অগণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা দখল ঠেকানো নিশ্চিত করতে হবে

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ২২:৪১
সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আর যেন কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে কোন অবস্থাতেই কোনরূপ দলীয় স্বার্থে ব্যবহূত হতে দেবে না।’ গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণদানকালে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশের সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য থাকতে হবে। সংবিধান এবং গণতন্ত্র বিরোধী যে কোন কর্মকাণ্ড সকল শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে। মনে রাখতে হবে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের বিনিময়ে দেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস-অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব ও বিমান বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আবু এসরার অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদুজ্জামান, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মাদ জয়নুল আবেদিন ও প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত শেখ হাসিনা সেনাকুঞ্জে পৌঁছলে তিন বাহিনীর প্রধানগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অব অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু বেলাল মো. শাফিউল হক তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। অতীতে স্বার্থান্বেষী মহল গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করতে সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর পিঠে সওয়ার হয়ে সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন এবং সন্ত্রাসের খড়গ নেমে এসেছিল নিরীহ জনগণের উপর। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা এইসব অপশাসনে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীকে যে কোন প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে রাখা হবে। বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো অবস্থাতেই কোনরূপ দলীয় স্বার্থে ব্যবহূত হতে দেবে না। এই প্রতিষ্ঠানকে এর নিজস্ব ভাবমূর্তিসহ পেশাগত দিক দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তাঁর সরকার তা করেছে এবং করবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সশস্ত্র বাহিনীর সকল প্রকার কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার স্বার্থে একে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা একান্ত অপরিহার্য। শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে সরকার যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক তখনই একটি দুষ্টচক্র পবিত্র ধর্মকে পুঁজি করে এই বিচার প্রক্রিয়া বানচালে উঠে-পড়ে লেগেছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন কতিপয় রাজনৈতিক দল যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সমগ্র দেশে হত্যা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে ’৭১-এর ন্যায় ভয়ংকর তাণ্ডব চালিয়েছে।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতির এই সন্ধিক্ষণে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র চাই, নাকি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র চাই। তিনি দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত আমাদের সমাজ তাদের হীন-অপচেষ্টাকে অবশ্যই প্রতিহত করবে। কোন অশুভ শক্তি পৃথিবীতে স্থায়িত্ব পায়নি। আমি নিশ্চিত যে, এবারও পাবে না। শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ গোষ্ঠী আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে ইসলাম বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে নানামুখী অপপ্রচার ও চক্রান্তের জাল বিস্তার করে চলেছে। একথা দিবালোকের মতো সত্য যে, আওয়ামী লীগ এদেশের ধর্মভীরু কোমলমতি মানুষের সংগঠন এবং আওয়ামী লীগ ইসলাম ও বাঙালি মুসলমানদের কল্যাণে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। তিনি বলেন, অতীতের যে কোন সরকারের তুলনায় ধর্মীয় ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অবদান অনেক বেশি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দিতে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট করতে ব্যাপক অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি সামরিক অফিসারদের প্রতি তাদের চক্রান্তের বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি রাজনৈতিক দল ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস নামে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে থাকে। অথচ ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের নামে সেনাবাহিনীতে একদিনে একজন নারী কর্মকর্তাসহ ২৫ জন কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিল। সে হত্যাকাণ্ডের কোন তদন্ত হয়নি। কোন বিচার হয়নি। সেসব পরিবারের সদস্যদের কোন সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়নি। বরং তাদের পরিবারকে নিষ্ঠুরভাবে সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৭ সালে যে ক্যু হয় তাতে বিমানবাহিনীর ৫৬২ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ১৯ বার ক্যু হয় এবং এতে শত শত সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক নিহত হন। তিনি বলেন, পিলখানা বিদ্রোহ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন, কিন্তু সেই সংকটকালে আমরা কাউকে পাশে পাইনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯১ সালের বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী অনেক বিডিআর সদস্য ২০০৯ সালের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছে। আমি মনে করি, ১৯৯১ সালের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ২০০৯ সালের ভয়াবহ বিদ্রোহ এড়ানো যেতো। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার বিডিআর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়াতে তাঁর সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সংবিধান তথা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ন্যায় সশস্ত্র বাহিনীকেও যে কোন হুমকি মোকাবেলায় সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আপনাদের ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজেদের সর্বদা প্রস্তুত রাখতে হবে। আমার বিশ্বাস আপনারা নিজেদের প্রজ্ঞা, পেশাগত দক্ষতা ও কর্তব্য নিষ্ঠা দিয়ে স্বদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবেন।’ শেখ হাসিনা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কাজেই এ বাহিনীর সিনিয়র-জুনিয়র সকল সদস্যকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠতে ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত থাকতে হবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোন রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই সশস্ত্র বাহিনীর সকল স্তরে চেইন-অব কমান্ড বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, চেইন-অব কমান্ডকে সুদৃঢ় করার জন্য এবং সশস্ত্র বাহিনীকে পেশাগত ও নৈতিক মানদণ্ড রক্ষা করতে যে কোন প্রস্তাবকে আমরা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে বিবেচনা করবো। বর্তমান সরকার পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সদস্যরা সুদক্ষ, প্রশিক্ষিত ও সুশৃংখল হবে এবং তাদের কাজে ও চিন্তায় এর প্রতিফলন ঘটবে।