রাজনৈতিক অস্থিরতায় কমেছে বিনিয়োগ প্রস্তাব

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৩, ২৩:০৬
দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় কমেছে বিনিয়োগ প্রস্তাব। বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে দেশীয় ১২১টি বিনিয়োগ প্রকল্পের নিবন্ধন হয়েছে। বিদেশি এবং যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ২১টি প্রকল্প। এক মাস আগে জানুয়ারি মাসেও দেড় শতাধিক বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল দেশে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারীরা ১৬৫৫টি শিল্প নিবন্ধন করেছেন। বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধনের হার কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতালসহ বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকের চড়া সুদহারসহ দেশে চলমান সংকটে বিনিয়োগ ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিও কমে যাচ্ছে। বিনিয়োগ পরিস্থিতির বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভূমিকা আত্মঘাতীমূলক। রাজনৈতিক সংঘাত ও হরতালের মতো কর্মসূচি বিনিয়োগবান্ধব নয়। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষেরও ক্রয় ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ছাড়াও দেশের ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে আসছে। এরকম পরিস্থিতিতে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির আরো অবনতি হবারও আশংকা করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং দেশের ভাবমূর্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অপ্রতুল অবকাঠামো এবং গ্যাস ও বিদ্যুত্সহ নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে এমনিতেই দেশে সন্তোষজনকভাবে বিনিয়োগ আসছে না, সেখানে এ ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগকে আরো বাধাগ্রস্ত করবে। এই অবস্থায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা নিরুত্সাহিত হবেন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাবেন বলে মনে করে এফবিসিসিআই। বর্তমান সংকটে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। রাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত ইমেজ সংকট এবং রফতানিতে সময় বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে অর্ডার হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই। জিএসপি সংকট, ইউরো জোনের অর্থনৈতিক মন্দা প্রভৃতি কারণে রফতানি ব্যাহত হচ্ছে। তার উপর যোগ হওয়া চলমান রাজনৈতিক সংঘাত রফতানি খাতকে আরো বিপর্যস্ত করে তুলছে। বিনিয়োগ বোর্ডের দেয়া তথ্যানুযায়ী ২০১২ সালে ১৮৫৫ শিল্পে ৭১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বাংলাদেশে। এর মাধ্যমে ৩ লাখ ৬৪ হাজার লোকের কর্মসংস্থান তৈরির প্রস্তাবনা রয়েছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রকল্পে ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ২১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বা ২শ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। অন্যদিকে মাসভিত্তিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৪০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ১২১টি বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধিত হয়েছে। এতে প্রায় ২১ হাজার কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা রয়েছে। অন্যদিকে যৌথ এবং শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের। চলতি অর্থবছরের (২০১২-২০১৩) প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধিত হয়েছিল ২৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ৭৪৫টি বিনিয়োগ প্রকল্পে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধিত হয়েছে ২২৭ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের ৯৫টি। এদিকে দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমার পাশাপাশি মোট আমদানিও কমে যাচ্ছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১২ বিলিয়ন (এক হাজার ২০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিটেন্স বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশে বিনিয়োগ কমে যাওয়া রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৮৭৪ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯৮১ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলার। ফলে আগের একই সময়ের তুলনায় এলসি কমেছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে এলসি নিষ্পত্তির মূল্যও একই সময়ে কমেছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে তাও সময়মতো বিনিয়োগে রূপান্তর হবে কি না সে বিষয়ে রয়ে গেছে সংশয়।