ভারতে এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া শীর্ষক একটি সেমিনার বসে ২০০৩ সালে। ঘটনার শুরুটা সেখানেই। ব্যাঙ্গালুরু সেমিনার শুরু হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একটি গাড়ি এসে ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের গেটে দাঁড়ায়। বাইরের সিকিউরিটি গার্ডরা ভেবেছিল কোনো প্রতিষ্ঠানের সিইও হয়তো এসেছেন। এ জন্য এগিয়ে যেতেই দেখলেন গাড়ির ভেতর থেকে ১৭ বছর বয়সের একটি ছেলে বেড়িয়ে এল। এ সেমিনার কক্ষে প্রবেশ করতে গেলে তিনি বাধা পান। তাকে জানানো হয়, এ সেমিনারে অংশ নিতে হলে কোনো প্রতিষ্ঠানের সিইও হতে হবে। কোনো কলেজ পড়ুয়ার জন্য এ সেমিনার না। বিড়ম্বনায় পড়ে ছেলেটি ফোন দেয় সেমিনার উদ্যোক্তাদের। তারা এসে ছেলেটিকে স্বাগতম জানায়। তরুণ এই ছেলেটির নাম সুহাস। ব্যাঙ্গালোরের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান গ্লোবালের সিইও এবং একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি তার আরও একটি পরিচয় হলো, তিনি সবচেয়ে কম বয়সী সিইও।
তার অর্জন, কাজ সম্পর্কে তিনি নিজেই জানিয়েছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। বাবা ইন্ডিয়ান আর্মিতে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করতেন। এ জন্য এয়ার ফোর্স স্কুলেই পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ছোটবেলা থেকে এ জীবজগত্ নিয়ে দারুণ আগ্রহী ছিলেন। সেই বয়সে তার বন্ধুরা সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকত। তাদের কাছে গল্প শুনতেন। এই যন্ত্রটির প্রয়োজনীয়তার কথা শুনে বাবার কাছে একটা কম্পিউটার কেনার আবদার করলেন তিনি। সেই সময়টাতে কম্পিউটারের দাম অনেক বেশি ছিল। তাই কেনার সামর্থ্য তার বাবার ছিল না। পরে বাসার কাছে সাইবার ক্যাফেতে গিয়েই কম্পিউটারের সঙ্গে পরিচিত হন সুহাস। প্রতিদিন সাইবার ক্যাফেতে যেতেন তিনি। অবাক হতেন যে, এই যন্ত্র দিয়ে করা যায় না এমন কোনো কাজ নেই! এরপর তার পরিচয় হয় ইন্টারনেটের সাথে। বিভিন্ন সাইটে গিয়ে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। তখনই হুট করেই তার মনে হলো, ব্রাউজ করার জন্য আমরা যে ওয়েব সাইটটি দেখতে পাই সেটা বানানোর কৌশলটা কীভাবে রপ্ত করা যায়। ব্রাউজ করেই তখন একটি ই-বুক খুঁজে পান তিনি। বইটি পড়ে পড়ে হালকা কাজও করতে পারতেন। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানেই কাটাতেন। কিন্তু সেই টাকার পরিমাণ অল্প ছিল বলে খুব বেশি সময় থাকতে পারতেন না। তখনই খেয়াল করলেন সাইবার ক্যাফেটি দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এরপর সাইবার ক্যাফের মালিককে একটি প্রস্তাব দেন তিনি। তিনি এই সময়টা সাইবার ক্যাফেতে বসতে চান, সেখানে তিনি গ্রাহকদের খেয়াল রাখবেন আর বিনিময়ে তাকে সারাদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিতে হবে। প্রথমে মালিক তার কথা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে চিন্তা ভাবনা করে তিনি তাকে কাজ করার অনুমতি দেন। বলা যায় এটা ছিল তার প্রথম ব্যবসায়িক ডিল। যদিও সেখানে টাকাটা মুখ্য ছিল না। মূল বিষয় ছিল তার আগ্রহ। সুযোগ পেয়ে গেলেন তিনি। সময় নষ্ট না করে কাজে নেমে পড়লেন। নিজেই পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন ওয়েবসাইট তৈরি করতে শুরু করলেন। এরপর ওয়েবসাইট তৈরি করাই তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেল। একসময় ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করেন। কিন্তু বয়স অল্প থাকায় ফ্রিল্যান্স মার্কেটে নিবন্ধন করতে পারেননি তিনি। এ জন্য ওয়েবসাইট বিল্ডার ক্যাটাগরিতে আমি নিজের নাম নিবন্ধন করেন। খুব কম খরচে আমি প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেটা বানিয়ে একশ ডলার আয়ও হয় তার। কিন্তু এ বয়সে তার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই বাবাকে সব বিষয় জানান। এর আগ পর্যন্ত তার বাবা কিছুই জানতেন না। বাবাকে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়টা বোঝাতে হয়েছিল তাকে। তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে কিছুই বললেন না। বরং উল্টা তাকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিলেন।
তার কাছে টাকা এসে পৌঁছাল। কিন্তু কোনোভাবেই অর্থ তাকে টানছিল না। কারণ তার কাছে শেখার আগ্রহটা বড় ছিল। তিনি ভাবতেন এখনও তার অনেক কিছু শেখার আছে। এমনও বহু ওয়েবসাইট সে সময় তিনি তৈরি করেছেন একদম ফ্রিতে। অনেক প্রতিষ্ঠান তার কাছ থেকে ফ্রি ওয়েবসাইট তৈরি করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে মনে হলো তার নিজের একটা পোর্টফোলিও থাকলে ভালো হয়। তাই নিজের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন তিনি। যেখানে তার স্কিল সম্পর্কে নানা তথ্য উল্লেখ ছিল। এরপরই বহু প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা শুরু করে। সেসময় তিনি মাত্র ক্লাস নাইনে, তখন কম্পিউটার কেনার টাকা জোগাড় হয়ে যায়। কিন্তু সে সময় তার বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু করলেন। তাই বাবাই কষ্ট করে বড় ছেলের জন্য কম্পিউটার কিনে ফেললেন।
এই সময় সুহাসের জীবনে একটা মজার ব্যাপার ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান তাকে চাকরির প্রস্তাব দেয়। তখন আমার বয়স মাত্র ১৪। কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করেননি। বর্তমানে তার বয়স সতেরো বছর। তিনি নিজের কোম্পানির একজন সিইও। পাশাপাশি বলা যায়, তিনি বিশ্বের সর্ব কনিষ্ঠ সিইও।
