেটার ক্রিকেট মাঠে শচীন টেন্ডুলকারের এই পরীক্ষা নিতে পারেননি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা যুবরাজ সিংয়ের সামনে দাঁড়াতে গিয়ে জীবনের কঠিনতম স্নায়বিক এই চাপে পড়েছিলেন টেন্ডুলকার। আর এই গল্প নিজেই পরশুদিন দিল্লীতে এক অনুষ্ঠানে বলে শোনালেন তিনি। অনুষ্ঠানটা ছিল যুবরাজ সিংয়েরই। ক্যান্সারজয়ী এই ক্রিকেটারের ক্যান্সার জয় করার গল্প, জীবনের গল্প নিয়ে লেখা আত্মজীবনী ‘দ্য টেস্ট অব মাই লাইফ’ বইয়ের প্রকাশনা উত্সব ছিল দিল্লীতে। আর মঙ্গলবার সেই অনুষ্ঠানেই টেন্ডুলকার শোনালেন যুবরাজকে তার দেখতে যাওয়ার গল্প।
অনুষ্ঠানে শুধু টেন্ডুলকার নন; সমসাময়িক প্রায় সব ভারতীয় খেলোয়াড়ই উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় জাতীয় দলের সদস্যরা, কোচিং স্টাফরা এবং কয়েকজন কর্মকর্তাও। আর উপস্থিতি নিয়ে বেশ একটা মজা দিয়েই অনুষ্ঠানের শুরু হল।
মঞ্চ থেকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের জন্য মঞ্চে ডাকা হল সব জাতীয় ক্রিকেটারকে। সবাই একে একে উঠে এলেন। কিন্তু জাতীয় দলে নেই বলে বীরেন্দর শেবাগ চুপচাপ বসে রইলেন; মঞ্চে উঠলেন না। অপ্রস্তুত পরিস্থিতি দেখে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে যুবরাজ বললেন, ‘বীরু, আমিও দলে নেই, তুমিও দলে নেই। আমি যদি মঞ্চে থাকতে পারি, তুমি আসবে না কেন? চলে আয় ভাই!’ এই এক কথাতেই যেন জমে গেল অনুষ্ঠান। আর অনুষ্ঠানকে আবেগে ভাসিয়ে দিলেন শচীন টেন্ডুলকার কথা বলতে গিয়ে। তিনি বর্ণনা করছিলেন লন্ডনের হাসপাতালে যুবরাজকে দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা, ‘আমি গাড়িতে বারবার আমার স্ত্রীকে বলছিলাম, ভয় করছে। ওর সামনে গিয়ে ভেঙে না পড়ি। ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর একসাথে খেতে এলো। ওর খাওয়া দেখে বুঝলাম, সুস্থ হয়ে যাচ্ছে!’
এই কথায়ও পরিবেশ হালকা হওয়ার সুযোগ পেল না। এরপরই যে টেন্ডুলকার কাঁদিয়ে দিলেন সবাইকে, ‘আমার স্ত্রী ওর সঙ্গে মেডিকেবল টার্ম নিয়ে কথা বলছিল। কি সব শব্দ! আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। যুবি তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আমার সেই সময় হঠাত্ মনে হল, কেন! কেন, আমাদের যুবিরই এই রোগ হতে গেল!’ ঠিক একই প্রশ্ন করলেন এসে মহেন্দ্র সিং ধোনি। অধিনায়ক হিসেবে বন্ধুর এই অসুস্থতার খবর অনেকের আগে পেয়েছেন। ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিচারণও করে ফেললেন ধোনি। বললেন, কীভাবে ম্যাচের পর ম্যাচ বের করে আনছিলেন। আর সেই সময়ই তিনি প্রথম কিছু একটা দেখতে পান, ‘ও মাঝে মাঝেই খুব কাশতো। আমরা এটা নিয়ে কথাও বলেছি। ভেবেছি, সামান্য কোনো সমস্যা। এর মধ্যে আমরা বিশ্বকাপ জিতে ফেললাম। ওর কিছু টেস্ট হল। সেগুলোর রিপোর্ট আসার পর আমাকে একজন এসে বললো, যুবির ক্যান্সার। আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। এটা বিশ্বাস করা যায়! আমি শুধু বলেছিলাম, হতেই পারে না।’
শেষ পর্যন্ত সেই ক্যান্সার সত্যি হলেও, এই নিষ্ঠুর সত্যিকে জয় করে আবার মাঠে ফিরেছেন সেই যুবরাজ। এবার পাঠকরা সুযোগ পাচ্ছেন যুবরাজের এই লড়াই জয়ের গল্প নিজেই জেনে নেয়ার। ল্যান্স আর্মস্ট্রং কাণ্ডের পর কাউকে তো অন্তত অনুপ্রেরণা হয়ে থাকতে হবে!
