পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ে পাহাড়ে জুম চাষের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ও জুম চাষের উপর নির্ভরশীল হাজার হাজার উপজাতীয় পরিবার পাহাড়ে জুম চাষের জন্য মাঠ তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। পাহাড় চূড়া থেকে পাদদেশ পর্যন্ত জুম চাষের জন্য উপযোগী করে তুলতে নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে বনাঞ্চলে । এর ফলে গাছপালা, লতাগুল্মের সাথে সাথে উজাড় হচ্ছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী, কীট-পতঙ্গ, পাখ-পাখালি । ধ্বংস হচ্ছে বন্য পশু-পাখীর আবাসস্থল। জুমের আগুনে গাছপালা ও লতাপাতা পুড়ে পাহাড়ের পর পাহাড় ন্যাড়া হয়ে পড়ায় প্রতিবছর বর্ষায় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাহাড় ধস। প্রাপ্ত এক হিসেবে দেখা যায়, প্রতি বছর পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার আটটি উপজেলায় অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার হেক্টর পাহাড়ি এলাকায় ধান, যব, ভুট্টা, তিল, কাউন, হলুদ, আদা, ছড়া কচুসহ নানা জাতের মৌসুমী শাক-সবজির চাষ হয়ে থাকে।
পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও পাহাড় ধ্বংসের অন্যতম কারণ হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পাহাড়ে যুগ যুগ ধরে অবাধে চলছে জুম চাষ। পাহাড়িরা প্রতি বছর ফাল্গুন থেকে বৈশাখ মাসে জুম চাষের জন্য নির্বাচিত পাহাড়ে আগুন লাগায়। এ তিন মাস শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় আগুন এক জায়গায় জ্বালানোর সাথে সাথে বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে । জুম চাষিরা প্রথমে পাহাড়ের মূল্যবান গাছপালা কেটে ফেলে। পরে প্রচন্ড রোদে কেটে ফেলা গাছপালা ও লতাপাতা শুকিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় পাহাড়ের পর পাহাড়। এরপর পাহাড়ের মাটিগুলোকে কুপিয়ে চাষাবাদের জন্য জমি তৈরি করা হয়। এ সময় গাছপালার শিকড় পর্যন্ত তুলে ফেলতে হয়। জুম চাষিরা মাটি তৈরির পর সাধারণত মিশ্র ফসলের বীজ বপন করে থাকে। লক্ষণীয় যে, তিন পার্বত্য জেলায় শত শত বছর ধরে পাহাড়িরা ঐতিহ্যগতভাবে জুম চাষ করে আসলেও বর্তমানে উপজাতীয়দের পাশাপাশি পুনর্বাসিত বাঙালিরাও মানিকছড়ি, মহালছড়ি,পানছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা ও মানিকছড়িতে পাহাড়ের চূড়ায় ও ঢালুতে বিভিন্ন ফসল, যেমন কচু, আদা, হলুদ, করলা,কাকরোল চাষ করছে। মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মতে- পাহাড়ে এভাবে চাষাবাদের ফলে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি। এতে পাহাড় ক্ষয় ও ভূমির উর্বরতা শক্তি হ্রাসসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। বন ধ্বংসের কারণে পাহাড়গুলো নাজুক হয়ে পড়ছে, যার ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের অতিমাত্রায় অবনয়নের ফলে বিশেষ করে পাহাড়ের টপ সয়েল বা পলি মাটি ক্ষয়জনিত কারণে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ। পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জলবায়ুর ওপর । জুম চাষ করার নামে প্রতিবছর নির্বিচারে কেটে ফেলা লক্ষ লক্ষ টন মূল্যবান গাছ-গাছালি জ্বালানি কাঠ হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে ইটভাটায় অথবা বাসাবাড়িতে।
বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় বৃক্ষহীন পাহাড়গুলোর সেই শ্যামল সবুজ সৌন্দর্য আর আগের মতো নেই। পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করতে হলে জুম চাষের নামে পাহাড় পোড়ানো বন্ধ করে বনায়নের উদ্যোগ নিতে হবে- এমনটাই দাবি পরিবেশ প্রেমীদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কৃষি বিজ্ঞানী বলেন, পাহাড়ে আগুন না দিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, ফলজ, বনজ ও ঔষধি চারা বিতরণ, তদারকি এবং পরিবেশ বিষয়ক জনসচেতনতা সৃষ্টিমূলক সভা-সেমিনার করার পাশাপাশি জুম চাষিদের পুনর্বাসনে অর্থ সহায়তা দেয়া হলে জুম চাষের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা পাবে।
