প্র জ ন্ম আ ই ক ন

সফল যিনি কেমন তিনি

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৫
শুধুমাত্র নিজের মেধা এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমেই নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন সফলতার শীর্ষে। ছোটবেলায় প্রায় সকলেই জীবনের লক্ষ্য নিয়ে অনেক রচনাই লিখেছেন, সেখান থেকেই হয়তো শুরু জীবনের ছক কষা। কিন্তু তিনি কখনোই নিজেকে এই ছকে ফেলেননি। জীবনকে কখনোই কোনো নির্দিষ্টতায় আটকে ফেলতে চাননি, বরাবরই নিজের ভালোলাগাকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন, কাজের মাঝে নিজের তৃপ্তি খুঁজেছেন। বলছিলাম প্রজন্মের সফলজন স্যাটেলাইট টেলিভিশন দেশ টিভির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরিফ হাসান সম্পর্কে। তার সফলতার পেছনের গল্পগুলোই উঠে এসেছে আমাদের এবারের আয়োজনে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোহাম্মদ মোর্শেদ নাসের দেশ টিভির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপারটি আসলে সেরকম নির্দিষ্ট কোনো ভাবনা থেকে আসেনি। ভালো একটা কিছু করতে হবে সেটাই ছিল মূল ভাবনা। মূলত এভাবেই শুরু। জীবনের এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পূর্ব-ভাবনাচিন্তা ছাড়াই। নির্দিষ্ট ছকে জীবনকে আটকে রাখার কোনো ইচ্ছেই ছিল না তার। আপাদমস্তক নিজের ভালোলাগার বাস্তবায়নই ছিল মূল উদ্দেশ্য। বলছিলাম দেশ টিভির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরিফ হাসান-এর কথা। যখন তিনি অ্যাসোসিয়েশন অব টিভি চ্যানেল ওনার’স (এডকো)-এর ট্রেজারার হন, তার নিজের কাছেই পুরো ব্যাপারটি ছিল অস্বাভাবিক কিছু। অ্যাসোসিয়েশন অব টিভি চ্যানেল ওনার’স (এডকো)-এর ট্রেজারারের দায়িত্ব হঠাত্ করে পেয়ে যান। এটি তার ভাবনার মধ্যেও ছিল না। যখন দেশ টিভি যাত্রা শুরু করে তখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে কনিষ্ঠতম টিভি চ্যানেল ওনার। দেশ টিভিতে আসার পর সফলতা কতটুকু পেয়েছেন? কেমন ভাবনাতেই বা আপনারা কাজ করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফ হাসান বলেন, ‘দেশ টিভিতে মালিক বা কর্মকর্তা এমন বিভাজনটা আমি করি না। সবাই একসাথে ভালো কিছুর জন্য কাজ করছি। আর আমিও বেশ উপভোগ করি এখানে কাজ করতে। আমার প্রথম চাওয়াটা থাকে যেন কেউ আমাকে ভুল না বুঝে। আর দুজনের কথা না বললেই নয়—আসাদুজ্জামান নূর ও সাবের হোসেন চৌধুরী। তারা আমাকে কাজের এত স্বাধীনতা দিয়েছেন যে এটা নিয়ে আমি একটু ভয়েই থাকি। অবশ্য কোনো ত্রুটি হয়ে গেলেও তারা হাসিমুখে বুঝিয়ে দেন।’ আরিফ হাসানের বাবা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। পাঁচ ভাই দুই বোন নিয়েই ছিল তার পারিবারিক আবহ। বড় ভাইয়েরা দেশের বাইরে থাকেন। তাদের অনুপ্রেরণায় তিনিও আমেরিকায় গিয়েছিলেন এইচএসসি পরীক্ষার পরে। বড় ভাইয়েরা বললেন, ‘এখানেই লেখাপড়া কর’, কিন্তু তার মন টানেনি। কেননা সেই সময় তার মনে হলো, বাবা চাকরি থেকে সবেমাত্র অবসরে গিয়েছেন। তিনি যে জুম্মার নামাজ পড়তে যাবেন, কার সাথে যাবেন? সবাই যদি বিদেশে থাকে তাহলে কীভাবে হবে? এই ভাবনা থেকে আবার ফিরে এলেন দেশে তারপর আরও কয়েকবারই গিয়েছেন বিদেশে। তবে স্থায়ী হতে নয়, ঘুরতে। কেননা দেশ থেকে, নিজের পরিবারের থেকে কোনোভাবেই নিজেকে আলাদা করতে চাননি। তার ভাষ্যমতে, তার স্ত্রী-সন্তানেরাও বিদেশে ঘুরতে যান, কিন্তু থাকতে চায়নি কখনও। কেননা নিজের এই ভাবনাটি শুধু নিজের মাঝেই নির্দিষ্ট রাখেননি, ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজের পরিবারেও। আরিফ হাসানের বাবা একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। নিজের সততা থেকে এতটুকুও পিছপা তিনি হননি কখনও। এ প্রসঙ্গেই তার কাছে প্রশ্ন ছিল—চাকরিজীবী পরিবারে তো ব্যবসায়ী মনোভাব খুব কম দেখা যায়, আপনি কীভাবে অনুপ্রাণিত হলেন? তার সাবলীল উত্তর ছিল, ‘সত্যি বলতে কি, আমাদের সাত ভাই-বোনের বিশাল পরিবার আব্বা কীভাবে সামাল দিয়েছেন ভাবলে এখনও কষ্ট লাগে, ভয়ও লাগে। তিনি পূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীনই গুলশান-বনানীতে রাজউক থেকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হতো। নিজের মন্ত্রণালয় বলেই তিনি কখনও সেখানে আবেদন করেননি। তখন মনে হতো, সরকারি চাকরি করলে আমি কি পারব আব্বার মতো সত্ থাকতে? তেমন একটা ভাবনা থেকেই ব্যবসার দিকে ঝোঁক।’ নিজের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ব্যাপক সন্তুষ্ট থাকার পরও মাঝে মাঝেই তার মনে হয়, ‘শুরুটা ভালো হয়েছে, এই পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কোনটার পর কোনটা হবে—এভাবে ছক কেটে কিছু করা হয়নি। শুধু কাজ করার তীব্র ইচ্ছাটা ছিল।’ এখন পর্যন্ত তার কাজের সবগুলো অভিজ্ঞতাই ইতিবাচক। তার মতে, ছোট হওয়ার কারণে মাঝে মাঝে একটু ছাড়ও পেয়েছেন তিনি। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের হেড অব নিউজের কথাই ধরি, বয়সে তিনি আমার চেয়ে বড়। তাকে কোনো কিছু ভুল বলে ফেললেও তিনি বিনয়ের সাথে সেই কথাটি বুঝিয়ে বলেন।’ তার কাছে পরিশ্রম আর সাফল্যের সংজ্ঞা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনে করুন, আপনি বার ঘণ্টা কাজ করলেন, কেন খাটলেন বুঝলেন না, তাহলে এটা পরিশ্রম না। অল্প খেটেও ভালো কাজ করা যায়। আমাকে কোনো কাজ শুরুর আগে সেটা ভালোমতো বুঝতে হবে, তারপর এগোতে হবে। আর এভাবে বুঝে কাজ করলে সাফল্য আসবেই। আর আপনার রেপুটেশনটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রেপুটেশন ভালো থাকলে ব্যবসায় অনেক এগিয়ে যাওয়া যায়। এ জন্য কিন্তু ছল-চাতুরী করা যাবে না, ভুল হয়ে গেলে স্বীকার করে নিতে হবে, তা না হলে কিন্তু পিছিয়ে পড়তে হয়।’ নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন ও পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই প্রজন্মকে কেন জানি অবুঝ মনে হয়। আমরা তাদের এত বেশি যত্ন নিই যে, তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে না। আমি যখনই সময় পাই, তখনই সন্তানদের সাথে বেশি সময় দিই। এ জন্য তাদের মাঝে স্বাধীনচেতা মনোভাবটা কম। আমি কিন্তু কখনোই মা-বাবার কড়া শাসনে ছিলাম না। নিজেকেই আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এটা না করতে পারলে কিছুই পারবেন না। নিজেকে প্রথমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তাহলেই পরবর্তীতে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। দুনিয়াটা তো আসলে এখন অনেক বড়। একটু স্থির হলেই কিন্তু অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে, তারা চাইলে অনেক কিছু করতে পারে।’ ছোটবেলা থেকে তার খুব শখ ছিল, গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করার। কারণ তিনি সেই ছেলেবেলাতেই দেখেছেন গ্রামের মানুষের প্রতি তার বাবার ভালোবাসা। এই অনুভূতি তার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। সেই ভালোবাসা থেকেই তিনি তার গ্রামে একটি হাসপাতাল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামের জমি কেনার পর মানুষ ভাবতে শুরু করল তিনি নির্বাচন করবেন। তাদের এই ভাবনার কারণেই হাসপাতাল নির্মাণের এই মহতী উদ্যোগ থেকে নিজেকে আপাতত দূরে রেখেছেন। নির্বাচন করতেই হবে তা মোটেও জরুরি বিষয় নয়—এমনটি বিশ্বাস করেন আরিফ হাসান। তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন গ্রামের এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করা। ছবি :দীপঙ্কর দীপু এক নজরে আরিফ হাসান ডাক নাম :আরিফ জন্ম তারিখ ও স্থান :২৭ জুন, কুমিল্লা মায়ের নাম :মালেকা পারভীন বাবার নাম :আব্দুল আজিজ প্রথম স্কুল :লিটল জুয়েল’স স্কুল, ঢাকা। প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রিয় উক্তি :জীবনে যত নত হবে, জীবনে তত বড় হবে। প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি অবসর কাটে যেভাবে :বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে সাফল্যের সংজ্ঞা :সততা।