কিছু না জেনে কাল মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে কেউ এসে পড়লে মহাবিস্মিত হয়ে পড়তেন। মনে হচ্ছিল যেন, হঠাত্ করে বাংলাদেশের ক্রিকেট সেই নব্বই-আশি কিংবা সত্তরের দশকে ফিরে গেছে। মাঠ দাপিয়ে ফিল্ডিং করছেন আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, নাঈমুর রহমান দুর্জয়, হাসিবুল হাসান শান্ত, মোহাম্মদ রফিক, মেহরাব হোসেন অপি, শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুত্রা! শুধু এরাই নন; আরেক প্রজন্ম আগের জাহিদ রাজ্জাক মাসুম, রকিবুল হাসান, জিএস হাসান তামিমরাও আছেন!
মিরপুরে কাল অভূতপূর্ব এই মিলনমেলা তৈরি হলো স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে। প্রীতি ম্যাচ খেলতে মাঠে নেমে পড়লেন বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের স্মৃতিকাতরায় ভাসিয়ে দেয়া সব ক্রিকেটার। যদিও স্বাধীনতা কাপ ক্রিকেটের আয়োজক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি); কিন্তু এই প্রীতি ম্যাচে সাবেক তারকাদের মহামিলন ঘটল আসলে নাঈমুর রহমানের কৃতিত্বে। দেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক, বিসিবির এডহক কমিটির সদস্য এবং খেলোয়াড় সমিতির চেয়ারম্যান দুর্জয়ই চেষ্টাচরিত্র করে এক করেছেন এইসব তারকাকে। ফলে অন্য যে কোনো বছরের স্বাধীনতা দিবস ক্রিকেটের চেয়ে অনেক বর্ণিল একটা ব্যাপার হয়ে উঠল কাল।
আর এই রঙ্গীন আয়োজনকে এই একবারেই শেষ করে ফেলতে চান না দুর্জয়। তিনি দেশে এরকম ম্যাচ নিয়মিত আয়োজনের স্বপ্ন দেখছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক ভাবেও এরকম অন্যান্য দেশের সাবেকদের সঙ্গে খেলা আয়োজনের চেষ্টা চালাচ্ছেন দুর্জয়, ‘সাবেক ক্রিকেটারদের পরস্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগই কমে যাচ্ছে। এই ম্যাচের ভেতর দিয়ে সবার সাথে সময় কাটানো গেল। আমার আরো একটি পরিকল্পনা রয়েছে- তা হচ্ছে, এ ধরনের ম্যাচ কিংবা টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করা। বাইরের দেশের সঙ্গেও আমরা এরকম প্রীতি ম্যাচ খেলতে চাই। আপাতত শ্রীলঙ্কার সাথে কথা হয়েছে। তারা যদি সময় দেয়, আর আমাদের খেলোয়াড়দেরও যদি সময় থাকে; তবে এ বছরের মধ্যে একটা ম্যাচ আয়োজন করতে পারি’।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল চীনে, হাবিবুল বাশার শ্রীলঙ্কায়। এ ছাড়া যারা সুস্থ আছেন, দেশে আছেন; প্রায় সবাই এসেছিলেন কাল। সাবেক পেসার আলমগীর কবির, জাহিদ রাজ্জাক মাসুম, জামিল উদ্দিন বাবু, মাহমুদুল হাসান, মেহরাব হোসেন অপি, এনামুল হক মনি, সাজ্জাদ আহমেদ, মোহাম্মদ আলি, শফিউদ্দিন আহমেদ, শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুত্, খালেদ মাসুদ পাইলট, সানোয়ার হোসেন, আনিসুর রহমান, এহসানুল হক সিজান; কাকে ছেড়ে কার দিকে তাকাবেন!
এদের মাঠে নামতে দেখে অবশ্য একটু আফসোসই করছেন এবার আর মাঠে নামতে না পারা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান। সবুজ দলের ম্যানেজার তিনি। একটু আফসোসের সুরেই বললেন, ‘আজ খেলতে পারলেই ভালো লাগতো। বিসিবির এ ধরনের প্রীতি ম্যাচ আরো বেশি আয়োজন করা উচিত। তাতে পূর্বসূরিদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক বাড়বে’।
পায়ে সমস্যা থাকার কারণে মাঠে না নামলেও ফারুক আহমেদও জোর দিলেন এ ধরনের ম্যাচ নিয়মিত আয়োজনের ব্যাপারে, ‘প্রীতি ম্যাচগুলো সাবেক ক্রিকেটারদের দিয়ে খেলানো উচিত। বর্তমান ক্রিকেটাররা বিশ্রাম পায় না। তাদেরকে না খেলিয়ে সাবেকদের দিয়ে খেলালে আমরা এটাও উপভোগ করতে পারবো’।
উপভোগ যে করতে পারছেন; সেটা আকরাম খানকে দেখেই বোঝা গেল। সেলিম শাহেদের একটি শট ঠেকাতে যে ডাইভ দিলেন; তাতে বোঝা মুশকিল, ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছেন বর্তমান প্রধান নির্বাচক! খেলাটি উপভোগ করেন বলেই এত বছর পর মাঠে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে তার, ‘সত্যিই খুব ভালো লাগছে। এতদিন পর সবাইকে এক সাথে পেয়েছি বলেই বেশি ভালো লাগছে’। বিদ্যুতের কাছে ক্রিকেট মাঠে ফেরাটা একটু অন্যরকম। পারিবারিক ব্যবসা দেখাশুনা করতে হয় বলে ক্রিকেট মাঠে আসতে পারেন না। সেই পুরানো দিনের কথা স্মরণ করতেই বিদ্যুত্ বললেন, ‘আমরা আসলে ক্রিকেট খেলেছি মন-প্রাণ উজাড় করে। আমরা কোনোকিছুর জন্য চিন্তা করেনি, শুধু ক্রিকেট নিয়েই পড়ে থাকতাম। এখনো সেই টানে এসেছি।’ মাঠে এসে বিদ্যুত্রা একটা ব্যাপার অন্তত বুঝলেন—তাদের প্রতি ভালোবাসাটাও মানুষের এতোটুকু কমেনি।
