কর্পোরেট জগতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে প্রতিযোগিতা। কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালন করলেই হবে না, সে সঙ্গে তুখোড় হতে হবে যোগাযোগসহ অন্যান্য দক্ষতায়। কারণ কর্মক্ষেত্রে উন্নতি অনেকটাই নির্ভর করে আপনি যোগাযোগে কতটা পারদর্শী তার ওপর। জেনে নিন যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোর কৌশল সম্পর্কে। কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য প্রথমেই নজর দিতে হবে নিজের উপস্থাপন ভঙ্গির ওপর। অন্যের কাছে নিজেকে প্রকাশ করা চাই আকর্ষণীয়ভাবে। সঠিক ব্যক্তিত্ব ও রুচিবোধ যেন আপনার কথাবার্তা ও চালচলনে ফুটে ওঠে শতভাগ। নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক না থাকলে সেই প্রতিষ্ঠান কখনও উন্নতি করতে পারে না। অফিসে নিজেকে একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সবার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের ক্ষমতা থাকতে হবে। সব সময় গম্ভীর হয়ে থাকা কিংবা প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলার অভ্যাস সবার সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার জন্য তাই বাড়াতে হবে আবেগীয় দক্ষতা। সহকর্মীর সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানান ও উত্সাহিত করুন। এতে সম্পর্কে সরলতা বাড়বে। একসঙ্গে কোনো কাজ করতে গেলে সবার মতামত নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। আগ বাড়িয়ে নিজেই সব করে ফেলতে যাবেন না। নিজের ভুল হলে তা স্বীকার করুন সঙ্গে সঙ্গে। ভুল শুধরে নিয়ে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এটি অন্যের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলবে। নিজে কথা বলবেন অবশ্যই, তবে তার আগে মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার অভ্যাস করুন। কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় তা গুরুত্বের সঙ্গে শুনুন। প্রসঙ্গের বাইরে কথা বলতে যাবেন না।কথা শোনা শেষ হলে আপনার বক্তব্য গুছিয়ে বলুন। নিজের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করুন। তবে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য কখনও জোর খাটাতে যাবেন না। আপনার বক্তব্যের পক্ষে জোরালো যুক্তিগুলো তুলে ধরুন সুন্দর করে। সব সময় কথা বলবেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। তবে আচরণে অহঙ্কার বা জেদ যেন প্রকাশ না পায় সেদিকে লক্ষ রাখবেন। অন্যের কথার জবাব হাসিমুখে দিন। কোনো কারণে বিরক্ত হলেও সবার সামনে তা প্রকাশ করবেন না। কর্মক্ষেত্রে সব ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর জন্য উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োগ জরুরি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে শরীরী ভাষাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনার অঙ্গভঙ্গি যেন অন্যকে বিরক্ত না করে সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। কথা বলার সময় অযথা হাত-পা নাড়ানো কিংবা চিত্কার করা উচিত নয়। পাশাপাশি চাই সঠিক বাচনভঙ্গি ও ভাষাগত দক্ষতা। বাংলা ও ইংরেজি ভাষা নির্ভুলভাবে বলতে হবে। ভাষায় আঞ্চলিকতা থাকলে তা পরিহার করা জরুরি। শুদ্ধ ভাষা, স্পষ্ট উচ্চারণ ও কথা বলার মোহনীয় ভঙ্গি আপনার যোগাযোগকে আরও সাবলীল করে তুলবে। বর্তমানে কর্পোরেট যোগাযোগের বেশিরভাগই হয় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে। তাই তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা চাই পুরোপুরি। আবার অফিসের প্রয়োজনে লিখিত যোগাযোগের প্রয়োজনও পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে সঠিক প্রয়োজনটি যেন লেখার মাধ্যমে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে তা লক্ষ রাখা জরুরি।
লক্ষ করুন
আলোচনা থেকে সরে যাবেন না :আলোচনায় অতীতের ঘটনা তুলে আনা উচিত নয়। ফলে বর্তমানে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তা চাপা পড়ে যায়। তাই যে বিষয়ে আলোচনা শুরু করবেন, চেষ্টা করা উচিত, আলোচনাটি যেন সেই বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর যে আলোচনাই করুন না কেন সেটা শেষ করে তবেই ওঠার চেষ্টা করুন।
দায়িত্ব নিতে শিখুন :ভালো এবং কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতার প্রথম শর্তই হলো নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া। কোনো আলোচনা বা তর্কে যদি আপনার তরফ থেকে কোনো ভুল তথ্য দেওয়া হয় অথবা আপনি যদি ভুল কথা বলে থাকেন, তাহলে তা স্বীকার করতে শিখুন। আর নিজের ম্যাচিউরিটির প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করুন।
সমালোচনাকে ভালোভাবে নিন :সমালোচনা মানেই কিন্তু খারাপ কিছু নয়। যখন কেউ আমাদের সমালোচনা করে, আমরা তাতে রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ি। কিন্তু সেটা উচিত নয়। কমিউনিকেশন ইমপ্রুভ করার জন্য যেকোনো ধরনের সমালোচনাকে পজিটিভলি নিতে শিখতে হবে এবং সেটাকে ইতিবাচক কাজে লাগাতে হবে। এভাবে নিজেকে তৈরি করুন।
ভালো শ্রোতা হোন :অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনাও কিন্তু কমিউনিকেশনের অংশ। নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করে অন্যের সামনে তুলে ধরতে গেলে অন্য পক্ষের বক্তব্য শোনাও সমান জরুরি।
ছাড় দিতে শিখুন :সব তর্ক বা আর্গুমেন্টে জিততে হবে, এর কোনো মানে নেই। কমিউনিকেশন সাকসেসফুল করতে চাইলে মাঝেমধ্যে কম্প্রোমাইজ করুন। এতে আপনার হার হবে না, বরং মানসিকভাবে তৃপ্তও হতে পারেন আপনি।
প্রয়োজনে সাহায্য নিন :যদি কখনও আপনার মনে হয়, আপনি কোনো পরিস্থিতি ঠিক সামলাতে পারছেন না অথবা আপনার পয়েন্ট অব ভিউ কাউকে বুঝাতে পারছেন না, তাহলে কারও সাহায্য নিন। এতে উপকার হবে। মনে কোনো দ্বিধা রাখা উচিত নয়।
আলোচনা সমাপ্ত করুন :কোনো আলোচনাই অসমাপ্ত রাখা উচিত নয়। যদি কোনো কথা মাঝপথে অসমাপ্ত রেখে উঠে যেতে হয়, তাহলে খেয়াল রাখবেন, সেটার যেন পরিণতিতে পৌঁছা যায়। একটু সমঝোতা, একে অন্যের কথা শোনাটা খুব জরুরি। অন্যের পয়েন্ট অব ভিউ বুঝার চেষ্টা করুন। বেশিরভাগ সময়ই আমরা আমাদের কথা বা পয়েন্ট অব ভিউকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকেও গুরুত্ব দিন। অন্য একজন মানুষের পয়েন্ট অব ভিউ বুঝলে তবেই না নিজের মতামত অন্যের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারবেন।
নিজের মতামত জানান :যদি আপনার কারও কথা পছন্দ না হয়, তাহলে কখনও বলবেন না যে, তিনি ভুল বলছেন। এ কথাটাই সামান্য ঘুরিয়ে বললে দেখবেন, কথার গুরুত্ব আরও বেড়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে আপনি যেমন আপনার মতামত বা পছন্দ-অপছন্দের কথা অন্যকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে পারবেন, তেমনি কারও আবেগকেও আঘাত করা হবে না।
শারীরিক ভাষা :কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খুব জরুরি। আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে যদি কনফিডেন্স না থাকে, তাহলে যারা আপনার কথা শুনছেন, তাদেরও আপনার ওপর কনফিডেন্স গ্রো করবে না।
পরোক্ষ যোগাযোগ :পুরোনো বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা না হলেও তাদের ফোন-মেইল বা দু-একটি এসএমএস করুন। এতে অনেক সহজ হয়ে উঠবেন আপনি। কমিউনিকেশন স্কিল হঠাত্ এক দিনেই ইমপ্রুভ করা বা পাল্টে ফেলা যায় না। এটি একটি দীর্ঘতর প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের অভ্যাসই পারে আপনার কমিউনিকেশন দক্ষতা বাড়াতে।
মডেল ফারিয়া শবনম
ছবি সৌজন্যে অঞ্জন’স
