ভীতিকর ‘ককটেল’ নিয়ে গোয়েন্দাদের গবেষণা!

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২২:৪১
ককটেল শব্দটির কোন বাংলা প্রতিশব্দ নেই। ককটেল অর্থ ককটেল। তবে যারা মদ্য সেবন করে তাদের কাছেই ককটেল শব্দটি অতি ‘প্রিয়’। জিন, ভদকা, হুইস্কি অথবা রাম এক সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার নামই ককটেল। কিন্তু মদের আসরের সেই ‘ককটেল’ এখন সাধারণ মানুষের কাছে চরম ভীতিকর। এ ককটেল নানা ব্রান্ড মদের মিশ্রণ নয়, মিশ্রণ বারুদের। বিস্ফোরক অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা কৌতুক করে বলেন, যিনি এর নাম (ককটেল) নামকরণ করেছিলেন তাকে রসিকজনই বলতে হবে। আর গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, ককটেল বোমার কাছাকাছি হলেও বোমা নয়। বোমা সেটি যাতে ব্যবহূত হয় ইলেকট্রিক ডিভাইস। ককটেলে সেটা থাকে না। তবে মহানগর পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, দেশে এখন ককটেল সন্ত্রাস ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। যেভাবেই হোক ককটেল সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে পুলিশ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। ককটেল সন্ত্রাস বন্ধ করতে সর্বশেষ গত ১৮ মার্চ ডিএমপি সদর দফতরে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। আশির দশক থেকে বাংলাদেশে ককটেল সন্ত্রাসের সূত্রপাত। মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ সালে ককটেল সন্ত্রাসের ঘটনাটি ছিল ১০টি। অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল ৮৩টি ককটেল ও একটি বোম। ২০০৯ সালে ঘটনা ছিল ২৩টি, ককটেল উদ্ধার ৫৪টি, বোম ২াট। ২০১০ সালে ঘটনা ছিল ২৬টি, উদ্ধার ১০৮টি ও বোম ৯টি। ২০১১ সালে ঘটনা ২১টি, উদ্ধার ককটেল ১২৬টি, বোম ৯টি। আর ২০১২ সালে ঘটনার সংখ্যা ছিল সর্বাধিক। ২০১৩ সালের আরো বেড়েছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের বোম ডিসপোজাল টিমের প্রধান এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, ককটেল বা বোমা উদ্ধার সারাবিশ্বে কল হিসেবে ধরা হয়। আগে যেখানে দুই মাসেও কোন কল ছিল না, বর্তমান সময় সেখানে প্রতিমাসে ৫০ ছাড়িয়ে গেছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, বিস্ফোরণের যত ঘটনা ঘটছে তার ৯৯ ভাগই ককটেল। ককটেল সন্ত্রাস বন্ধ করতে হলে এরসঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করলেই এটা বন্ধ হবে না। এরজন্য প্রয়োজন এর উত্সমুখ বন্ধ করা। এলক্ষ্য নিয়েই গোয়েন্দা কাজ করে যাচ্ছে। বোম বিশেষজ্ঞ এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের অন্য কোন দেশে ককটেল-এর কোর ব্যবহার নেই। এটা একমাত্র বাংলাদেশেই আতঙ্ক ছড়াতে ব্যবহূত হয়ে থাকে। তিনি বলেন, ককটেল তৈরির মূল উপাদান সালফার ও পটাশিয়াম। এসব পণ্য সাধারণত আমাদের দেশে বিভিন্ন কেমিক্যাল কারখানায় ব্যবহূত হয়। একটি চক্র অবৈধভাবে এসব পণ্য ককটেল কারিগরদের কাছে সরবরাহ করে থাকে। পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, এসব পণ্য বিক্রি, আমদানি, বিপণন, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নীতিমালা আবশ্যক। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি আরো বলেন, এ নিয়ে কোন মনিটরিং না থাকার কারণেই বোমা কারিগরদের কাছে এসব পণ্য সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। তবে এজন্য দায়ী কিছু অসত্ ব্যবসায়ী। তাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ঐ কর্মকর্তা আরো বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। যাতে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে কারখানায় ব্যবহূত সালফার ও পটাশিয়ামের বিকল্প কাঁচামাল আমদানি করা যায় তারও চিন্তা-ভাবনা চলছে। ডিবি এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময় ককটেল তৈরির সময় আহত হয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, ককটেল তৈরিতে অভিজ্ঞ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে তারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তারা টাকার বিনিময় ককটেল তৈরি করে। প্রতিটি ককটেলের জন্য পারিশ্রমিক এক হাজার টাকা। আর পেছনে কারা তারা জানে না। নির্ধারিত সময় কেউ না কেউ তাদের কাছে এক কেজি বা সর্বোচ্চ দুই কেজি বিস্ফোরক পৌঁছে দিত। আর তৈরির পর পারিশ্রমিকের টাকা পরিশোধ করে ককটেলগুলো নিয়ে যেত। কে নিক্ষেপ করবে সে ব্যাপারেও তাদের পক্ষে কোন কিছু জানা সম্ভব হয় না। ডিবি এডিসি বলেন, চিহ্নিত বোমা তৈরির কারিগররাই এসব ককটেল তৈরি করে। এরা অনেকেই ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একই কর্মকর্তা বলেন, আগে ককটেল বা বোমা নিয়ে পুলিশের আলাদা কোন ইউনিট ছিল না। বর্তমানে এ নিয়ে পুলিশের আলাদা ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। এ ইউনিট নিরন্তন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ককটেল বা বোমা তৈরির উত্সমুখ বন্ধ করার। এ নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।