১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সহায়তা করেছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠন। তাদের অবদানকে স্বীকার করে বিদেশি এই সকল বন্ধুদের এ বছর ৬ষ্ঠ বারের মতো সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা গ্রহণ করতে ঢাকা এলে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ বেগম নাসিম আক্তার এবং ভারতের মানবাধিকার কর্মী উত্পলা মিশ্রের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন রাবেয়া বেবী
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত
- বেগম নাসিম আক্তার
১৯৭১ সালের তদানীন্তন পাকিস্তানের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বেগম নাসিম আক্তার বলেন, ধর্মের নামে জঙ্গিরা বাংলাদেশে সংগঠিত হচ্ছে, পাকিস্তানেও। ইসলাম কোনো অবস্থাতে ধ্বংস সমর্থন করে না। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বিদেশি বন্ধুদের এবছর ৬ষ্ঠ বারের মতো সম্মাননা প্রদান করা হয়। বেগম নাসিম আক্তারকে বাংলাদেশের পক্ষে সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা গ্রহণের জন্য ঢাকায় এলে ইত্তেফাকের কাছে তার অভিব্যক্তি বর্ণনা করেন। বেগম নাসিম আক্তার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাতের হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে বলেন, আমি দেখেছি মানুষ কিভাবে ক্ষমতা আর অহংকারের জন্য পশুর পশুত্বকে হার মানায়। যা এর আগে বুঝতে পারিনি। আমি উপলব্ধি করি এদেশের স্বাধীনতা মানবতার জয়। আমরা বলছি, তোমরা শুনছো সেসময় অবিচার হয়েছে, এদেশের ওপর, এদেশের মানুষের ওপর; কিন্তু ঠিক সেই সময়টা না দেখলে, যারা স্বজন হারিয়েছেন, যেসকল নারী নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন, দিনের পরদিন যারা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন, তা সেভাবে উপলদ্ধি করা যাবে না। সন্তান সম্ভবা মা, শিশু, রুগ্ন ব্যক্তি, প্রবীণ কেউ তার বাইরে ছিল না। ভাবতে ঘৃণা হয় ওরা মুসলমান ছিল। তাই এদেশের স্বাধীনতা সেই সকল নির্যাতনের শিকার মানুষগুলোর পাওনা, আমি ঠিক ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের মতো আজও অহংকার করি, গর্ব বোধ করি এদেশের স্বাধীনতা নিয়ে। ঢাকায় পার্টির মিটিং-এ যোগ দিতে এসে ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর একজন প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে যান তিনি। নাসিম বলেন, ৭০-এর নির্বাচনে শেখ মুজিব সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও যখন ক্ষমতা পায়নি, তখনই ভুট্টোর দুরভিসন্ধি সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হলাম। মুজিবের ডাকা স্টাইক গুলো এমন কঠোর ভাবে পালন হতো যে একটি সাইকেলও রাস্তায় দেখা যেত না। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো। সেসময় মতিয়া চৌধুরী একটি ট্রাকে করে আমাকে পাকিস্তানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। অন্ধাকার রাতে পালিয়ে যাওয়ার সময় নিথর পরে থাকা মানবদেহগুলো ও তার চারপাশে ঘুরে বেড়ানো কুকুরগুলো আমাকে আরো বেশি সোচ্চার করে। আমি বলতে বাধ্য হই, এই সেনারা কুকুরগুলোর চেয়ে নিচ। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস নাসিম আর তার পরিবার লুকিয়ে ছিলেন, কারণ মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করার জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আর তাকে ও তার পরিবারকে দেশদ্রোহী, গাদ্দার বা বিশ্বাসঘাতক বলে আখ্যায়িত করেছিল। তাতে কোনো কষ্ট ছিল না তার, কষ্ট হতো অসহায় মানুষের জন্য সেদিন কিছু না করতে পেরে। যুদ্ধের খবরগুলো তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও ও বিবিসি থেকে শুনতেন। অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করে একটি প্রেসে তিনি ও তার স্বামী বাংলাদেশের গণহত্যার কথা প্রচার করার জন্য লিফলেট ছাপান। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫/১৬ জন শিক্ষার্থী তা সর্বত্র বিলি করে জেলে যায়। বাংলাদেশের জন্য গণসংযোগ করে নাসিমও কারাবরণ করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে জেলে থাকা বন্দি শিক্ষার্থীদের মাঝে তিনি মিষ্টি বিতরণ করেন এবং জয়বাংলা শ্লোগান দেন। ৪২ বছর পর এইদেশের মানুষ তাকে মনে রেখেছে বলে অভিভূত হয়ে নাসিম বলেন, আমি আমার মেয়েকে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে বিয়ে দিয়েছি। দৃঢ় কণ্ঠে নাসিম বলেন, আবশ্যই ওদের শাস্তি হওয়া উচিত, কারণ ওরাই পাকসেনাদের সবকিছু চিনিয়ে দিয়েছে, তানা হলে এমন ক্ষতি হতো না, বুদ্ধিজীবীরা বেঁচে যেতেন। বিশ্বের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের বিচার হতে হবে। তিনি বলেন, শুনেছি তোমরা শাহবাগে আন্দোলন করছো, আমারও এই আন্দোলন। কারণ ওরা বদলায়নি না পাকিস্তানে না বাংলাদেশে। পাকিস্তানের কি বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত এমন প্রশ্নের জবাবে নাসিম আবারও দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, অবশ্যই উচিত এবং তা চাইবেও। পাকিস্তানের মানুষও চায়, তবে কিছু সময় লাগবে কারণ এদেশের সাধারণ মানুষ তখনকার সময়ের অন্যতম প্রশিক্ষিত ও আধুনিক সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছে। তা তারা তখনো মানতে পারেনি আজও ভুলতে পারেনি।
অপরাধীর শাস্তি হবে এটাই স্বাভাবিক
- উত্পলা মিশ্র
ভারতের মানবাধিকার কর্মী উত্পলা মিশ্র বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার অবদান কতটুকু ছিলো কিংবা কতটুকু করতে পেরেছেন বা না পেরেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি তিনি পেয়েছেন। এদেশের মানুষের সাথে তার আত্মিক সম্পর্ক হয়েছে। আজ অবধি সেই মানুষগুলো বিশ্বে যে কোন প্রান্ত থেকে যখন তাকে মনে করেন, একটি উপহার পাঠান, তখন তা ৭১’র জন্যই হয়, আর সেই সময়কার কথা মনে করিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রাপ্তিকালেও তিনি সে কথাই বলেন। ১৯৭১ সালে এপ্রিলের শুরুতে যখন এদেশ থেকে শরণার্থীরা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যেতে থাকে তখন উত্পলা একটি মানবাধিকার সংস্থার সাথে জড়িত। তাদের অফিসের নিচে একটি চার্চ ছিলো, সেখানে খ্রিষ্টানরা শরণার্থী সাহায্য করতে শুরু করলে উত্পলা সে কাজে এগিয়ে যান। উত্পলা নিজের বাড়ি, স্বামীর গাড়ি আর পরিবারে হাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করেন এদেশের মানুষের জন্য। উত্পলার নিজের বাড়ি আর শ্বশুরালয়ের পরিবেশ তার এমন মানসিকতা গঠনে বিশেষ সাহায্য করে। উত্পলা বলেন, প্রপিতামহ, পিতামহ বসুমতি প্রত্রিকা প্রকাশ করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাপ্তাহিক সে পত্রিকা রাতারাতি দৈনিক হয়ে যায়। তাই মানুষ, যুদ্ধের খবর এবং করণীয় আবহটা তার পরিবারে ছিল। মিশ্র শুরু থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেন। ভারতে বাংলাদেশি রাজনৈতিক সমাবেশ আয়োজন তার বিশেষ ভূমিকা ছিল। তার বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিকট আত্মীয়সহ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অবস্থান করেন। উত্পলা শরণার্থী শিবিরের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অসুস্থদের সেবা শুশ্রূষাও প্রদান করেন তিনি। সে সময়কার বিশেষ কোন স্মৃতির কথা জানতে চাইলে মিশ্র বলেন, যুদ্ধবিধস্ত দেশের মানুষগুলো বাড়িঘর ফেলে শুধু হাত-পা নিয়ে ভারতে যায়, অনেকে পরিবারের সবাইকে নিয়েও যেতে পারেনি। তাদের সাথে আবার দেখা হবে কিনা তারও ঠিক নেই। কিন্তু তারা সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো দেশ স্বাধীন হবে । অনেকে বলেন আমরা তাদের সাহস দিয়েছি। আমি বিশ্বাস করি বরং তাদের অত্মবিশ্বাসই আমাদের কাজের পাথেয় ছিল। সে সময় কাজ করতে গিয়ে কোন বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে উত্পলা বলেন, আমি খুব সচেতন ছিলাম, অকারণে বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে আসতাম না। আমার মনে সব সময় থাকতো এমন কোন কাজ করবো না যাতে মূলকাজটা ব্যাহত হয়। তবে একবার ইংল্যান্ড থেকে আশা একটি তরুণ দল আমাদের সাথে পরিচিত হয়ে আমাদের সহযোগীদের চেষ্টায় বর্ডার পার হয়। বাংলাদেশের গণহত্যার পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে ওরা ভালো কাজ করে। তাদের বিষয় ডিসট্রিক জজ আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ওরা কিভাবে গেল? আমি সত্যি উত্তরটা দেই। উত্পলার শ্বশুর বাড়ি বাংলাদেশের যশোহর জেলায়। যদিও পঞ্চাশের দশকে তারা দেশ ছাড়ে। এর আগে কখনো এদেশে এসেছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৭২’র জানুয়ারিতে যেদিন বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন সেদিন অনেকের সাথে আমি ও আমার স্বামী পায়ে হেঁটে এসেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা বলেছিলেন, তখন ভারতবর্ষের সমগ্র মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেছে। আমার মনে হয় উনি যথার্থ বলেছেন। আমরা নিজের যুদ্ধই মনে করেছি। একজন নারী হয়ে মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনের বিষয়টি কিভাবে দেখেন, জানতে চাইলে উত্পলা বলেন, যখন কোথাও যুদ্ধ হয় তখন সেখানে নারীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাদের উপর নির্যাতন হয়। এখানেও হয়েছে। তবে এদেশের মানুষ সেই নারীদের সম্মান দিয়েছে, তাদের বীরাঙ্গনা উপাধী দিয়েছে, সারা পৃথিবীতে নারীর অবস্থান সৃষ্টিতে যা ভূমিকা রেখেছে। এদেশের নারীর অবস্থান সম্পর্কে উত্পলা আরো বলেন, নারীরা বেরিয়ে এসেছে। দেশের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে আরো এগিয়ে যাবে। এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে, এ সর্ম্পকে তার অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, অপরাধীর শাস্তি হবে এটা স্বাভাবিক পক্রিয়া। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা সমর্থন করি।
