গ্রামের পুবদিকে একটি পুরোনো ভিটে। পুরো ভিটেটি বড়ো বড়ো গাছপালায় ঘেরা। ঝোপঝাড়ে ভরা নিঝুম ভিটে পেয়ে শিয়াল, খাটাশ, কাঠবিড়াল, বনবিড়াল, কালোবিড়াল, সজারু, সাপ, ব্যাঙ, পোকামাকড়েরা নির্ভয়ে দিন কাটায়। ওদের ভয়ে কোনো মানুষ ভিটেয় যেতে সাহস পায় না। কিন্তু ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আম, জাম, বরই, তেঁতুল আর বেতফলের লোভ সামলে থাকতে পারে না। ওরা দলবেঁধে চুপি চুপি বড়োদের অগোচরে ভিটেয় গিয়ে গাছে ওঠে নানা জাতের ফল ছিঁড়ে শখ মিটিয়ে খায়। কিছু ফল হাফপ্যান্টের পকেটে ভরতে থাকে। এগুলো বাড়ি নিয়ে খাবে। তা দেখে বনবিড়াল আর কাঠবিড়ালেরা তেড়ে এসে দাঁত-মুখ খিঁচে ভেংচি কেটে ভয় দেখাতেই দুষ্টুগুলো গাছ থেকে নেমে দৌড়ে পালায়।
ওই গ্রামে শম্ভু দাসের কয়েকটি ছাগল আছে। তাদের মধ্যে একটি রামছাগলও রয়েছে। পাঁঠার বুকে খুব সাহস। ওকে গ্রামের মানুষ রামপাঁঠা বলে ডাকে। রামছাগলটির গায়ে যেমন শক্তি তেমনি খুব রাগী। ওর চোখ দুটো রাজশাহীর লিচুর মতো দেখায়। মাথার শিং দুটো শাঁখের করাতের মতো। শিংয়ের দু’পাশ দিয়ে বিলেতি গাবের পাতার মতো দুটো কান। ঝুলে পড়েছে। হাঁটার সময় ওকে দেখলে মনে হয় যেনো একটা চিতা হেঁটে যাচ্ছে।
পুরোনো ভিটেয় শেয়াল-খাটাশেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে। ওদের মধ্যে সবচেয়ে বয়সী একটি খাটাশও থাকে। এক সময় খাটাশের গায়ে খুব শক্তি ছিলো। মনেও দুরন্ত সাহস ছিলো। ওকে অন্য প্রাণীরা সমীহ করে চলতো। সাহসে কেউ সামনে আসতো না। কিন্তু এখন বয়সের ভারে গায়ে শক্তি নেই। মুখে দাঁতও নেই। আগের মতো সেই সাহসও নেই। তাই গ্রামে গিয়ে মানুষের বাড়ির হাঁস- মুরগি ধরে আনতে পারে না। মজা করে মাংস খেতে পারে না।
রামছাগলটি প্রতিদিন সকালবেলায় একা একা পুরোনো ভিটের কাছে চলে আসে। ভিটের চারপাশ দিয়ে লকলকে প্রচুর ঘাস। মনের সুখে কচি ঘাস খেয়ে মোটা- তাজা হয়েছে। মাংসপেশিতে চর্বি জমে গেছে। একটু কড়া রোদ গায়ে লাগলে পুরো গা ছ্যাত্ ছ্যাত্ করে ওঠে। রোদের তাপে গরম সহ্য করতে না পেরে পাঁঠাটি হেলেদুলে ভিটেয় গিয়ে একটি পাতি গাব গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেয়। রোদের তাপ কমলে বাড়ি ফিরে যায়।
সেদিন ঝিমধরা দুপুরে রামছাগলটি প্রতিদিনের মতো গাছের ছায়ায় দু’চোখ বন্ধ করে জাবর কাটছে। বনমাছিরা ভোঁ ভোঁ করে ওর গায়ে বসে বিরক্ত করছে। মাছিদের অত্যাচারে রামছাগলটির অবস্থা খুবই খারাপ। ঠিক এ সময় সেই বড়ো খাটাশটি ওখান দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাত্ নাদুস-নুদুস রামছাগলটি দেখে থমকে দাঁড়ালো।
খাটাশটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলো। না, কোনো মানুষজন দেখা যাচ্ছে না। তিড়িং করে যেনো গায়ে শক্তি ফিরে এলো। মনে মনে বললো, যে করেই হোক খেতে হবে। ওকে খেতে খুব স্বাদ পাওয়া যাবে। পাঁঠা খাবার লোভে খাটাশের জিভ থেকে কয়েক ফোঁটা জল টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়লো।
বুড়ো খাটাশের মাংস ছাড়া গতরটি একটু নেচে উঠলো। এবার মনে মনে বললো, ওর মাংসে চর্বি জমেছে। ওকে খেতে পারলে আমার গায়ে আবার শক্তি ফিরে আসবে। কথাগুলো ভেবেই বুড়ো খাটাশ আস্তে আস্তে পা ফেলে রামছাগলের গলার সামনে এসে দাঁড়ালো। খাটাশের গা থেকে বিদঘুটে গন্ধ বেরিয়ে রামছাগলের নাকে ধাক্কা মারছে। এ যেনো গায়ের গন্ধের চেয়েও বিশ্রী গন্ধ। খাটাশের গন্ধ পেয়ে রামছাগলও লজ্জা পায়। মনে মনে বললো, আরে খাটাশ মানুষে বলে থাকে আমার গায়ে বিদঘুটে গন্ধ। তারা যদি তোর গায়ের গন্ধ পায় তাহলে কি বলবে? নিশ্চয়ই বলবে খাটাইশা গন্ধ। রামছাগল চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পেলো একটি হাড্ডিসার খাটাশ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারে খাটাশটি এখনি ওর গলায় কামড়ে ধরে গলা ছিঁড়ে রক্ত খাবে। তারপর চামড়া ছিঁড়ে একটু একটু করে গায়ের মাংস খাবে। না, এই বুড়ো খাটাশের খাদ্য হতে পারে না। ওকে উচিত শিক্ষা দিয়েই ছাড়বে।
রামছাগলের মাংস খেতে আর তার দেরি সইছিলো না। খাটাশটি বিড়ালের মতো সামনের পা দুটো একটু এগিয়ে দিয়ে নিজের গতরটি সম্পূর্ণ নিচু করে নিয়ে যেই না দিলো এক লাফ, অমনি রামছাগলও মাথা নিচু করে ডানদিকের একটি শিং গেঁথে দিলো খাটাশের থুতনিতে।
খাটাশের গায়ে যেটুকু শক্তি ছিলো তা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে; কিস্তু রামছাগলও তো কম না। ওটাও মাথা দিয়ে চেপে রেখেছে তো রেখেছেই। কিছুতেই থুতনি থেকে শিং বের করছে না।
খাটাশের গলা দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে। রক্ত পড়তে পড়তে দুর্বল খাটাশটি এক সময় নেতিয়ে পড়লো। রামছাগল বুঝতে পারে খাটাশটি মরে গেছে। এদিকে পুরোনো ভিটেয় অন্ধকার নেমে আসছে। এখানে থাকা নিরাপদ নয়। একটু পরেই গভীর জঙ্গল থেকে আরো শেয়াল-খাটাশ-বনবিড়াল বেরিয়ে আসবে। একসঙ্গে অনেকগুলো এলে ওদের সঙ্গে একা লড়াই করে জীবন বাঁচানো যাবে না। কথাগুলো ভেবেই খাটাশের গা থেকে নিজের মাথা সরিয়ে নিয়ে রামছাগল শম্ভু দাসের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকলো।
