‘ইমাজিনা না কোপা।’
ফুটবলে রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মাঠে-ঘাটে,ব্যস্ত রেল স্টেশনে, এয়ারপোর্টে বিমানের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়ানো মানুষের ভিড়ে কিংবা রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া মানুষের মুখে আপনি এখন শুধু এই একটি কথাই শুনতে পাবেন!
মানুষের মুখে মুখে ফেরা এই পর্তুগীজ বাক্যটি দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে এখন অনেকটা প্রবাদে পরিণত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ‘ভেবে দেখো বিশ্বকাপের সময় কি মজাটাই না হবে!’
ফুটবলের তীর্থভূমি ব্রাজিলে আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবল প্রেমে মাতোয়ারা এই দেশটির প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ প্রস্তুত ফুটবল মহাযজ্ঞে শরীক হতে। উপরের বাক্যটি তারই প্রমাণ। তবে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি শঙ্কারও কমতি নেই। ১৯৫০ সালের পর এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেল দেশটি। নির্ধারিত সময়ের আগে সবগুলো ভেন্যু এবং অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে উঠবে কিনা এ নিয়ে এখনো সন্দিহান অনেকেই। এমনকি চলতি বছরে অনুষ্ঠেয় কনফেডারেশন কাপের আগে প্রতিযোগিতাটির জন্য নির্ধারিত ভেন্যু নিয়েও রয়েছে সংশয়।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা অবশ্য আশাবাদী যথাসময়েই তৈরি হয়ে যাবে সবকিছু। তবে বিশ্বকাপের আয়োজক ব্রাজিলের ১২টি শহরের প্রশাসনকে যে সেসময় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে সে বিষয়ে সবাই একমত। কারণ দক্ষিণ আমেরিকা তো বটেই পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ ব্রাজিল। আর সাওপাওলো, রিও ডি জেনিরো এবং রাজধানী ব্রাসিলিয়া; এই তিনটি শহরের সম্মিলিত লোকসংখ্যাই প্রায় চার কোটি। এর সাথে বিশ্বকাপের সময় যুক্ত হবে আরো কয়েক লক্ষ বিদেশি পর্যটক। রাস্তাঘাট,দোকানপাট প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের সময়ে যে চাপের সৃষ্টি হবে, সেটা বিশ্বকাপের আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করবে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তবে দেশটির স্বনামধন্য লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ পাউলো রেসেন্ডে ভাবছেন ঠিক উল্টো। তিনি মনে করছেন, ব্রাজিলের মানুষের অতিরিক্ত ফুটবল প্রেম আয়োজনের ক্ষেত্রে কোন বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বরং শেষ পর্যন্ত এটিই বিশ্বকাপ আয়োজনকে সফল করে তুলবে। এটি যে শুধু কথার কথা নয়, তার প্রমাণ হিসেবে যুক্তিও হাজির করেছেন তিনি।
দেশটির বিশটি শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেশন এবং ট্রাভেল এজেন্সির উপর একটি জরিপ চালানোর পর রেসেন্ডে বিশ্বাস করছেন, বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিলের এয়ারপোর্ট এবং রাস্তাঘাটগুলো অন্যান্য সময়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম যানবাহনের মুখোমুখি হবে। কারণ, তার আশঙ্কা হচ্ছে অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে এসময় বড় বড় কোম্পানিগুলো ব্রাজিলে তাদের ব্যবসায়িক ভ্রমণ বাতিল করবে, সাধারণ পরিবারগুলো তাদের দেশের ভেতরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছুটি বাতিল করবে এবং কিছু মানুষ বাসায় টেলিভিশনের সামনে খেলা উপভোগ করতে আগেভাগেই ঘরের পথে পা বাড়াবে। অন্য কথায় বলা যায়, ‘ইমাজিনা না কোপা’ ই এগিয়ে আসবে বিশ্বকাপকে রক্ষা করতে।
বেলো হরাইজন্টালে একটি বিজনেস স্কুলের ডীনের দায়িত্ব পালনরত রেসেন্ডে আরো বলেন, ‘আমাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে একে। আমাদের অদক্ষতাই আমাদের সাহায্য করবে। মানুষ এই বিশ্বকাপটা সম্পর্কে এতটাই উদ্বিগ্ন যে, কিছু মানুষ দরজা আটকে বসে থাকবে।’
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় সর্বশেষ বিশ্বকাপে বিদেশি অতিথির সংখ্যা ছিল প্রায় তিন লাখ। ব্রাজিলে হয়তো সংখ্যাটা হবে আরো বেশি। রেসেন্ডের ভাষ্যমতে এ ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তিনি যতগুলো ট্রাভেল এজেন্সির উপর জরিপ চালিয়েছেন তারা সবাই জানিয়েছে বিশ্বকাপ ভেন্যু বারটি শহরে এজেন্সিগুলো কার্যক্রম মুলতবি রাখবে। তারা আরো জানিয়েছে, স্বাভাবিকভাবে বছরের ঐ সময়টাতে যে পরিমাণ মানুষ অন্যত্র বেড়াতে যেতে চায় ২০১৪ সালেও তার ব্যতিক্রম হবে না।
লন্ডন অলিম্পিকের উদাহরণ টেনে রেসেন্ডে বলেন, অলিম্পিকের সময়টাতে প্রচুর পরিমাণে লোক অন্যত্র ছুটি কাটাতে গিয়েছিল যা কিনা শহরকে অতিরিক্ত চাপের হাত থেকে রক্ষা করে। তবে জার্মানিতে ২০০৬ বিশ্বকাপের সময় তেমনটা দেখা যায়নি।
হয়তো শেষ পর্যন্ত সত্যিই হতে পারে রেসেন্ডের ধারণা। কারণ, ব্রাজিল যে অনেক দিক থেকেই আলাদা!
