তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে কার্যত নারায়ণগঞ্জে এখন চলছে মাঠ গরমের রাজনীতি। গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে মহাজোট যেভাবে দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল ত্বকী হত্যার পর এখন ঠিক একইভাবে মহাজোট দুই শিবিরে বিভক্ত। ত্বকীর খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে এখন নারায়ণগঞ্জে চলছে পাল্টাপাল্টি সাংবাদিক সম্মেলন আর মিছিল-সমাবেশ। এতে মূল খুনিরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর তদন্ত গতি হারিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী ও নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ ৭ জনকে অভিযুক্ত করছেন। যদিও এর সপক্ষে তারা কোন সাক্ষ্য, প্রমাণ বা তথ্য পুলিশকে দেননি। শুধু পুলিশকে তারা অবহিতপত্র দিয়ে এই দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ বলছে, এই অবহিতপত্রের আইনগত কোন ভিত্তি নেই। পুলিশ এটি আমলেও নিতে পারে না। আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানও বলছেন, রফিউর রাব্বী মাঠে বক্তৃতা না দিয়ে কোন তথ্য থাকলে পুলিশকে দিতে পারেন।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, মাঠের রাজনীতিতে কে কি বক্তব্য দিল সেটি তাদের কাছে মুখ্য নয়। পুলিশ এখন কিলিংয়ে অংশ নেয়া খুনিদের গ্রেফতারের দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগী। সরাসরি কিলিংয়ে অংশ নেয়া কেউ গ্রেফতার হলেই এর রহস্য উন্মোচিত হবে। শিগগিরই কিলিংয়ে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের গ্রেফতারের ব্যাপারে আশাবাদি পুলিশ সুপার।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী ইত্তেফাককে বলেন, শামীম ওসমান পরিবারের সদস্যরাই ত্বকীর খুনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। এর পক্ষে তিনি কোন সাক্ষ্য, প্রমাণ বা তথ্য উপাত্ত পুলিশকে দিয়েছেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি মনে করেন, পুলিশ সবই জানে।
নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী অবশ্য এখনও পুলিশের উপর আস্থাশীল। গত সোমবার নিজ দফতরে এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশের উপর আস্থা রাখতে চাই। আশা করি শিগগিরই পুলিশ খুনিদের গ্রেফতার করবে।’
রিমান্ডে থাকা রিফাত বিন ওসমান পুলিশকে তেমন কোন তথ্য দেয়নি। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, পুলিশ আরো ৪ জনকে আটক করেছে। তাদের এখনও গ্রেফতার দেখায়নি। এদের মধ্যেই কিলিং মিশনে অংশ নেয়া কেউ রয়েছে।
উল্লেখ্য ঘটনার আগে থেকেই শামীম ওসমান ও তার ছেলে দেশের বাইরে ছিলেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সক্রিয় অংশ নেয়ার যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা ঠিক নয়।
আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে ইত্তেফাককে বলেছেন, রফিউর রাব্বী এ পর্যন্ত চার ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথমে জিডিতে তিনি বলেছেন, তার এবং তার ছেলের কোন শত্রু নেই। মামলায় বলেছেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও গণজাগরণ মঞ্চের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এই কাজ করতে পারে। পরে পুলিশকে অবহিতপত্র দিয়ে বলেছেন, শামীম ওসমান ও তার ছেলে এই ঘটনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। আর এখন বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে বলছেন, জামায়াত-শিবির চক্র এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। শামীম ওসমান বলেন, তাহলে তিনি তো সবই জানেন। মাঠে বক্তৃতা না দিয়ে পুলিশকে তথ্য দিলেই পারেন।
নারায়ণগঞ্জের দায়িত্বশীল একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সবাই রাজপথে বক্তৃতা দিলেও পুলিশকে কোন সাক্ষ্য, প্রমাণ বা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন না। এমনকি গত ৬ মার্চ ত্বকী নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা রাব্বীর বাসায় গিয়ে কোন সন্দেহভাজন আছে কি-না তা জানতে চান। কিন্তু তখন তিনি বলেছেন, তিনি কাউকে সন্দেহ করেন না। তাদের কোন শত্রুও নেই। ঘটনার এক সপ্তাহ না যেতে তিনি নিজের অবস্থান থেকে পুরো সরে এসেছেন।
প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বীর বড় ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী ৬ মার্চ নিখোঁজ হয়। এর দুই দিন পর ৮ মার্চ সকালে ১৭ বছরের এই কিশোরের মৃতদেহ পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জের চারারগোপে শীতলক্ষ্যার নদীর নৌযান নোঙর করার খালের কাদা পানিতে।
