ওরা কি খুঁজে পেল স্বপ্নের স্বদেশ?

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪১
১৯৭১! ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদ, আড়াই লক্ষ নারীর মহান আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের সূচনালগ্নে এক দুর্বিষহ দুর্যোগের ভয়াবহতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বাংলাদেশ ও অগণিত অত্যাচারের শিকার নারীর। যারা পাকিস্তানি আর্মিদের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে বয়ে বেড়িয়েছেন অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের দুঃসহ যন্ত্রণার নিকষ প্রহর। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে এ ছিল এক ভয়াবহ করুণ অধ্যায়। লক্ষ লক্ষ পরিবারের সামাজিক সম্মান, সংকট ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ছিল প্রতিকূল। যুদ্ধের ৯টি মাস যেসব নারী দিনের পর দিন পাকিস্তানি আর্মিদের দ্বারা বর্বরচিত পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন দেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্নে তারা ছিলেন এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি। সমাজে, পরিবারে অনেকেই স্থান পাননি। আর অনেকেই তাদের প্রকৃত সত্যকে গোপন করেছেন, করেছেন বেঁচে থাকার দুঃসহ লড়াই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সকল নারীকে ‘বীরাঙ্গনা’ বলে সম্মানিত করলেও স্বাধীনতার চার দশক পরও বীরাঙ্গনা নারীরা রয়েছেন দৃষ্টির সীমা হতে বহুদূর। আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রসঙ্গ ‘যুদ্ধ শিশু’, যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার রীতিমত এক সংকটে পড়ে। সেই সময় এগিয়ে আসে রেড-ক্রস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো, মাদার তেরেসা স্বয়ং এবং তার হোম ও বাংলাদেশ সরকার। আসলে সুতীব্রভাবে প্রসঙ্গটাকে আড়াল করাটাই ছিল অভীষ্ট লক্ষ্য। আর এর মূল কারণ ছিল আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি। বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ শিশুরা ছিল সামাজিক স্বীকৃতি বঞ্চিত। এই প্রসঙ্গে আমরা কথা বলেছি মুক্তিযোদ্ধা ভাষ্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী (যিনি নিজেকে ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন না) ও কানাডা প্রবাসী বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক মুস্তাফা চৌধুরীর সাথে (যিনি দীর্ঘদিন থেকে যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে গবেষণা করছেন)। ‘বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ শিশুরা ছিল মানবিক বিপর্যয়ের এক প্রামাণ্য দলিল’ —ভাষ্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ১৯৭১ সালের ভয়াবহ ক্ষত বয়ে বেড়াতে হচ্ছে আজও আমাদের, যারা এই জীবন-যুদ্ধের লড়াই করেছি, যাদের জীবনে ঘটেছে এই দুঃসহ পাশবিকতা! অন্যদের পক্ষে এ কষ্ট বোঝা অসম্ভব! ৭১-এর প্রেক্ষাপটে ‘বীরাঙ্গনা’রা যে ভয়াবহ নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছিলেন, স্বাধীন দেশেও তাদের যুদ্ধ ছিল নিরন্তর। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তীকালে লক্ষ লক্ষ নারী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। সেই সময় অগণিত নারীকে গর্ভপাত করানো হয়। তার মধ্যে আমিও ছিলাম। কিন্তু যে নারীরা পারেননি বা গর্ভপাত করানো সম্ভব হয়নি তাদেরকে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান প্রসব করতে হয়েছে, আর এরাই যুদ্ধশিশু! সেই সময় সামাজিক ভীতি ও অনাহুত সন্তান গ্রহণে কোন মা-ই সক্ষম ছিলেন না। প্রতিটি মা-ই ছিলেন পলায়নপর, আত্মগোপনকারী। আমি নিজেও সেই মুহূর্তে তাদের মতোই ছিলাম। যুদ্ধশিশুদের নিয়ে সরকার, জনসেবামূলক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, রেডক্রস ও মাদার তেরেসার যে ভূমিকা তা ছিল সময় উপযোগী। এতোগুলো যুদ্ধশিশুকে প্রতিষ্ঠিত করতে, দত্তক দিতে তারা কাজ করেছেন। আসলে সেটি ছাড়া বিকল্প কোন উপায় ছিল না। কারণ সামাজিক প্রেক্ষাপটে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের অবস্থান মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় ঠাঁই পায়নি। ১৯৯৮ সালের দিকে ডেনমার্ক থেকে আমার কাছে ১৮ জন যুদ্ধশিশু আসে দেখা করতে। ছেলে-মেয়ে মিলে ১৮ জন। কি অপূর্ব তাদের চেহারা, অপূর্ব তাদের দর্শন। মুক্তিযুদ্ধ, দেশ ও মা’দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ওরা এসেছিল শেকড়ের টানে। ওদের মায়েদের কারোর দেখাই মেলেনি। ওরা আমাকে ‘মা’ বলে ডাকে, আমার কাছে খুঁজেছিল মায়ের আশ্রয়। আমার হাতের রান্না খেয়ে ওদের কি আনন্দ! আমি সত্যিই অভিভূত হই এবং কষ্টে...অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ি। আবার এও দেখলাম, তারা সুযোগ্য হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নিজস্ব অবস্থানে। পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নভাবেও অনেক যুদ্ধশিশু এসেছে। তারা এখন তরুণ। যুদ্ধের কথা, অদেখা মায়ের কল্পনা ও স্বদেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ওরা যখন ‘মা’ বলে ডাকে, তখন সত্যিই মনে হয় জীবনটা ধন্য, এ অনুভূতি বড়ো অন্যরকম। আমার মনে হয় বাংলাদেশের সামাজিক, আর্থিক, সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ১৯৭১-এর মানবিক বিপর্যয়ের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুরা থাকত। কিন্তু এখনও উচিত এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা এবং বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে ‘৭১-এর চেতনার সাথে অন্তর্ভুক্ত করা, উপলব্ধি করা। এ উদ্যোগ নিতে পারে রাষ্ট্র। ’৭১-এর যুদ্ধ শিশু —লেখক ও গবেষক মুস্তাফা চৌধুরী গবেষণা শুরু করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের ওপর। কাজ করতে গিয়ে পেলাম চাঞ্চল্যকর দলিলপত্রের সন্ধান, যা ৭১ এর অবাঞ্ছিত যুদ্ধ শিশুদের দায়িত্ব গ্রহণে কানাডার উদ্যোগ, পরিশ্রম ও ত্যাগের প্রমাণ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও নারীর গণধর্ষণ ও যুদ্ধ শিশু বিষয়ে গবেষণা একটু কমই হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পরপরই পৃথিবীর যে সব অগ্রগামী দেশ এগিয়ে এসেছিল বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতে তার মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া ও কানাডার নাম উল্লেখযোগ্য। একই সময় অনেক জনসেবামূলক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন জাতীয় স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠানও এই শিশুগুলোর রোগ ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসে। তার মধ্যে কানাডার ‘ফ্যামিলিজ ফর চিলড্রেন’, এর নাম সর্ব প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়। এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি পরিবারের মানব প্রেমের দৃষ্টান্ত ভোলা যাবে না। ৭১’ এর পর মানুষের প্রাণে ছিল অনাবিল মুক্তির আনন্দ। কিন্তু শঙ্কিত, ভীত, অসম্মানিত (কখনো) ছিলেন। ‘অবাঞ্ছিত’ যুদ্ধ শিশুদের মায়েরা। এই নিষ্পাপ, অসহায় নারীগুলো খুঁজছিলেন একটু গোপন নিরাপদ আশ্রয়। রক্ষণশীল সমাজ তাদের অসহায় যন্ত্রণার কথা সহানুভূতির সঙ্গে ভেবে দেখতে পারেনি, ঘৃণা ও অবহেলার চোখেই দেখেছে। বীরাঙ্গনারাও তখন এবং এখন সামাজিক বহু বিচিত্র কুসংস্কারের প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি বা পায় না। হাজার বছরের ঘুণে ধরা সমাজের আষ্টেপৃষ্ঠে সে কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতা জমে আছে, সেই ক্ষুদ্রতা ও কূপমণ্ডূকতার বেড়া ভেঙ্গে আলোয় বেরিয়ে এসে সেদিন অনেক বাঙালিই সেই অবাঞ্ছিত শিশুদের কোলে তুলে নিতে না পারলেও বেশ কিছু কানাডিয়ান দম্পতি যাদের সন্তান থাকার পরও আইনসঙ্গত ভাবে দত্তক নিয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন ড. রবার্ট ফেরি ও তার স্ত্রী হেলকা ফেরি, ফ্রেড কাপুচিনো, বনি কাপুচিনো, লিজ মোলিং প্রমুখ। ১৫টি যুদ্ধ শিশু নিয়ে তারা কানাডা পৌঁছান ২০ জুলাই ১৯৭২। এই যুদ্ধ শিশুগুলোকে তারা পরম স্নেহ, মমতা ও সম্মানের সাথে বড়ো করেছেন। উপযুক্ত শিক্ষা ও বৃহত্তর পরিবেশে প্রসারিত করেছেন তাদের জীবন। তারা জানে তাদের অস্তিত্বের ইতিহাস, ধর্ষিতা মায়েদের নির্মম যন্ত্রণার কাহিনী, তাদের জীবনেরও কিছু অভিশপ্ত অভিজ্ঞতা কেমন করে সমাজ সবময়ই তাদের দিকে বক্রভাবে তাকায়, তাদের নিয়ে কি রকম কানাকানি হয়! তাদের অন্তর্জ্বালা কি স্বাভাবিক মানুষেরা আমরা অনুভব করতে পারবো? তাদের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে আমি খুবই ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি, জেনেছি ওদের কথা। তারা খুবই সংবেদনশীল, সহমর্মী! বাংলাদেশ ও মায়েদের জন্য তারা খুবই আকুল। সেই সব মায়ের প্রতি তারা ভীষণ কৃতজ্ঞ ও শ্রদ্ধাবনত যে, এতো কষ্টের পরও মায়েরা তাদের পৃথিবীর আলো দিয়েছেন। এবং তারা এই বাস্তবতাও জানে যে, সেই মায়েদের পক্ষে তাদেরকে লালন করা সম্ভবপর ছিল না। যে বাবা-মায়েরা তাদের দত্তক নিয়েছেন, তাদের তারা ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু মনের কোণে বাংলাদেশ ...এবং মায়েদেরকে দেখবার আকুলতাও প্রবল। তারা চায় বাংলাদেশে ওয়ার ক্রাইমসগুলোর বিচার হোক। তারা মনে করে, এই স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য তাদের মায়েরা যে আত্মত্যাগ করেছেন সেই প্রাপ্য সম্মানটুকু যেন মায়েরা পান অতঃপর এই স্বাধীন দেশের তারাও গর্বিত অংশ। বাংলাদেশ তাদের কাছে এক স্পর্শকাতর ভালোবাসা। তাদের মনের ক্ষোভ, ভালোবাসা, অভিমান স্বপ্ন নিয়ে একটি তথ্য নির্ভর বই প্রকাশ করছি আগামী ডিসেম্বরে। ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইটির দ্বিতীয় খণ্ডের উদ্ধৃতি মনে পড়ছে একজন বীরাঙ্গনার বয়ান থেকে ‘একদিন পাঁড় মাতাল হয়ে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আমি জানি আজই আমার শেষ দিন। আমাকে টেনে নিয়ে আমার পরনের লুঙ্গিটা দিয়ে আমার চুলের ঝুঁটি বেঁধে চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে পাখার সঙ্গে লটকে দিয়ে সুইচ অন করে দিল। তারপর আর জানি না অন্য মেয়েরা বলেছে প্রথমে জানোয়ারগুলো হেসে উঠেছিল!’ আরেকটি জায়গায় আছে, ‘এখানে খাওয়া দিতো, ডাল, রুটি, ভাজি-রুটি আর সকালে চা ও রুটি খেতাম। জানেন মায়ের দেয়া দুধ ভাত ফেলে এসেছি। কিন্তু শত্রুর দেওয়া জঘন্য খাবার পেটপুরে খেয়েছি। কারণ আমি ঠিক করেছিলাম বাঁচবো, আমার তো সবই গেছে আছে শুধু জানটুকু। প্রতিশোধ নেবার জন্য বাঁচবো। আমি কখনো ভাবতেও পারিনি মানুষ নামের জীব এমন জঘন্য হতে পারে। একটা নারীদেহ যে এমন বীভত্সভাবে বিকৃত উপভোগ্য হতে পারে তা বোধ হয় মনোবিজ্ঞানীরাও জানে না। অতগুলো মেয়ে একসাথে শেষে মনে হতো আমরা সবাই ঘৃণা, লজ্জা, ভয়কে জয় করে ফেলেছি।’ এই স্বাধীনতার মাসে সেইসব বীরাঙ্গনাকে স্যালুট জানাই সমাজ ও দেশ যেন তাদের আত্মত্যাগের মূল্য দেয়! যে স্বপ্নের দেশের জন্য তারা জীবনের সর্বস্ব হারালো ওরা কি সেই স্বপ্নের স্বদেশ খুঁজে পেল? প্রিয়রঞ্জিনী