বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে গত ১৪ মার্চ ২০১৩ দৈনিক ইত্তেফাকের আয়োজনে এবং ল্যাবএইডের সহযোগিতায় ‘আকস্মিক কিডনি বিকল প্রতিরোধ’ শীর্ষক
গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে তুলে ধরা হলো।
গোলটেবিল
বৈঠক
প্রতিপাদ্য
আকস্মিক কিডনি বিকল প্রতিরোধ
আয়োজনে
দৈনিক ইত্তেফাক ও ল্যাবএইড
স্থান ঃ জাতীয় প্রেসক্লাব
১৪ মার্চ, ২০০৩
সঞ্চালক
ডা. নুজহাত চৌধুরী
চক্ষু বিশেষজ্ঞ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
স্বাগত বক্তব্য
ডা. এএম শামীম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ল্যাবএইড গ্রুপ
আশিস সৈকত
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
যারা অংশ নেন
অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশিদ
প্রতিষ্ঠাতা, কিডনি ফাউন্ডেশন
ডা. এএম শামীম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ল্যাব এইড গ্রুপ
অধ্যাপক ডা. রফিকুল আলম
চেয়ারম্যান, নেফ্রোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ
বিভাগীয় প্রধান, কিডনি বিভাগ, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির
চিফ কনসালটেন্ট, ইউরোলজি বিভাগ ,ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
মেজর জেনারেল (অব) ডা. এম শাহজাহান
অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট,
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ
সেন্টার ফর রিচার্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
শাহীন রেজা নূর
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
আফজাল হোসেন, অভিনেতা
সামিনা চৌধুরী, সঙ্গীতশিল্পী
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রধান নির্বাহী, বেলা
ডা. নওজিয়া ইয়াসমিন
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পাবলিক হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
রোবায়েত ফেরদৌস
সহযোগী অধ্যাপক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আশিস সৈকত
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
আবুল খায়ের
নগর সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
কিডনি বিষয়ে পরামর্শ
কিডনি রোগ সম্পর্কে অহেতুক ভীতি দূর করতে হবে। কিডনি রোগের মিথ দূর করে বৈজ্ঞানিক ও সঠিক তথ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। অজ্ঞানতা ও অবহেলার বিপরীতে সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দিতে হবে।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অবশ্যই কিডনি পরীক্ষা করতে হবে। রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করতে হবে।
কিডনি রোগ আর কিডনি ফেইলিওরের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, গণমাধ্যমের উচিত তা সঠিকভাবে তুলে ধরা।
অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ দেয়ার আগে চিকিত্সককে অবশ্যই রোগীর কিডনির অবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে। এ জন্য প্রথমে চিকিত্সক ও পরে রোগীকে সচেতন করে তুলতে হবে।
বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা জরুরি। এ জন্য মিডিয়া, বিভিন্ন হাসপাতাল, সরকার, এনজিও, সুশীল সমাজের উদ্যোগ নেয়া উচিত। এই পুরো ব্যাপারটিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে এগিয়ে নেয়া দরকার। কিডনি রোগ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যমকে আরো সংবেদনশীল হতে হবে।
ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, বমি হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, ভেজাল খাবার, পরিমিত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান না করা প্রভৃতি কারণে কিডনি রোগ হতে পারে। এ বিষয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার।
চিকিত্সাকে ব্যবসা হিসেবে না নিয়ে যতটা সম্ভব মানবতার সেবা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে গরিব ও প্রান্তিক মানুষকে সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে আরও উদার নীতি গ্রহণ করা দরকার।
ডায়ালাইসিস ও কিডনি ট্রান্সপ্লানটেশন যেহেতু খু্বই ব্যয়বহুল সে কারণে প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধ কার্যক্রমের উপর জোর দেয়া উচিত। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ভেজালের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত।
চিকিত্সা-অসুখ ইত্যাদি নিয়ে টেলিভিশনে অনেক সৃজনশীল বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নির্মাণ করা দরকার। এগুলো জনগণকে আকর্ষণ করবে। জনগণ উদ্বুদ্ধ হবে।
কিডনিসহ অনেক রোগের চিকিত্সা বাংলাদেশেই সম্ভব। তাই বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে রুগীদের দেশের চিকিত্সা সেবা নেয়ার কথা আগে ভাবা উচিত। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া অহেতুক ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা উচিত।
যেসব বেসরকারি হাসপাতাল গরিব রোগীদের সেবা দেয় তাদের জন্য সরকার কর রেয়াত বা মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা দিতে পারে।
চিকিত্সকদের আরও মানবিক আচরণ করা উচিত। সহজ ভাষায় রোগীকে ওষুধের কাজ ও প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করা উচিত।
শিক্ষা কারিকুলামে স্বাস্থ্যের বিষয়টি সহজ ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা উচিত।
কিডনি দানকে উদ্বুদ্ধ করা উচিত। কিডনি গবেষণা, চিকিত্সা, ট্রান্সপ্লানটেশনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
সুস্থ থাকার জন্য অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা দরকার।
অর্গান ট্রান্সপ্লানটেশন আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করা দরকার।
অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশিদ
প্রতিষ্ঠাতা, কিডনি ফাউন্ডেশন
কিডনি রোগের কথা শুনলেই আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আমরা ভাবি কিডনি রোগ হলেই সব শেষ। সত্যিকার অর্থে তা নয়। কিডনি রোগ হয়েছে, নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। শুধু মাঝে মাঝে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করতে হবে। চিকিত্সকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি কিডনি রোগী আছে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩ শতাংশ বা ৩৫ হাজার রোগীর অবস্থা গুরুতর পর্যায়ে। এদের কিডনি বিকল হতে পারে। মূলত সচেতনতার অভাবে রোগীরা ভীত হন। আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সবাইকে সচেতন করতে হবে। কিডনি রোগ একক কোন রোগ নয়। অনেক রোগের সমন্বয়ে সৃষ্ট একটি রোগ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং মেমব্রেন ফিল্টারিং এই রোগ সৃষ্টির কারণ। সাধারণত দুইভাবে কিডনি আক্রান্ত হয়। ধীর গতিতে এবং তাত্ক্ষণিকভাবে। ধীর গতিতে যখন কিডনি আক্রান্ত হয় তা প্রতিরোধযোগ্য। যে সকল রোগীর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আছে তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ কিডনি রোগে ভোগেন। তাই এই দুইটি রোগ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি টেস্ট করাতে হবে। এতে খরচ হতে পারে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। টেস্টের ফল অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করা হলে একজন রোগী ডায়ালাইসিস বা কিডনি ট্রান্সপ্লানটেশনের হাত থেকে বাঁচতে পারেন। যারা কিডনি পরীক্ষা করাবেন না তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপের কিডনি রোগ নিয়ে চিকিত্সকের কাছে যান। এই অবস্থায় রোগীর কিডনি বিকল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। অন্যদিকে তাত্ক্ষণিক কিডনি বিকল হওয়ার জন্য যে কারণগুলো দায়ী তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, বমি হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, ভেজাল খাবার, পরিমিত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান না করা প্রভৃতি। উপযুক্ত চিকিত্সা দেয়া সম্ভব হলে ৬০ থেকে ৮০ ভাগ তাত্ক্ষণিক কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষ ভাল হয়ে যান।
মাত্রা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহারকে কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুতরাং অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ দেয়ার আগে রোগীর কিডনির অবস্থা সম্পর্কে চিকিত্সককে অবশ্যই জানতে হবে। এ জন্যে প্রথমে চিকিত্সক ও পরে রোগীকে সচেতন করে তুলতে হবে। কিডনি রোগের চিকিত্সার ক্ষেত্রে আমাদের যে সুযোগ আছে তাতে মোট রোগীর ১৫ থেকে ২০ শতাংশকে চিকিত্সা দেয়া সম্ভব। তাই নিজের জন্যই প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টিতে চিকিত্সকদেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
ডা. এএম শামীম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক,
ল্যাবএইড গ্রুপ
গত বিশ বছর ধরে হূদরোগের উপর প্রচারণা চালিয়ে সমাজে অনেক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। এখন একজন রিকশাওয়ালাও জানে বুকের বাম পাশে ব্যথা হলে হাসপাতালে গেলে সে বাঁচতে পারে। কিডনি রোগ সম্পর্কে আমাদের এমনভাবে জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জনপ্রিয় ব্যক্তিরা যদি এই রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে উদ্যোগী হন তাহলে অনেক কাজ হবে।
কিডনি রোগীকে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের পর্যায়ে যেতে হবে না। সচেতনতা শুধু শহরে নয়, গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
কিডনিসহ অনেক রোগের চিকিত্সা বাংলাদেশেই সম্ভব। তাই বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে রুগীদের দেশের চিকিত্সা সেবা নেয়ার কথা আগে ভাবা উচিত। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া অহেতুক ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা উচিত।
যেসব বেসরকারি হাসপাতাল গরিব রোগীদের সেবা দেয় তাদের জন্য সরকার কর রেয়াত বা মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা দিতে পারে।
ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, বমি হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, ভেজাল খাবার, পরিমিত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান না করা প্রভৃতি কারণে কিডনি রোগ হতে পারে। এ বিষয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে। সচেতন করে তুলতে পারলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ রোগী প্রতিরোধের ব্যবস্থার আওতায় চলে আসবে।
অধ্যাপক ডা. রফিকুল আলম
চেয়ারম্যান, নেফ্রোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
কোন রোগ হওয়ার আগেই সচেতন হওয়াটা ভাল। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে আমাদের সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দৈনিক ইত্তেফাক এমন একটি দায়িত্ব নেয়ায় ধন্যবাদ জানাই। ২০০৬ সাল থেকে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমরা কিডনি দিবস পালন করছি। গত বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) কিডনি রোগকে তাদের তালিকাভুক্ত করে এ রোগের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ সাহেবের কথা থেকে বোঝা গেছে একুইট কিডনি ইনজুরি বা ধীরগতির কিডনি রোগ চিকিত্সায় ৭০-৮০ শতাংশ রোগী ভাল হয়ে যায়। কিডনির রোগ সৃষ্টির জন্য ডাক্তারদের কিছু ভূমিকা আছে।
ডাক্তারদের অসচেতনতায় মাতৃত্বকালীন অবস্থায় মায়েদের কিডনি বিকল হয়ে যায়। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যখন রোগীকে বাঁচানোর জন্যে মরিয়া হয়ে (এগ্রেসিভলি) ওষুধ দেয়া হয় তখনও এই সম্ভাবনাটা থাকে। গর্ভবতী মায়ের পায়ে পানি আসা, প্রসাবের রঙ পরিবর্তন হওয়া, চোখে ঘোলা দেখার সমস্যা দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। কিডনি সমস্যা থেকে রেহাই পেতে হলে আমাদের সঠিক খাদ্যাভাস ও প্রতিদিন আড়াই লিটার থেকে সাড়ে তিন লিটার পানি ( যেটুকু পানি খেলে আমাদের বর্জ্য নিঃসরিত হয়) পান করতে হবে। এই সকল ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সচেতনতামূলক ভূমিকা পালন করতে পারে।
অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির
চিফ কনসালটেন্ট, ইউরোলজি বিভাগ, ল্যাবএইড হাসপাতাল
অনেক শিশু জন্মের সময় মায়ের পেট থেকেই কিডনি রোগ নিয়ে জন্মায়। খাতনা করার মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা চলে, যা সম্পূর্ণ হয় না। যারা মধ্যপ্রাচ্যে যান তাদের মেডিক্যাল টেস্ট করাতে হয়।
আমি জানি না কিভাবে সেই টেস্ট করে সার্টিফিকেট দেয়া হয়। কারণ অনেক রোগী আমরা পাই যারা বিদেশ থেকে অল্প সময়ের মধ্যে কিডনি বিকল অবস্থায় দেশে ফিরে আসেন। মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার সময় মেডিকেল টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ। তা ভালোভাবে করাতে হবে। প্রবীণ অনেক ব্যক্তি ভিতরে ভিতরে রোগাক্রান্ত হয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় চলে যান। তারা ভাবেন বয়স হয়েছে বলে শরীর খারাপ লাগে। পরিবারের লোকজনও সময়ের অভাবে তাদের অবস্থার কথা জানতে পারে না। মাঝেমধ্যে তারা প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে কিডনি বিকল করে ফেলে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করা দরকার।
অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ
বিভাগীয় প্রধান, কিডনি বিভাগ
ল্যাবএইড হাসপাতাল
এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ কিডনি রোগ সম্পর্কে সহজ করে বলেছেন, কিডনি রোগ ক্ষতিকর কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য। এই রোগে ভয় নেই শুনলে মানুষ চিকিত্সকের কাছে আসবে না। ফলে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা ধীর কিডনি রোগ অনেক সময় নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন অনেক রোগীই আমাদের কাছে আসে যারা দীর্ঘদিন ধরে রোগকে অবহেলা করে ডায়ালাসিসের পর্যায়ে চলে গেছে। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অধিকাংশ রোগীর ডায়ালাসিসের ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্য থাকে না। ডায়ালাসিসে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০/৬০ হাজার টাকা লেগে যায়। সরকারি হলে খরচ নেই সেটা ভিন্ন কথা।
তাই উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ৫০/৬০ টাকা খরচ করে কিডনি টেস্ট করে কোন সমস্যা আছে কিনা সেটা চিহ্নিত করতে হবে। শুরুতে রোগ চিহ্নিত হলে বিপদ থেকে বাঁচা যাবে।
আর আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়া থেকে বাঁচতে ডায়রিয়া হলে স্যালাইন খেতে হবে। গ্রামাঞ্চলে সাপে কাটলে কাটা স্থানের উপরে এতো শক্ত করে বেঁধে রাখা হয় যে, সে জায়গাটিতে পচন ধরে যায়। পরে আক্রান্ত স্থানটি কেটে ফেলতে হয়। এই সকল ক্ষেত্রে সরকারের সচেতনতা প্রয়োজন। থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটা রোগের চিকিত্সা আছে তাও অনেকের জানা নেই।
প্রান্তিক মানুষকে জানাতে হবে কোন রোগের চিকিত্সা সে কোথায় পাবে। আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মুনাফাখোররা ভেজাল খাদ্য সরবরাহ করে জনস্বাস্থ্যে অনেক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। এজন্য আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা চিকিত্সকরা নিজেদের মধ্যে ক্যাম্প করে অন্য চিকিত্সকদের সচেতন করতে পারি। সচেতন করে তুলতে পারলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ রোগী প্রতিরোধের ব্যবস্থার আওতায় চলে আসবে।
মেজর জেনারেল (অব) ডা. এম শাহজাহান
অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
বাইরের খাবারে রঙের ব্যবহার প্রকট হয়ে উঠেছে। এই বিষয়টিও আমাদের দেখতে হবে। আলোচনায় অনেক কিছুই চলে এসেছে। আমাদের ২ কোটি কিডনি রোগীর ২ লাখও যদি চিকিত্সা করাতে আসে তাহলেও আমরা তাদের চিকিত্সা দিতে পারবো না। তাই গরিব রোগীরা যাতে চিকিত্সা পান সে জন্যে সরকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে তাদের চিকিত্সা সরঞ্জাম শুল্কমুক্তভাবে বা কম শুল্কে আনার সুবিধা দেয়া যেতে পারে। এর বিনিময়ে তারা গরিব রোগীদের চিকিত্সা দিতে বাধ্য থাকবে, এরকম একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
ডা. নওজিয়া ইয়াসমিন
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পাবলিক হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
ডাক্তাদের কথা না বলা আর ভয় দেখানোর অভিযোগসহ প্রায় অনেক বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে। আমি অল্প কথায় ফাস্ট ফুড এড়ানো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ও পরিমিত পানি পানের পরামর্শ দিব। আর ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ একদমই খাবেন না।
অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ
সেন্টার ফর রিচার্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
আমি আর একটু বলতে চাই, আমাদের দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া ভালো না। অপারেশনটি কঠিন এবং ব্যয়বহুল। তাই সচেতন হওয়াই জরুরি। তারপরও কিডনি দানকে উত্সাহিত করতে হবে । যাতে মানুষের আবার জীবন পাওয়ার আশা থাকে।
শাহীন রেজা নূর
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ সাহেবের কথায় আমরা আমজনতা একটু আশার আলো পেলাম। আমি দীর্ঘ দিন যাবত্ ক্যাম্প নামক একটি কিডনি বিষয়ক কাজ করা সংগঠনের সাথে জড়িত। সারা বিশ্বে কিডনি রোগের বিস্তার ঘটে চলেছে। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। রোগ-ব্যাধির সাথে অনেক বিষয় জড়িত থাকে। শুরুতে আসে চিকিত্সা ব্যয়। এই ব্যয় বহনের ক্ষমতা আমাদের অনেকের নেই। চিকিত্সকদের কাছে আমার অনুরোধ তারা যেন চিকিত্সা সেবার প্রচলিত ধারণাকে বাদ দিয়ে ব্যবসাকে বেশি প্রাধান্য না দেন ।
আফজাল হোসেন
অভিনেতা
আমাদের মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলে মানুষও সচেতন হবে। সমস্যা কমে আসবে। আমরা কোন রোগে আক্রান্ত হলে তারপর চিন্তা করতে বসি। সেই ভাবাটা আক্রান্ত হওয়ার আগে ভাবলে অনেক যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আমাদের গণমাধ্যমের এখন মূল কাজ হলো বিনোদন দেয়া। সবেচেয়ে বড় বিনোদন এখন রাজনীতি। প্রত্যেকটি চ্যানেলে রন্ধন প্রণালী প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এই সকল অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সৃজনশীলভাবে আমরা মানুষকে সচেতন করতে পারি। দেশের বাইরে একটি পত্রিকার হেডিং দেখলাম স্বামী হত্যা’র ১০টি নিয়ম। এই হেডিং দেখে যে কেউ সেটি পড়তে আগ্রহী হবেন। পড়ে দেখলাম ১০টি রন্ধনপ্রণালী বর্ণনা শেষে বলা হয়েছে, এভাবে তেল-মসলা দিয়ে রান্না করে স্বামীকে খাওয়ালে অতি অল্প সময়ে স্বামী নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবেন। চ্যানেলগুলোতে রোগ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান দেখায় না। তাদের মতে এগুলো তেমন আকর্ষণীয় নয়। সত্যি কি তাই! আমার এই অনুষ্ঠানগুলোকে সৃজনশীলতার ছোঁয়া দিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারি না! যা সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হবে। বিনোদন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই সচেতন হবেন তারা। আমাদের দেশে সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সিগারেট বিক্রেতা দোকানগুলোর পাশে ঝোলানো থাকে একটি দড়ি। তাতে থাকে আগুন। আমি ভারতে দেখেছি সিগারেটে আগুন ধরানোর জন্যে দোকানের পাশে একটি ছোট্ট মেশিন বসানো থাকে। সিগারেট ধরাতে চাইলে সেই মেশিনের একটি বোতামে চাপ দিলেই একটি হিটার জ্বলে উঠে। হিটারটি জ্বলে উঠার সঙ্গে সঙ্গে মেশিনটি থেকে একটি শব্দও বেরোতে থাকে। বলো হরি হরি বোল, বল হরি, হরি বোল। বলা বাহুল্য এই মন্ত্রটি হিন্দু সম্প্রদায়ের শবযাত্রার সময় বলা হয়। গণমাধ্যমকে এই সৃজনশীল বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে।
সামিনা চৌধুরী
সঙ্গীতশিল্পী
কিডনি রোগীদের সহযোগিতা করার জন্য আমরা অনেক চ্যারিটি শো করেছি। তবে এ অনুষ্ঠানে আসার আগে কেন, কিভাবে সহজেই আমরা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারি তার অনেক কিছুই জানতাম না। যদি সচেতন হই তাহলে রোগ গুরুতর অবস্থায় পৌঁছে না। আমি যেমন নিজে সচেতন হবো তেমন আমার শ্রোতাদের সচেতন করবো। আমি প্রচুর পানি খাই, সবাই বেশি করে পানি খাবেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
প্রধান নির্বাহী, বেলা
আমি আফজাল ভাইয়ের মতো দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছিলাম কেন কিডনি নিয়ে গোলটেবিলে আমাকে ডাকা হয়েছে। যাই হোক, নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি। আমার স্বামীর কিছুদিন পর পর কিডনিতে পাথর হতো। কয়েকবার চিকিত্সার পরও যখন সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না তখন চিকিত্সার জন্য একবার দেশের বাইরে যাওয়া হলো।
বিদেশি চিকিত্সকগণ ওনার খাদ্য তালিকা পরিবর্তন করে দিলেন। তারপর থেকে তিনি ভালই আছেন। এজন্য খাদ্যাভ্যাস সুস্থ থাকার জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাচ্চাদের ফল খাওয়াতে পারি না ফরমালিনের জন্য। ওয়াসার পানির মধ্যে কেঁচো পাওয়া যায়। তার উপর আছে ডাক্তারদের আমলাতান্ত্রিকতা। আমার খালার কিডনি বিকল হলো। তখন ডাক্তাররা আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, আমলাতন্ত্র কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি? ভালো করেতো কথাই বলেন না, কিছু প্রশ্ন করলেও উত্তর দিতে চান না।
তারপরও যা বললেন, ‘আপনার ক্রনিক কিডনি ফেইলর হয়েছে। ২০ শতাংশ কাজ করছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আরও যেসব কথা তারা বললেন তার কিছু বুঝে কিছু না বুঝে আমাদের অবস্থা খারাপ। ডাক্তার না হতে পেরে উকিল হয়েছি। আমরা উকিলরাও কতটা সত্যি কথা বলি তাও আপনাদের জানা। আর ডাক্তাদেরও অনুরোধ করবো, যা হয়েছে তা বুঝিয়ে বলুন।
রোগীদের ভয় দেখাবেন না। কেন একটি ওষুধ দেয়া হচ্ছে, তার কাজ কি হবে, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে - সে সম্পর্কে দয়া করে রোগীদের বুঝিয়ে বলুন। আমার মনে হয় আমাদের ছেলেবেলা থেকে শিক্ষা কার্যক্রমে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যত্ন ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে একটু একটু করে সহজভাবে পাঠ্য থাকা উচিত। যাতে আমরা এইসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিকভাবে যত্ন করতে পারি। ছোটবেলায় আমরা পরিপাকতন্ত্রের যত্ন নিয়ে পড়েছিলাম। এমন কঠিন ছিলো যে, একটা লাইনও মনে নেই।
রোবায়েত ফেরদৌস
সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা জরুরি। এ জন্যে মিডিয়া, বিভিন্ন হাসপাতাল, সরকার, এনজিও, সুশীল সমাজের উদ্যোগ নেয়া উচিত। এই কাজকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে এগিয়ে নেয়া দরকার। কিডনি রোগ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যমকে আরো সংবেদনশীল হতে হবে।
আশিস সৈকত
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
কোন রোগ হলে মানুষ কোথায় যাবে? কি করবে? এই বিষয়গুলো আমাদের সাধারণ মানুষরা আজও ভাল করে জানে না। তাদের সচেতন করার জন্য আমরা এমন আলোচনার আয়োজন করে থাকি। আমাদের অনেক প্রতিকূলতা আছে, তারপরও সামাজিক দায়বোধকে এড়ানো যায় না।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা ব্র্যাকের সাথে যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ে এমন আলোচনার আয়োজন করেছি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকে বিশ্ব কিডনি দিবসের এই আলোচনা। আমি আশা করবো ল্যাবএইডের সহযোগিতায় এই আলোচনা মানুষকে সচেতন করবে। ভবিষ্যতেও আমাদের এমন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
আবুল খায়ের
নগর সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
ভেজাল খাদ্য নিয়ে আমি দীর্ঘদিন কাজ করে দেখেছি এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মাছ ব্যবসায়ীরা মাছেতো ফরমালিন দেয়ই, আবার ফরমালিন দিয়ে বরফ তৈরি করে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
