রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঝুঁকিতে অর্থনীতি

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৩, ২২:৩০
রাজতৈনিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। একের পর এক টানা হরতালের কারণে অর্ডার নিয়েও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারছেন না রফতানিকারকরা। কাজ অনেকক্ষেত্রে শেষ হলেও তা সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ফলে অনেকে রফতানির অর্ডার নিতে সাহস করতে পারছেন না। অনেকেই বিনিয়োগ করার চেয়ে অপেক্ষা করাকেই শ্রেয় মনে করছেন। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যদিকে সময়মতো রফতানি করতে না পারলে ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হওয়ার ভয় উদ্যোক্তাদের ভাবিয়ে তুলছে। তাই অনেকে কাজের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অর্ডার না নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসানোর জন্য চেষ্টাও করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সে চেষ্টাও কোনো আশা জাগাতে পারেনি। ফলে অনিশ্চিত রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, শিল্প-কারখানা পরিচালনার জন্য চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুত্ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই জেনারেটর ও ডিজেল দিয়ে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। তার উপর জ্বালানির দাম বাড়ায় উত্পাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শিল্পের আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগ লাভজনক হচ্ছে না। এদিকে ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ করায় তা পরিশোধে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। তার উপর ঋণ শ্রেণিকরণের সময় কমিয়ে আনায় ঋণ খেলাপির আশঙ্কাও ভাবিয়ে তুলছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ করে টিকে থাকা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ কয়েকটি গ্রুপের ব্যাংক জালিয়াতির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এলসি খোলার ক্ষেত্রে এবং অভ্যন্তরীণ বিল কেনার ক্ষেত্রে বেশ অনীহা দেখাচ্ছে। সবদিক থেকেই যেন বিনিয়োগকারী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য নেতিবাচক ইঙ্গিত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দফায় দফায় হরতালের ক্ষতিকর প্রভাবে দেশের ভোক্তা পর্যায় থেকে শুরু করে সবাই প্রভাবিত হচ্ছেন। ভোক্তাদের উচ্চদামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। আর শিল্পোদ্যোক্তারা রফতানি সময়মতো করতে না পারায় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ফলে গোটা অর্থনীতিতেই ব্যয় বৃদ্ধিজনিত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে জিডিপির উপর সাময়িক প্রভাব না পড়লেও সঞ্চয় ও বিনিয়োগের উপর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টত পড়বে। পাশাপাশি আগামীতে জিডিপির উপর নেতিবাচক প্রভাব বড় হয়ে দেখা দেবে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, দেশে হরতাল, সংঘাতের মতো কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য অশুভ বার্তা বহন করে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়। রাজনৈতিক সংঘাত ও হরতালের মতো কর্মসূচি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দেশের স্বার্থে এ ধরনের আত্মঘাতীমূলক কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশব্যাপী হরতাল ছাড়াও জেলাভিত্তিক হরতালের কারণে অনেক সময়ই পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে ঢাকায় হয়তো হরতাল নেই, কিন্তু চট্টগ্রামে হরতাল রয়েছে। ফলে রফতানির কার্যক্রম ঠিকই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে দফায় দফায় টানা হরতালের কারণে ভোগ্যপণ্য তথা সবজি ও ফল সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটছে। এতে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরে সবজির দামেও প্রভাব পড়ছে। হরতালের কারণে সরবরাহ করতে না পারায় মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা ফসল তুলেও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে দেশের শেয়ারবাজারের উপরও। গত দুই বছর ধরে শেয়ারবাজারে মন্দা থাকলেও সামপ্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় মন্দার ক্ষত গভীর হয়ে উঠছে। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো ক্ষতির শিকার হচ্ছে। তাছাড়া অনেক ধরনের অনিশ্চয়তাও রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা বাজারে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। এতে বর্তমানে গত প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেন (গড়) হচ্ছে।