ভারতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যক্তি উদ্যোগ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৩৫
শরত্ জীবন ভারতের চেন্নাইতে জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছে সৌদি আরবে আর ইংল্যান্ডে, কেমব্রিজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, তারপর ফ্রান্সের বিখ্যাত ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইনসিড’ থেকে এমবিএ শেষে বস অ্যালেনে ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরে ব্রিটেনে ইবিতে চাকরি গ্রহণ করেন। স্মৃতিচারণ করে শরত্ জীবন বলেন, প্রতি গ্রীষ্মে আমি দিল্লীতে যেতাম তারপর সেখান থেকে মুম্বাইতে। সেখান থেকে বস্তি এলাকাগুলোর ভিতর দিয়ে আমাদের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় বস্তির ছেলেমেয়েরা ট্যাক্সির নিকট ছুটে আসতো কিছু বিক্রির আশায় অথবা নিতান্তই ভিক্ষার জন্য। এই হতভাগ্য মানুষগুলোর দুর্দশা আমাকে প্রত্যক্ষ করতে হলো। মনে হতো শিক্ষাই তাদের জীবনে সত্যিকারের একটা পরিবর্তন আনতে পারে। সমস্যাটা যে বিদ্যালয়ের অপ্রতুলতার জন্য তা নয়। ভারতে নিজেদের আবাসিক এলাকা থেকে শতকরা ৯৫ ভাগ শিশুরই আধা মাইলের (৮০০ মিটার) ভিতর বিনাবেতনে সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে পড়াশুনার সুযোগ আছে। সমস্যাটা হচ্ছে এই স্কুলগুলোর অধিকাংশের শিক্ষার মানটা খুবই নিম্নমানের। ভারতে পঞ্চম শ্রেণীর পড়াশুনার মান ব্রিটেনের অথবা আমেরিকার দ্বিতীয় গ্রেডের সমান। তাদের দুই তৃতীয়াংশই একটা প্যারগ্রাফ পড়তে পারে না অথবা সাধারণ ভগ্নাংশ বোঝে না। এ মাসের প্রথমদিকে দিল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় শরত্ জীবনের নতুন উদ্যোগ- ভালো ফলাফলের জন্য ভালো স্কুল এবং ভালো শিক্ষক, পরিবর্তনই যার লক্ষ্য। ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধিদফতরের আর্থিক সহায়তায় এবং ব্রিটেনের বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় স্কুলস অ্যান্ড টিচারস ইনোভেটিং ফর রিজাল্ট (এসটিআইআর) গত ১৫ মাস ধরে কাজ করেছে। লণ্ডনের এসটিআইআর-এর কার্যালয়ে সাক্ষাত্কারে শরত্ জীবন বলেন, আমরা ভারতের ৩০০ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি যেখানে তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষকের সাথে এ নিয়ে আলাপ করেছি। ভারতে যত বেশি বিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ ততই সীমিত হচ্ছে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে হচ্ছেই না। জীবনের মতে, ভারতের শিক্ষকরা নিজেদের সরকারি নীতির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে। এই প্রথমবার তারা অনেক কিছু জানতে পারছে। আমাদের এই ইনোভেশন প্রোগ্রামের মধ্যদিয়ে শিক্ষকরা নিজেদের অনেক ও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং পেশাদার হিসেবে ভাবতে পারবে। এসটিআইআর-এর কিছু ধারণা ধনী দেশগুলোর পিতামাতার নিকট অনেক পরিচিত। মাজেদিয়া মাদরাসার একজন শিক্ষক ইরাম মুমশাদ লক্ষ্য করেছেন, অনেক দিনমজুর কীভাবে তাদের সন্তানদের লেখাপড়ায় সাহায্য করা যায় সে বিষয়ে অসচেতন। পিতামাতকেও শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করার কাজ করা হচ্ছে। বাড়িতে পিতামাতার সাথে সন্তানদের সম্পর্ক কেমন, শিক্ষক এবং পিতামাতার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, পিতামাতার সহযোগিতার আবশ্যকতা সবকিছুর ব্যাপারে বিদ্যালয় থেকে কাজ শুরু করা হয়েছে। পূর্ব দিল্লির অতি দরিদ্র এলাকার একটি সরকারি স্কুল বাবুল উলুমের একজন শিক্ষক সাজিদ হাসান উপলব্ধি করেছেন যে, খুব স্বল্প পরিমাণ শিখন দক্ষতা নিয়ে তার ছাত্ররা স্কুল শুরু করেছে যে দুর্বলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই অল্প বয়স্ক, উচ্চ প্রশিক্ষিত কিছু শিক্ষক সেইসব স্কুলগুলোতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং প্রতিদিন স্কুল সময় দু’ঘন্টা করে বাড়িয়ে ছাত্রদের অতিরিক্ত সময় দিয়ে তাদের দুর্বলতাকে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পৃথিবীর মধ্যে ভারতেই স্কুল টাইম সবচেয়ে কম। অধিকাংশ বিদ্যালয়ই দুপুর ১টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু ইনোভেশনের মধ্যে ভারতীয় বৈশিষ্ট্য থেকেই যাচ্ছে। শাহাদারায় এসআর ক্যাপিটাল স্কুলের ছাত্ররা যেখানে পাঠ্যবইয়ের কবিতা পড়তে গলদঘর্ম সেখানে লেটেস্ট বলিউড ফিল্মের জনপ্রিয় গানগুলো তাদের মুখে মুখে। বাধ্য হয়ে শিক্ষক বিন্দু ভাটিয়া এক অভিনব পদ্ধতি চালু করলেন। শিক্ষাদানকে আকর্ষণীয় করা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের উত্সাহ প্রদানের জন্য পাঠ্যবইয়ের কবিতাগুলোকে ফিল্মের গানের সুরে সুরে পড়িয়ে মুখস্থ করানো শুরু করলেন। যার ফলে ছাত্রছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। মুম্বাই এবং ব্যাঙ্গালোরে দু’টি কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা আছে এসটিআইআর-এর। অবশ্যই এটা একটা বড় ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। শরত্ জীবনের এ ধরনের কর্মসূচি চালু করার সাহসী উদাহরণ আছে। ইবে-তে থাকাকালীন সময়ে তিনি যখন চ্যারিটি শুরু করেন, ক্রেতা-বিক্রেতারা অকশানে জিনিস কেনার সময় তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের একটা অংশ সবসময় পিতামাতকে অলাভজনক সংস্থায় দান করতে থাকেন। এরফলে ব্রিটিশ চ্যারিটির জন্য প্রায় ৪৩ মিলিয়ন থেকে ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ড জমা হয়। তারপর তিনি শুরু করেন নতুন কর্মসূচি ‘টিচিং লিডার্স’। এসটিআইআরকে যারা সহযোগিতা করছে তাদের মধ্যে অন্যতম অ্যাবসুলেট রিটার্ন ফর কিডস-এর একজন উপদেষ্টা স্যালি মরগানের বলেন, “আমরা জানি একটা সংস্থাকে গড়ে তোলা এবং দাঁড় করানোর প্রচেষ্টায় শরত্ জীবন যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। শরত্ জীবন শিক্ষকদের মান উন্নত করার কাজটি শুরু করেন ২০০৮ সালে। উদ্দেশ্য ছিলো সহযোগিতার মাধ্যমে ভালো শিক্ষকদের ভালো নেতা এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা। অ্যাবসুলেট রিটার্ন ফর কিডসই প্রথম সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে এবং মাত্র ৫ বছরের মধ্যে বিল এবং মেলিনডা গেটস ফাউন্ডেশনের সমর্থন লাভে সমর্থ হয় যাদের প্রতিশ্রুতি ছিল ব্রিটেনব্যাপি তারা ১০ মিলিয়ন থেকে ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করবে। ব্রিটিশ স্কুল তদন্ত এজেন্সি অফস্টিড-এর মহিলা চেয়ারম্যান মিস মরগ্যানের মতে শরত্ জীবনের ফলাফল যথেষ্ট আশানুরূপ। সুতারাং তিনি যখন আমাদের নিকট আসেন দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি শিক্ষাদানের কৌশল হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের গ্রামার অথবা রুল মুখস্থ করার পরিবর্তে বাচনভঙ্গির উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন তখন সমগ্র শ্রেণিকক্ষে তার একটা ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মিসেস মরগ্যানের মতে, “আপনি যদি শ্রেণিকক্ষে এমনকিছু খুঁজে পান যা সত্যি কাজ করছে অন্যের সাথে সেটা ভাগাভাগি করার বিকল্প কিছু হতে পারে না। যারা পরিবর্তন চায় তারা নিজেদের স্বতন্ত্র ভাবতেই পারে”। এসটিআইআরকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে ইনোভেটিভ শিক্ষকরা নিজেদেরকে একটা নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে মনে করবে। অভ্যাসের সামান্য পরিবর্তন শ্রেণিকক্ষে একটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু শিক্ষকরা নিজেদের নিয়ে যে ভাবছে সেই পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।