এ যাত্রায় তিনি আর ফিরে আসবেন না এটি প্রায় সকলেই বলাবলি করছিল। ১০ মার্চ রাতে যখন তাঁকে সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিত্সার জন্য নিয়ে যাওয়ার সংবাদ প্রচারিত হয় তখন এমন আশংকাই সকলে প্রকাশ করছিল। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, ঘন ঘন তাঁর শরীর এরিমধ্যে খারাপও হচ্ছিল, আবার বেশ কয়েকবার তাঁকে প্রকাশ্যে দেখে সবাই আশাবাদীও হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি বোধহয় সুস্থ হয়ে উঠেছেন। বিশেষত ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি অতিসম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেলেন।
আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমান বন্দরে গেলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দুই দেশের দুই রাষ্ট্রপতি পাশাপাশি বসে ভাষণ দিলেন, আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেন, সর্বশেষ তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং প্রবীণ নেতা আবদুল জলিলের জানাজাতেও অংশ নিয়েছিলেন। তখন কেউ ভাবতে পারেনি আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান কতোখানি শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে এতোসবে অংশ নিচ্ছেন। অথচ এর পরদিনই তাঁকে সামরিক হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করাতে হলো, এরপর সিঙ্গাপুর নিয়ে যেতে হলো। সেখান থেকে তিনি স্বদেশের মাটিতে ফিরে এলেন না-ফেরার দেশে চিরদিনের মতো চলে যাওয়া জন্যে। গত কয়েকদিন সংবাদ মাধ্যমগুলো তাঁর শরীরের অবস্থা নিয়ে যে সব সংবাদ জানাচ্ছিল তাতে কখনো কখনো একটু-আধটু আশাবাদী হওয়ার খবর থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত সেরে উঠবেন কি না তা নিয়ে প্রায় সকলেই সন্দিহান ছিলেন।
বুধবার শেষ বিকেলে তাঁর অবশেষে চলে যাওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সকল মহলে গভীর শোক নেমে আসে। বিএনপি তাদের ঢাকা জেলার হরতাল কর্মসূচিও স্থগিত করে দেয় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। সরকার ৩দিন জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে। দলমত নির্বিশেষে সকল মহল থেকেই রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুটি বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টির অনুভূতিই প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। প্রায় সকলেই বলছেন, রাজনৈতিক অঙ্গন একজন প্রবীণ অভিভাবককেই যেন হারিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোকবার্তায় যেমনটি দেখা গেছে, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথাতেও অনেকটা তেমন কথাই ফুটে উঠেছে। প্রচার মাধ্যমগুলোতে রাষ্ট্রপতির বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের যে বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে তাতেও স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটিতে একজন আপাদমস্তক নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ এবং ভালো মানুষ এই সময়ে ছিলেন, যাকে শ্রদ্ধা করা যায়, যার জীবন ও কর্ম থেকে অনেককিছু শেখার রয়েছে, যিনি দেশ ও জাতির রাজনৈতিক সংকটকালে রাজনীতিবিদদের জন্যেও আদর্শের প্রতীক হয়ে থাকার মতো অনেক কিছু রেখে গেছেন।
আমরা যারা সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই তাদের অনুভূতিটি রাজনীতিবিদদের চাইতে খুব বেশি আলাদা কিছু হওয়ার নয়। দেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ জিল্লুর রহমানকে সকলেই চেনেন ও জানেন দীর্ঘদিন থেকে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অনুসারি হিসেবে জিল্লুর রহমান পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তাঁর জায়গা করে নেন, সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করা, অবদান রাখা এসবই দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর দল এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অবস্থানকে ব্যক্ত করে।
জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষভাবে আলোর পাদপীঠে উঠে আসেন ১৯৭২ সালে যখন তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। আমরা তখন থেকে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী আইভি রহমানকে রাজনীতির এক অনন্য সুখী দম্পত্তি হিসেবে দেখেছি, তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগও পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য এবং আস্থার মানুষরূপে জিল্লুর রহমানকে দল, সরকার এবং বাইরের সকলে সেই সময় থেকেই লক্ষ্য করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি একনাগাড়ে ৪ বছর জেলে কাটিয়েছেন, মুক্ত হয়ে আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে অন্য নেতৃবৃন্দের মতো ভূমিকা রেখেছেন। রাজনীতিতে অনেককেই দেখা যায় বিপদে পালিয়ে বেড়াতে, নিষ্ক্রিয় থাকতে অথবা বোল পাল্টিয়ে একথা-ওকথা বলতে, বা ভিন্ন লাইন ধরতে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে জিল্লুর রহমানকে তেমন অবস্থানে কখনো দেখা যায়নি। ফলে জিল্লুর রহমান যত প্রবীণ হচ্ছিলেন ততো বেশি আস্থার ও ভরসার স্থলে পরিণত হন। এমনকি দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনাও তাকে একদিকে অভিভাবকের, অন্যদিকে সংকটকালের ভরসার মানুষ রূপে খুঁজে পেয়েছিলেন। বিশেষত ২০০৭ সালে শেখ হাসিনা বন্দী হওয়ার প্রাক্কালে জিল্লুর রহমানের হাতেই দলের চাবিকাঠি তুলে দিয়ে যান। সেই দুর্দিনে এই বয়োবৃদ্ধ মানুষটি নির্ভয়ে সংবাদ মাধ্যমের সম্মুখে কথা বলেছেন, শেখ হাসিনার জন্য আদালতে নিজে আইনজীবীর পোশাক পরে লড়তে গেছেন, দলকে সংগঠিত করে রাখা, বুদ্ধিপরামর্শ দেওয়া, নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা-এসবই তিনি করেছেন একজন সাহসী ও যথার্থ রাজনীতিবিদ হিসেবে। তিনি যদি পথহারা, দুর্বলচিত্তের অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ হতেন তা হলে ২০০৭-০৮ সালের বিশেষ পরিস্থিতিতে এভাবে লড়াকু নেতার মতো নামতে পারতেন না। ১৯৯৬-২০০১ সালে তিনি এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের সম্পর্কে নানা ধরনের অভিযোগ থাকে। সত্য-মিথ্যা পরের ব্যাপার। কিন্তু দেশে বিশেষ পরিস্থিতিতে ঐ মন্ত্রণালয়ে থাকা সাবেক মন্ত্রীদের ওপর ঝড়-ঝাপটা বয়ে যাওয়ার রেকর্ড কম নয়। জিল্লুর রহমানের যদি ব্যক্তিগত তেমন কিছু থাকতো তাহলে তিনি অতোটা সাহস নিয়ে ২০০৭-২০০৮ সালে দাঁড়াতে পারতেন না। তাঁর এগিয়ে আসাই প্রমাণ করে যে, তিনি নিজেকে সেসব থেকে মুক্ত রেখেছেন। ফলে ২০০৭-০৮ সালে আমরা জিল্লুর রহমানকে দেখতে পাই সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে।
অবশেষে দেশ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যায়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর দেশের ইতিহাসে সবচাইতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়। তাতে তাঁর দল আওয়ামী লীগ ১৪ দল তথা মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সরকার গঠন করার পর শেখ হাসিনা প্রবীণ এই অভিভাবক রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতির পদের জন্য মনোনয়ন প্রদান করেন। তিনি বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি পদে গত ৪ বছর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এই সময়ে রাষ্ট্রপতির পদটিকে দেশের সংবিধান মোতাবেকই মর্যাদা দিয়ে গেছেন তিনি। তিনি সরকার এবং বিরোধী দল সকলেরই আস্থায় ছিলেন। বিরোধী দলীয় নেতাও তাঁর সঙ্গে বঙ্গভবনে সাক্ষাত্ করেছেন, কথা বলেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমার মতো একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে তাঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের বিষয়টি ততোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারপরও সংসদ ভবনসহ কয়েকটি জায়গায় গত প্রায় দুই দশকে তিনবার তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছিল। যতবারই তাঁকে সাক্ষাতে দেখেছি, ততোবারই মনে হয়েছে টিভি পর্দায় তাঁকে যতোটা সহজ সরল দেখেছি, বাস্তবে তিনি এর চাইতেও বেশি অমায়িক, সরল ও সহজ মানুষ। কথা বলতেন আস্তে আস্তে, উচ্চৈ:স্বরে কখনো তাকে কথা বলতে শুনিনি, মাথা ঠাণ্ডা রেখে কথা বলা তার একটি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য ছিল। উত্তেজিত হওয়ার কোনোকিছু দেখা যায়নি। শিশুর মতো সরলতা তাঁর মধ্যে ছিল, আবার যুক্তি ও তথ্য দিয়েও নিজের কথা বলতেন দৃঢ়ভাবে, মুখে হাসির রেষ থেকেই যেত, কূট চালের রাজনীতি বা আচরণ লক্ষ্য করা যায়নি। এ সবই একজন ভালো মানুষের বৈশিষ্ট্য যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কোনোভাবেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, বরং ভালো মানুষের হাতে রাজনীতির নেতৃত্ব থাকলে রাজনীতিও ভালো হওয়ার, মানুষকে আকৃষ্ট করার কারণ হতে পারে—তা জিল্লুর রহমানের জীবন ও রাজনীতির পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসে।
দু’একটি টিভি চ্যানেলে এ মুহূর্তে তাঁর দেয়া কয়েকটি সাক্ষাত্কার প্রচারিত হচ্ছে। সেগুলোতে তাঁর রাজনীতি, পারিবারিক জীবন এবং দেশের সামগ্রিক অনেক প্রশ্নেরই উত্তর তিনি দিয়েছেন দেশের একজন অভিজ্ঞ ও পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদদের মতো, আবার ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখের কথা বলেছেন একজন সহজ সরল মানুষের মতো।
তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে আইভি রহমানের স্থান কতোটা ব্যাপক ছিল তা তিনি বলেছেন ভালোবাসার অবস্থান থেকে। আইভি রহমান ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মুমূর্ষু রোগী হয়ে সিএমএইচ-এ একদিন বেঁচে ছিলেন, তখন একজন অসহায় জিল্লুর রহমানকে সকলে দেখেছিল, বিপর্যস্ত হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনিও ছিলেন। কিন্তু সেই শোককে তিনি যথার্থ অর্থেই শক্তিতে পরিণত করে দেশের রাজনীতিতে আইভি-উত্তর প্রায় ৯ বছর অনন্য অসাধারণ ভূমিকা রেখে গেলেন। একজন মানুষের জীবন কতোটা দেশ ও জনগণের জন্যে উত্সর্গীকৃত হতে পারে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তাঁর এক অনন্য উদাহরণ। ইতিহাস তাঁকে স্মরণ রাখবে তাঁর এই বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের জন্যেই।
লেখক :অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
