যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া শুরু করতে সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল মঙ্গলবার সেই সময়সীমা পার হলেও সরকারের দিক থেকে এই প্রক্রিয়া শুরুর কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি আদায়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। একইসাথে সবার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মুক্তিযোদ্ধা-তরুণ-কিশোর-জনতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার আহবান জানিয়ে তরুণ-কিশোর-শিশুদের হাতে পতাকা তুলে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশ থেকে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া শুরু করতে ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ। নির্ধারিত সময়সীমায় এ প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন তারা। সমাবেশে নিয়মিত বিরতিতে শ্ল্লোগান তোলেন তরুণরা, “আল্টিমেটাম শেষ হল, সরকার কী করল”, “আল্টিমেটাম শেষ হলো, রাষ্ট্র তোমার খবর কী?”
গতকাল বিকাল সোয়া চারটার দিকে গণজাগরণ মঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা-জনতা সমাবেশ শুরু হয়। রাতে মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৪২টি ফানুস উড়িয়ে এবং জাগরণী গানের মাধ্যমে সমাবেশ শেষ হয়। সমাবেশের প্রথম পর্বে মঞ্চ সংগঠকরা, দ্বিতীয় পর্বে মুক্তিযোদ্ধারা, তৃতীয় পর্বে শহীদ-সন্তানরা বক্তব্য দেন। চতুর্থ পর্বে কর্মসূচী ঘোষণা এবং শেষ পর্বে ফানুস উড়ানো ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দাবি আদায়ে গতকালের সমাবেশ থেকে নতুন করে কর্মসূচী ঘোষণা করেছে মঞ্চ। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- আগামী ৩১ মার্চ সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ অভিমুখে মিছিল, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধসহ ছয় দফা দাবিতে সারা দেশ থেকে সংগৃহীত গণস্বাক্ষর স্পিকারের কাছে হস্তান্তর, ৪ এপ্রিল সকাল ১১টায় গণজাগরণ মঞ্চে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, ঐ দিনই সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ, ৫ এপ্রিল বিকেল ৪টায় প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ৬ এপ্রিল বিকেল চারটায় গণজাগরণ মঞ্চে সমাবেশ। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।
সমাবেশের দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চে আসেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরকাল উজ্জ্বল রাখার আহবান জানিয়ে তরুণ-কিশোর-শিশুদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন। প্রত্যুত্তরে তরুণরা-কিশোররাও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রজ্ব্বলিত মঙ্গল-দ্বীপ তুলে দেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন সুউচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেবেন বলে অঙ্গীকার করে। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) এ কে খন্দকার। এ সময় তরুণদের উদ্দেশে পরিকল্পনা মন্ত্রী এ কে খন্দকার বলেন, তোমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করবে সে ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। তোমরা যে জাগরণ সৃষ্টি করেছো, সে জন্য অভিনন্দন। মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ড কাউন্সিলের সভাপতি হেলাল মোর্শেদ বীর বিক্রম বলেন, আজ ৪২ বছর পর তরুণদের শক্তি নতুন সুযোগ এনেছে। গণজাগরণে একাত্মতা পোষণ করছি। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দেয়া রায়ের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ঐ রায়ের পর আমাদের ভুল ভেঙ্গেছে। আপনারা জেগেছেন। একাত্তরে দিয়েছি স্বাধীন ভূখণ্ড। আজ হাতে তুলে দিলাম জাতীয় পতাকা। বাংলাদেশের রাজনীতি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়।
এ সময় মঞ্চে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব) কে এম শফিউল্লাহ, মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম, লে. কর্ণেল আবু ওসমান চৌধুরী, হারুন হাবীব, ডা. সারওয়ার আলী,কমান্ডার আব্দুর রউফ, মাহবুব জামান, ইসমত কাদির গামা, সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বীরপ্রতীক, শাহরিয়ার কবির, ম. হামিদ,আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক। নারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন শিরিন বানু মিতিল, শিরিন আকতার, বুলবুল মহলানবিস, মিনু হক, ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না, রাহেলা বেগম, শাহীন আনাম, পান্না কায়সার, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী।
এদিকে, গতকাল রাতে ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, সুনির্ির্দষ্ট ছয় দফা দাবি নিয়ে প্রজন্মের এই আন্দোলন। গত একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবসে যে আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে তা শেষ হয়েছে আজ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এখন পর্যন্ত আমাদের দাবি পূরণ করা হয়নি। আল্টিমেটাম শেষ হলেও সরকারের টনক নড়েনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদী। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় ও তা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। দুর্বার সংগ্রাম চলবে। বিচারের মূল দাবির পক্ষে সরকারের ইতিবাচক অর্জন আছে। কিন্তু জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের কোন প্রক্রিয়া এখনও শুরু করে নি।’ তিনি আরো বলেন, সরকার ছয় দফা উপেক্ষা করবে জনগণ এমনটি আশা করেনি। সরকার বিচারের নামে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে। সমাবেশের তৃতীয় পর্বে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচারের বর্ণনা দেন শহীদ সন্তান সাইদুর রহমানসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। বিকালে সমাবেশের প্রথম পর্বে বক্তব্য রাখেন ছাত্রনেতারা। তারা আল্টিমেটাম অনুযায়ী জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মঞ্চের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। নইলে ‘সারা বাংলায় যুদ্ধ’ ছড়িয়ে পড়বে বলে ঘোষনা দেন।
সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন,‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে আন্দোলন চলছে তার পক্ষে আল্টিমেটামের ৩৪ দিন অতিবাহিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কোন সুনিদির্ষ্ব ইঙ্গিত পাইনি। গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিষবাষ্প ছড়ানো হচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেত্রী উসকানি দিচ্ছেন। আমরা জনগনকে বোঝাতে চেয়েছি আমাদের এই আন্দোলন কোন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এই আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে। এই আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে হবে। আমরা আশা করি এই সরকারের হাতে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ সম্পন্ন হবে। অপরদিকে, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু বলেন, জাগরণের পর্ব শেষ, এবার প্রতিরোধের পর্ব। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা অস্ত্র জমা দিয়েছেন, প্রশিক্ষণ জমা দেননি। সে প্রশিক্ষণ-চেতনা আমাদের মাঝে সঞ্চারিত করুন।
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এসএম শুভ সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, নির্বাচনে বিপুল পরিমান ভোট নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন আর অঙ্গীকার করেছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার। কিন্তুু সে দাবি পূরন করেন নি। সমাবেশের প্রথম পর্ব ব্লগার মারুফ রসুল এবং দ্বিতীয় পর্ব মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ সঞ্চালনা করেন।
এদিকে, চৈত্রের তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে গতকাল সমাবেশ শুরুর আগেই মঞ্চস্থলে সমবেত হন সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বীরাঙ্গনারা। মূলমঞ্চে সারিগান পরিবেশন করেন টাঙ্গাইল থেকে আসা শিল্পীরা। এতে তাল মিলান বীরাঙ্গনারাও। মুক্তিযোদ্ধার সম্মান প্রদান করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান তারা। সিরাজগঞ্জ থেকে সংহতি জানাতে আসা সূর্য বেগম বলেন, “স্বামী এবং বাবার সামনে থেকে আমারে ধইরা নিয়া যায়। সেই নির্যাতন প্রকাশ করার ভাষা নাই। রাজাকার-আল বদরদের ফাঁসি চাই।’’কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা কেন বীরাঙ্গনা হয়ে থাকবো। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চাই। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমাদের এখন এত চিন্তা করতে হতো না।’’
একই বক্তব্য রাখেন সিরাজগঞ্জের বীরাঙ্গনা রাহেলা বেগম, করিমন বেগম, নূর জাহান, আয়েশা বেগম, রাজু বালা, শামসুন্নাহার, রহিমা, জোছনা, মাহেলা দাওয়া, গোপালগঞ্জের শেখ ফাতেমা আলী, যশোরের মোমেনা বেগম, রাইসা বেগম, নারিন্দার সাবিহা বেগমের।
গতকাল স্বাধীনতার ৪২ বছর পূর্তিতে রাত আটটার দিকে গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে ৪২টি ফানুস আকাশে উড়িয়ে দেয়া হয়। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন উপস্থিত জনতা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং হাতিরঝিল এলাকা থেকেও ফানুস উড়ানো হয় বলে মঞ্চ থেকে জানানো হয়।
