১/১১তে জিল্লুর রহমান বলিষ্ঠ ভূমিকা না রাখলে গণতন্ত্র ফিরে আসতো না

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৩, ২২:২০
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের পর জিল্লুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলেই বাংলাদেশ গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছে। ওই সময় তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা না রাখলে দেশের জনগণ গণতন্ত্র ফিরে পেত না। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, জিল্লুর রহমান নিজ গুণে জাতির অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু এমন এক সময় তিনি চলে গেলেন যখন তার খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। গতকাল শনিবার রাতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সভাপতি হিসেবে প্রারম্ভিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সভায় বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে একটি শোক প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গ্রহণের পর সভা মুলতবি করা হয়। শোক প্রস্তাব পাঠ করেন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আব্দুল মান্নান খান। পরে সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রস্তাবক্রমে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বৈঠক মুলতবি প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেন বৈঠকে উপস্থিত সবাই। প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, দেশ ও জাতির জন্য আমৃত্যু তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, দেশের ইতিহাসের পাতায় তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দলমত নির্বিশেষে তিনি সবার আপন ছিলেন। নিজ কর্মদক্ষতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি নিজেকে এভাবে গড়ে তুলেছিলেন। রাজনীতিকে তিনি রাজনীতি দিয়ে উপলব্ধি ও বিচার করতেন। তার মৃত্যুতে আমরা যেমন একজন অভিভাবককে হারালাম, দেশের জন্য একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। এ ক্ষতি কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়। প্রয়াত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার পারিবারিক দীর্ঘ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে আবেগাপ্লুত শেখ হাসিনা বলেন, ছোটবেলা থেকে জিল্লুর রহমানকে আমরা চিনতাম। তাকে আমরা চাচা বলে সম্বোধন করতাম। আর তিনি কোনো সময় মা ছাড়া আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন না। কিন্তু আনুষ্ঠানিক দলীয় কোন কর্মসূচিতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি দলের সভানেত্রী হিসেবে আমাকে সম্পর্কে ঊর্ধ্বে উঠে সম্মান দিতেন। বঙ্গবন্ধু জিল্লুর রহমানের বিয়ের সাক্ষী ছিলেন উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতির জন্য আমার মা কনে দেখেছেন। আমাদের বাড়িতে জিল্লুর রহমানের গায়ে হলুদ হয়েছে। আমাদের সেই সময়ের ১১১ নম্বরের লাল জিপ গাড়িতে চড়ে তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছেন। আমার বাবা বিয়েতে সাক্ষী পর্যন্ত হয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে জিল্লুর রহমান কখনো বিচ্যুত্ হননি। ১৯৪৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিল্লুর রহমানের যে রাজনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল আমৃত্যু সে থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত্ হননি। পাকিস্তান আমল থেকে এ দেশের ওপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাত আসলে জিল্লুর রহমান সব সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থেকেছেন। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, জিল্লুর রহমান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একসঙ্গে রাজনীতি শুরু করেছিলেন, সেই একটি অধ্যায় আজ শেষ হয়ে গেল। আওয়ামী লীগের সঙ্কটকালে জিল্লুর রহমান দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানের মৃত্যুর পর অত্যন্ত ভেঙ্গে পড়েছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। কিন্তু এর মধ্যেও দলের যখনই সঙ্কটকাল সামনে এসেছে তখনই তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর একজন সফল রাষ্ট্র পরিচালক হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে জিল্লুর রহমান প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। দেশের ইতিহাসে প্রথম দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সবার সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। বিগত সময়ে সবাই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নিজেদের পছন্দমতো নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। ইচ্ছা করলেই রাষ্ট্রপতি আমাদের অনুরোধক্রমে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এমনকি প্রধান বিরোধীদলও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়ে পরামর্শ দেন। পরে সবার পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সত্যিই বিরল এক ঘটনা। দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে এভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন রাষ্ট্রপতি। শেখ হাসিনা বলেন, কাউকে কোনদিন আপনি ছাড়া কথা বলতেন না প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ছোট-বড় সবাইকে তিনি আপনি বলে সম্বোধন করতেন। কোনদিন তিনি কারোর মনে কষ্ট দেননি। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান যাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। দেশ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান তাকে দিতে পেরেছে, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়েছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতির ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা যাতে শোক সইবার শক্তি পায় সেজন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধীদলসহ দলমত নির্বিশেষে সবাইকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। আওয়ামী লীগের ওপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের ওপর যতো ঝড়-ঝাপ্টা এসেছে, বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে এতো প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়নি। আওয়ামী লীগকে কিভাবে শেষ করা যায় সবাই সেই চেষ্টাই করেছে। তবে সব প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়ে জিল্লুর রহমানের মতো অনেকেই দলের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস ও আদর্শ অটুট রেখে চলেছেন বলেই আওয়ামী লীগ আজ এতো বড় শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে সক্ষম হয়েছে।