‘খাদ্য নিরাপত্তায় জিএম প্রযুক্তি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, কৃষকদের হাতে হাইব্রীড বীজ তুলে দিয়ে বীজ কোম্পানিগুলো দেশের ভবিষ্যত্ কৃষি ব্যবস্থায় ক্ষতি বয়ে আনছে। পাশাপাশি কৃষকরাও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। শনিবার রাজধানীর স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন।
‘নিজেরা করি’ সমন্বয়ক খুশি কবিরের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন ফিলিপাইনের ইটিসি গ্রুপ এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার ইলিনিটা সি. ডানো, ডিডিএস এর পরিচালক পিভি স্বাতেশ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল এর সদস্য পরিচালক ড. খালেকুজ্জামান চৌধুরী, ডিওই এর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সোলাইমান হায়দার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বীজ কোম্পানি কৃষকদের অধিক ফলনের আশা দিয়ে কৃষকদের হাতে বীজ তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু কৃষকরা এ বীজ নিয়ে বেশি উত্পাদন করতে পারছে না। বরং প্রতারিত হচ্ছেন। ফলে কৃষকরা কৃষি পেশা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। আর যারা এই প্রতারণা করছেন তাদের কোন বিচার হচ্ছে না। কোম্পানির এই প্রতারণার হাত থেকে কৃষকদের বাঁচাতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, কোম্পানিগুলো বীজের পাশাপাশি উত্পাদন বৃদ্ধি এবং পোকামাকড় দমনের জন্য কৃষকের হাতে দিচ্ছেন নানা ধরনের কীটনাশক। বর্তমানে সার এবং কীটনাশক ছাড়া ফসল ফলানো যায় না। ৬০ এর দশকে গোপনে কৃষকের ক্ষেতে সার দেয়া হত আর এখন সার কিনতে কৃষকরা গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন। জমিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগে জমির উর্বরা শক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত সার প্রয়োগেও এখন প্রয়োজনীয় ফসল উত্পাদন করতে পারছেন না কৃষকরা। ভবিষ্যতে এটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় আরো হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, অধিক খাদ্য ফলনে, কীটনাশক এবং আগাছা রোধে এবং খাদ্যে পুষ্টির মান বৃদ্ধিতে জিএম শস্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা জিএম নিয়ে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে যাচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে এ ধরনের গবেষণা চলছে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে এর পথচলা শুরু হয়নি। বিভিন্ন প্রজাতির শস্যের মধ্যে জীবনের স্থানান্তর করণের মাধ্যমে উত্পাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভব।
ইলিনিটা সি. ডানো বলেন, বিশ্বের মোট ৫টি দেশে ৮৯ শতাংশ জমি জিএম চাষাবাদের আওতায় রয়েছে। আর বাংলাদেশে এ চাষাবাদ গবাদি পশুর খাবার এবং ইথানল গ্যাস উত্পাদনে ব্যবহার হচ্ছে।
সেমিনারে উপস্থিত খুলনা, রাজশাহী এবং মনিরামপুর থেকে আসা তিনজন কৃষক রবিউল ইসলাম, মোসলেসুর রহমান এবং জাফর হাইব্রীড চাষের ফলে তাদের ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরেন। রবিউল ইসলাম জানান, কোম্পানির বীজ চাষ করে আমরা অনেক ক্ষতিগস্ত হয়েছি। এর উত্পাদন খরচ অনেক বেশি পরে যায়। ফলে আমাদের প্রতিবছর লোকসান হচ্ছে। কিন্তু কোম্পানি আমাদের এই ক্ষতিপূরণ দেয় না।
তবে এ মন্তব্যের পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করে কৃষিবিদ ইমরান আহমেদ জানান, কৃষকদের ক্ষতি জরিপ করতে হলে কৃষকদের নিজস্ব ডকুমেন্টস থাকতে হবে। কোম্পানিকে দোষ দিলে চলবে না। বেশিরভাগ ডিলার অসত্ ব্যবসা করছেন। প্যাকেটের ভিন্নতা না থাকার কারণে ভেজাল বীজ ক্রয় করে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন কৃষকরা। হাইব্রীড চাষ করলেই হবে না। এর নীতিমালা মানতে হবে। বর্তমানে প্রযুক্তির অসত্ ব্যবহার হচ্ছে। এটাকে বন্ধ করতে পারলেই কৃষকও বাঁচবে, পরিবেশও বাঁচবে। দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা জিএম চাষাবাদের আওতায় ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ গোল্ডেন রাইস, বেগুন এবং আলু মাঠ পর্যায়ে গবেষণা চলছে বলে সেমিনারে জানান।
