মাস নয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কি ধরনের সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়েও হচ্ছে না। প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপাতদৃষ্টিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অটল রয়েছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতোই বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। বাড়ছে স্নায়ুর চাপ এবং উত্তেজনা। বিদেশিরা জড়িয়ে পড়ছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। তবে সমাধানের উপায় অবশ্যই খুঁজতে হবে রাজনীতিবিদগণকেই।
নির্বাচন-পূর্ব আলাপ-বিতর্কের মধ্যে বোধ হয় উভয় বড় দলকেই সামপ্রতিক মিডিয়া জরিপের ফলাফল : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উচ্চতর জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও সম্ভাব্য ভোটে আওয়ামী লীগ শতকরা ৪২ ভাগ এবং বিএনপি শতকরা ৩৯ ভাগ ভোট পাবে (দ্য ডেইলি স্টার ৪ জানুয়ারি ২০১৩)-এর কথা মনে রাখতে হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া একটি মন্তব্যে বলেছিলেন, যে নামেই ডাকা হোক না কেন নির্বাচন হতে হবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বছর একটি বক্তৃতায় নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। দু’টো বক্তব্যের তাত্পর্য : উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানের সাম্ভাব্য পথ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নাও হতে পারে।
এরই মধ্যে কিছু সংসদীয় এবং বিধি- বিধানের সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের আদলে সরকার প্রধানের পদে নির্বাচিত হবার মেয়াদ দু’টোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চিন্তা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিকতার নিরিখে “এক ব্যক্তি এক পদ” অর্থাত্ সরকার প্রধান ও দলীয় প্রধানের পদে দুই ব্যক্তির অবস্থান বাধ্যতামূলক করা যায়। তৃতীয়ত, শুরুর দিকে বাংলাদেশ এবং এখনো অন্যান্য দেশে প্রচলিত রীতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী মনোনয়ন প্রদানকারী পার্লামেন্টারী সদস্যগণকে নির্বাচনপ্রার্থীদের বাইরে রাখার বিধান সমীচীন হতে পারে। চতুর্থত, একজন প্রার্থী যে তিনটির বেশি আসনে প্রার্থী হতে পারেন তার সুযোগ নিয়ে একাধিক আসনে বিজয়ী হওয়া প্রার্থীর ছেড়ে দেয়া আসন বা আসনগুলোর উপ-নির্বাচনে কি অন্য দলের প্রার্থী না দিয়ে মূল বিজয়ী দলকে ছেড়ে দেয়া যায় না। পঞ্চমত, পার্টি হুইপের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ চলে যাওয়ার যে খড়গ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সন্নিহিত আছে তাকে পরিবর্তন করে, (ক) অনাস্থা প্রস্তাব (খ) বাজেট ও (গ) জাতীয় প্রতিরক্ষা ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে পূর্ব ঘোষণা দিয়ে নিজের ইচ্ছামত ভোট দেবার বিধান প্রবর্তনের বিষয়টি কি ভেবে দেখা যায়? ষষ্ঠত, রাজনৈতিক দলগুলোকে কি উত্সাহিত, এমনকি বাধ্য করা যায় না যে, সংসদীয় আসনের মনোনয়নে সংশ্লিষ্ট এলাকার দলীয়ভাবে সুপারিশকৃতদের মধ্যেই সাধারণত সীমাবদ্ধ রাখা হবে। সপ্তমত, গণতন্ত্রের বিকাশ ও অধিকতর শক্তি তথা উদ্ভাবনী অর্জনের স্বার্থে তিন বছর দলীয় সদস্য না থাকলে দলীয় মনোনয়ন না দিতে পারার বিধান রহিত করা যেতে পারে। অষ্টমত, মহিলাদের কোটা রহিত করে তাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি ও সমতাভিত্তিক করার স্বার্থে দলের পদের কোটার বদলে অথবা অতিরিক্ত ব্যবস্থায় দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দলকে যথাক্রমে শতকরা ৩০ ভাগ, ৪০ ভাগ ও ৫০ ভাগ মনোনয়ন মহিলাগণকে দিতে বাধ্য করার বিধান প্রবর্তন করা যেতে পারে।
নির্বাচনী খরচ মিটানোর বিধান
টাকা ও পেশিশক্তি নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করে বলে বিস্তর বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। তবে অন্তত দু’জন প্রার্থীর অর্থ ও পেশিশক্তি সমান সমান হলে সে প্রভাব কমতে পারে। কিন্তু তাতে উত্তাপ- উত্তেজনা-সহিংসতা বাড়তে পারে। হিসাব ও জবাবদিহির নিরিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতবর্ষের আদলে সংসদীয় নির্বাচনী খরচের অর্থ বাস্তবতার নিরিখে পঞ্চাশ লক্ষ টাকায় নির্ধারণ করা যেতে পারে এবং এর অর্ধেক সরকারি কোষাগার থেকে দেয়া যেতে পারে। তবে শর্ত থাকে যে, সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে সকল দল গড়ে কমপক্ষে শতকরা পাঁচ ভাগ ভোট পেয়েছে শুধু সে দলের প্রার্থীরাই এ সুযোগ পাবেন।
রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গণতন্ত্র বেশ কিছুটা মজবুত হয়েছে। গণদাবির প্রতি সম্মান রেখে এখন বোধ হয় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরমর্শ করার বাইরে এনে প্রজাতন্ত্রের প্রধান বিচারপতি ও সশস্ত্র বাহিনীসমূহের প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা যেতে পারে। তাছাড়া অন্যান্য সাংবিধানিক পদ যেমন- উচ্চতর ন্যায়পালের বিচারকগণ, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারপার্সন ও সদস্যগণ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারপার্সন ও সদস্যগণ, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারপার্সন ও সদস্যগণ ইত্যাদি পদে নিয়োগদানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা যায়। ঐচ্ছিকভাবে তিনি সরকার প্রধান ও বিরোধী দলের প্রধানের সাথে পরামর্শ করলে করতেও পারেন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিচালনাকারী সরকার ব্যবস্থা
সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার কি দলীয় বা নির্দলীয় না হয়ে বহুদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন হতে পারে না! নবম সংসদের প্রতিনিধিত্বের অনুপাত সাময়িকভাবে ভুলে গিয়ে কি এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আওয়ামী লীগের ছয়জন, বিএনপির চারজন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে না? দলীয় মনোনয়নের পর এই এগারো সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকটি রাষ্ট্রপতি আহ্বান করে দিবেন এবং এর প্রথম বৈঠকেই একজন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবেন।
দেশে এখন একটি চুটকি বহুল আলোচিত। বিএনপি নাকি নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে রাজি যদি এর প্রধান পদটি তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে দেয়া হয়। আর আওয়ামী লীগ নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিতে পারে যদি সংসদের অধুনা বিলুপ্ত অনুচ্ছেদ ৫৯(১)-এর বিধান অনুসারে সর্বশেষ অবসরগ্রহণ করা প্রধান বিচারপতিকে এর প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে মেনে নেয়া হয়।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর,
বাংলাদেশ ব্যাংক
