বাহাদুরি দেখানোর এখনই সময়

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৩, ২০:৪৪
মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি অনেকভাবে হয়ে থাকে। তার মধ্যে স্বীকৃতি না পাওয়ার ক্ষোভ অন্যতম। এদেশের জনগণ দীর্ঘকাল বিদেশি শক্তির অধীনস্থ ছিল। তখন বিদেশিরা ছিল মালিক, জনগণ ছিল প্রজা। তখন সরকারি সম্পত্তিকে বিদেশিদের সম্পত্তি মনে করা হতো। অনেক সময় স্বদেশী বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করার জন্য নেতারা কর্মীদের উত্সাহ দিতেন। কিন্তু স্বাধীন দেশের জনগণই দেশের মালিক হওয়ার কথা। ৭১ সালে তারা দেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পেতে ব্যর্থ হয় (যদিও কতিপয় তাত্ত্বিকের মতে, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়া গেছে। এখন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পালা)। মালিকানা না পাওয়ার বেদনা ও স্বীকৃতি না পাওয়ার ক্ষোভকে কাজে লাগানোর জন্য নেতারা তাদেরকে সহিংস হতে উত্সাহ দেয়। ফলে আন্দোলনের সময় তাদের কদর বেড়ে যায়। এক সমীক্ষা সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে সারা দেশে প্রায় সাড়ে সাতশ গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। পিকেটারদের আক্রমণে ও পুলিশের গুলিতে শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। আমরা এতদিন জেনে আসছি, হরতালের দিন পিকেটারের হাতে গাড়ি ভাঙচুর হয়। এখন হচ্ছে হরতালের আগের দিনে। হরতালের দিনে সংঘটিত যে ঘটনাগুলো মানুষের মনে রেখাপাত করেছে সেগুলো হলো— ইটের আঘাতে এক যাত্রীর মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, সে বাঁচাও-বাঁচাও বলে বাস থেকে নেমে দৌড়াচ্ছে। শিশুকোলে মা জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে শিশুকে বাঁচাতে পারলেও নিজের প্রাণ বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সিএনজি উলটিয়ে সিএনজি চালক আহত হচ্ছে। জলন্ত বাস থেকে সকল যাত্রী বের হতে পারলেও একজন বৃদ্ধ আগুনে পুড়ে মারা গেছে। পেট্রোল বোমায় একজন চিকিত্সক ও একজন বিক্রয় কর্মী শরীরের ৭৫ ভাগ পুড়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। যারা ইট, লাঠি, ছোরা, পিস্তল হাতে এভাবে অফিস-আদালত ও বাস-ট্রাক ভাঙচুর করছে তাদের সামাজিক পরিচয় তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের অনেকেই দিন মজুর, টোকাই, হকার, হোটেল বয়, ওয়ার্কসপ কর্মচারী, বেকার যুবক কিংবা কোনো চাকরিজীবী পিতা-মাতার বখে যাওয়া সন্তান। তাদের জানা রয়েছে, অন্য সময় গাড়ি ভাঙচুর করলে মামলায় পড়তে হবে ও বাস শ্রমিকদের হাতে পিটুনি খেতে হবে। কিন্তু আন্দোলনের সময় সে রকম ভয় থাকে না। বরং নিজেকে জাহির করার, নেতা-নেত্রীর নৈকট্য লাভ করার ও সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। সে সঙ্গে ড্রাইভারদের ক্ষমা চাওয়া, যাত্রীদের দয়া কামনা করা, পথচারীদের নির্লিপ্ত পদচারণা ইত্যাদি দৃশ্য তাদেরকে আনন্দ দেয় এবং তারা সম্মানবোধ করে। তাই হয়তো একজন পিকেটার গাড়ি ভাঙচুরকালে সঙ্গীকে উত্সাহ দিয়ে বলছে— ‘ভাঙ গাড়ি ! বাহাদুরি দেখানোর এখনই সময়।’ কিন্তু তাদের জানা নেই, এভাবে আইন ভঙ্গ করে আইনের শাসন পাওয়া যায় না। তাদের আরও জানা নেই, বিরোধীদল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাদেরকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সরকারও চাচ্ছে তারা আরও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করুক, যা দেখিয়ে আবারও ক্ষমতায় আসা যায়। পাবনা