দেশব্যাপী ১৮ দলীয় জোটের টানা ৩৬ ঘন্টার হরতাল কর্মসূচি আজ সন্ধ্যা নাগাদ শেষ হইতেছে। হিসাব করিলে দেখা যায়, চলতি ও স্বাধীনতার মাসে আজ নবম দিনের মত হরতাল হইতেছে। ইহার পর ২৯ ও ৩০ মার্চ শুক্র ও শনিবার দুইদিন ছুটি। মার্চের শেষ কর্মদিবসটি হইল ৩১ তারিখ রবিবার। আল্লাহ চাহেন তো এই দিন যদি কোন হরতাল না হয়, তাহা হইলে স্বাধীনতার মাসে সব মিলাইয়া ২২ দিনই কর্মহীন কাটিয়া যাইবে। ইহার মধ্যে আছে পূর্বোল্লেখিত ৯ দিনের হরতাল, ১০ দিন নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি ও ২ দিন বিশেষ ছুটি। শুক্র ও শনিবারকে আমরা নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি হিসাবেই জানি। আর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন এবং ২১ মার্চ সদ্যপ্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাইতে দুইদিনের বিশেষ ছুটি ছিল।
আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার হইতে মুক্তি পাইয়া দেশে ফিরিয়া আসিয়া আবেগঘন বক্তৃতায় যে কথাটি গুরুত্ব দিয়া বলিয়াছিলেন তাহা হইল, অর্থনৈতিক মুক্তি না আসিলে আমাদের স্বাধীনতা অর্থবহ হইবে না। অর্থাত্ রাজনৈতিক উন্নয়ন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ সকল কিছুই অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর নির্ভরশীল। তাঁহার মত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতার পক্ষেই এই কথা বলা সম্ভব হইয়াছে। অথচ আজ আমরা একটি মাসের ২২ দিনই কর্মহীন থাকিয়া স্বাধীনতার মাস উদযাপন করিতেছি, যাহা গভীর চিন্তার বিষয়। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা হইতে সৃষ্ট হরতালের কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। ফলে কল-কারখানার চাকা ঘুরিতেছে না, শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে ইত্যাদি। যাহারা হরতাল ডাকিয়াছেন তাহাদেরও নানা যুক্তি রহিয়াছে। তাহারা বলিতেছেন তাহাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়া গিয়াছে, বাঁচা-মরার প্রশ্ন আসিয়া গিয়াছে, ইহাছাড়া আর গত্যন্তর নাই। তাহারা এই যুক্তিও দেখাইতেছেন যে, বর্তমান সরকারি দল ইহার আগে যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন তাহারা তাহাদের চাইতেও বেশি সময় হরতাল করিয়াছে, মানুষের কর্মঘন্টা নষ্ট করিয়াছে ও হরতালের নামে বিপর্যয় সৃষ্টি করিয়াছে। ইহার জওয়াবে সরকারি দল বলিয়া যাইতেছে তাহাদের কথা। কিন্তু অনেক সময় যুক্তিতে কাজ হয় না। আমরা বলি বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। আসলে সেই বিশ্বাসের জায়গাটিই আমাদের আজ নড়বড়ে হইয়া উঠিয়াছে।
পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসনামলের বিরুদ্ধে লড়াইকারী বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে বড় উদ্দেশ্যটি ছিল একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা। আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ঠিকঠাক অব্যাহত থাকিলে কোন দেশে হরতালের প্রশ্নই আসে না। উন্নত ও উদার গণতান্ত্রিক দেশে একদিন কেন এক মুহূর্তের জন্যও কর্ম-কোলাহল পরিবেশ ও জীবনযাত্রা ব্যাহত করার কথা চিন্তাই করা যায় না। হরতাল, সন্ত্রাস, গাড়িতে আগুন, মানুষ পোড়াইয়া মারা, বোমাবাজি, মারমুখী পিকেটিং এ সবকিছুই মূলত বাম ধারার সংস্কৃতি। আজ বামপন্থিরা উদার গণতন্ত্রীদের ঘাড়ে সওয়ার হইয়াছেন বলিয়াই আমাদের এই করুণ দশা হইয়াছে। এমন কোন রাজনৈতিক দল নাই যেখানে বামপন্থি ও উগ্রপন্থিরা না জায়গা করিয়া লইয়াছেন। তাহারা দলে অনুপ্রবেশ করিয়া তথাকথিত কৌশল অবলম্বন করিয়া চলিতেছেন। বস্তুত বিশ্বাসের সহিত যাহারা কপটতা করে, তাহারাই সর্বনিকৃষ্ট। যুগে যুগে তাহাদের কারণেই ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয়। গণতান্ত্রিক পথে সঠিকভাবে চিন্তা ও কাজ করিলে দেশে এত হানাহানি হইত না। হরতালের বিকল্পের প্রসঙ্গ আসিত না ও প্রতিবারই একটি সরকারের মেয়াদান্তে এমনভাবে অচলাবস্থা তৈরি হইত না। অথচ কী নির্মম পরিহাস যাহাদের কারণে হরতাল সংস্কৃতি বিকশিত হইয়াছে, তাহারাই আজ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সমালোচনায় মুখর। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হইলেও এই নীতিতে আমাদের অনেকেরই বিশ্বাস ও আস্থা দেখা যাইতেছে না। বলাবাহুল্য, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের স্বরূপ ইহাই।
