ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্নেডোয় মৃতের সংখ্যা ২৩

মানবেতর দিন কাটাচ্ছে বিধ্বস্ত এলাকার মানুষ

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৩, ২২:২৫
শুক্রবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্নেডোর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া গ্রামের মানুষ সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার সকালে এক মহিলার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ২৩-এ দাঁড়িয়েছে। টর্নেডো বিধ্বস্ত এলাকার গ্রামগুলোর মানুষ বিভিন্ন স্থানে তাদের আসবাবপত্রের সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছে। ১৪-১৫ মিনিট স্থায়ী টর্নেডোতে কি পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে তা এখনও নিরূপণ করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরসহ ৩টি উপজেলার ১৫টি গ্রামের সর্বত্রই ধ্বংস ও ক্ষতের চিহ্ন। গ্রামগুলো হচ্ছে:সদর উপজেলার রামরাইল, উরশিউড়া, জারুলতলা, ভাতশালা, পাতিহাতা, পাইকপাড়া, চিনাইর, চান্দি, বাসুদেব, ফুলবাড়িয়া, চান্দপুর, কোড্ডা, বিজয়নগর উপজেলার সিংগারবিল, পত্তন এবং আখাউড়া উপজেলার আমোদাবাদ গ্রাম। টর্নেডোতে গ্রামের অনেক বসতবাড়ি মাটির সাথে মিশে গেছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি। গ্রামের শতাধিক গবাদিপশুর মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। গ্রামের সংযোগ সড়কগুলোতে গাছ পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। গ্রামগুলোতে চলছে হাহাকার। অধিকাংশ পরিবার আবাসস্থল হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। অবস্থান করছে খোলা আকাশের নিচে। ভাতশালা গ্রামের একরের পর একর ধানী জমি পুড়ে গেছে। পাশপাপাশি গ্রামের বেশিরভাগ বাঁশের ঝাড় জ্বলে গেছে। টর্নেডোতে নিহতরা হচ্ছেন:সুলতানপুরের উরশিউড়া গ্রামের ডলি, রানী দে (৩০), পাতিরহাতা গ্রামের লাভলী বেগম (৩০), চিনাইর গ্রামের লালু চৌধুরী (৬৫), আঙ্গুরা বেগম (৫৮), হুসনা বেগম (৬২), রোকেয়া বেগম (৫৫), আমেনা বেগম (৪২), শিশু মায়েশা (২ মাস), ভাতশালা গ্রামের আজমল মোল¬্লা (৩৬), মাহমুদুল হক (৪২), এমদাদুল মোল্ল¬া (৩৯) কবীর (৩৫), কোড্ডা গ্রামের রানা মিয়া (২২), চান্দি গ্রামের ফজলু মিয়া (৭০), তাজুল ইসলাম (৫০), দোবলা গ্রামের নাজমা বেগম (২৫), রামরাইলের আবু তাহের (৬৫), জেলা কারাগাররক্ষী (২২০০১ নং) মাকসুদুল আলম (২৯), নিলা আক্তার (১৬), ইয়াছমিন (৩২), অজ্ঞাত শিশু (২ বছর), পত্তন গ্রামের বাবলী বেগম (২১)। গতকাল শনিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম তাজুল ইসলাম এমপি, আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী এমপি, দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাউল আলম, মহাপরিচালক আব্দুল ওয়াজেদ, বিজিবি’র কুমিল্ল¬া সেক্টর কমান্ডার কর্নেল একেএম সাইফুল ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এদিকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন এবং ত্রাণ সহায়তা প্রদান করছেন। কুমিল্ল¬া সেনাবাহিনীর ২টি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’র ১টি, জেলা পুলিশের ১টি, সিভিল সার্জনের ২টিসহ ৬টি মেডিক্যাল টিম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চিকিত্সা কাজে সহায়তা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে সরকারিভাবে প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিকে ২০ হাজার টাকা, আহতদের ৬ হাজার টাকা, ২ বান্ডিল টিন, ক্ষতিগ্রস্ত ৫শ পরিবারের মধ্যে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে। সরকারি হিসেবে আহতের সংখ্যা ৩শ। জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল প্রত্যেক নিহত পরিবারকে নগদ ১০ হাজার টাকা করে প্রদান করেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে আমি এখন সর্বস্বান্ত। জীবনের অর্জিত টাকা দিয়ে নতুন ঘর করেছিলাম। সেটির টিনও আজ খুঁজে পেলাম না। আমি এখন খোলা আকাশের নিচে। আমি থাকবো কোথায়? এ আহাজারি করছিলেন চিনাইর গ্রামের সিএনজি চালক মো. মলাই মিয়া। স্ত্রী, ২ পুত্র, ২ কন্যা সন্তান নিয়ে তার সুখের সংসার ছিল। একই গ্রামের বাসির আহমেদ মা, চাচী, ২ চাচাতো ভাইয়ের বউকে হারিয়ে কান্নায় বিলাপ করছিল। বাড়িঘরও ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছে। আমি কোথায় ঠাঁই পাব? একই বাড়ির শামীম আর্তনাদ করে বলেন, আমার দুই নানু ও দুই মামীকে হারিয়ে আমি গভীর শোকাহত। আমার বাড়িঘরও ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশে গেছে। আমার এখন কি হবে। আমি কোথায় যাব? এরকমই আহাজারি ছিল চিনাইর, ফুলবাড়িয়া, ভাতশালা, উরশিউড়া, জারুলতলাসহ ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন গ্রামের মানুষ। আরো এক শিশুর মৃত্যু :ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় টর্নেডোর আঘাতে আহত ৯ মাসের শিশু সাবিহা গতকাল শনিবার রাত পৌনে ৯টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে। সে চিনাই চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের কন্যা। এছাড়া টর্নেডোর আঘাতে আহত আরো ৯ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছে। ১৪ জনকে প্রাথমিক চিকিত্সার পর ছেড়ে দেয়া হয়। পঙ্গু হাসপাতালে টর্নেডোর আঘাতে আহত ৩ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। ৬টি মেডিক্যাল টিম দুর্গত এলাকায় :ব্রাহ্মণবাড়িয়া টর্নেডো দুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে ৬টি বিশেষজ্ঞ দল আহতদের উন্নত চিকিত্সা সেবা দিচ্ছেন। গত শুক্রবার রাত থেকে এই ৬টি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য সচিব এমএস নিয়াজ উদ্দিন গতকাল টর্নেডো দুর্গত এলাকায় গিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা, খন্দকার মোঃ সিফায়েত উল্লাহ বলেন, টর্নেডো দুর্গত এলাকায় চিকিত্সা সেবায় সারাক্ষণ মনিটর করা হচ্ছে। প্রর্যাপ্ত ওষুধ সামগ্রী পাঠানো হয়েছে। চিকিত্সা সেবা নিয়ন্ত্রণে বলে তিনি জানান।