উচ্চ মাধ্যমিক পরবর্তী শিক্ষা জটিলতা ও সম্ভাব্য সমাধান

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৬
সরকারি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সীমিত আসন ও উত্তরোত্তর প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি সরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগকে কঠিন করে তুলছে। প্রতিবছর উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোতে আসনসংখ্যা যে হারে মোটেও বাড়ছে না। তবে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা গ্রহণ যে দুরূহ হয়ে উঠছে তার পেছনে সীমিত আসনই একমাত্র কারণ নয়। সঙ্গে আছে নানা অব্যবস্থাপনা ও ভর্তি প্রক্রিয়ার নানা জটিলতা। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ২০০৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর আমি যখন মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিই তখন ২২৫০ আসনের বিপরীতে আমার মেধাক্রম ছিল ২৬৩৫ এবং আমার আগে প্রায় ১৮০০ জন শিক্ষার্থী ছিল যারা দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়েছিল। অতএব মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে না পারায় আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান স্কুলে ফিশারিজ ও মেরিন রিসার্চ টেকনোলজি ডিসিপ্লিনে ভর্তি হই। পরবর্তী বছরে ভর্তি বাতিল করে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে ভর্তি হই তখন জানতে পারি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ডিসিপ্লিনে আরো ১৭ জন (মোট আসন ৩৫) ভর্তি বাতিল করে অন্যত্র ভর্তি হয়েছে। পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে আমরা প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলাম মোট ৪২ জন এবং দ্বিতীয় বর্ষে উঠতেই সেখান থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি বাতিল করে অন্যত্র চলে যায়। আর এটা যে শুধু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ডিসিপ্লিন বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের চিত্র সেটা কিন্তু নয় বরং এটা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়েরই চিত্র। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও সহজে অনুমেয়। বলা প্রয়োজন— আমার সময় মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় যে ১৮০০ জন দ্বিতীয়বার চান্স পেয়েছিল তাদের অধিকাংশই কিন্তু কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ভর্তি বাতিল করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিল। বলাবাহুল্য এই খালি আসনগুলো পরবর্তী সময়ে পূরণ হওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। তাহলে একদিকে যেখানে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন সংকট চরমে অন্যদিকে বছর বছর এই বিপুল সংখ্যক আসন খালি হয়ে পড়ে থাকা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নিজ দায়িত্বে পরীক্ষা নিয়ে থাকে। শহরকেন্দ্রিক এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে গ্রামে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভর্তি পরীক্ষায় ভালোভাবে অংশ নিতে পারে না। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের উপস্থিতি থাকে অনেক কম। এতে করেও গ্রামের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার এই সীমিত সুযোগের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়রানি বন্ধে (ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার আগে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ, পরীক্ষাকেন্দ্রে আশ্রয়ের অভাব, আর্থিক ক্ষতি ইত্যাদি) পুরো ব্যবস্থাতে আনতে হবে একটা সর্বজনগৃহীত পরিবর্তন। গত বছর মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলো এ ধরনের একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিল; এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তি। সর্বজনমহলে সেটা গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং শিক্ষার্থীদের প্রবল আন্দোলনের মুখে সেটা বাতিল হয়ে যায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তির এই সিদ্ধান্ত যে কতটা ভয়াবহ ও অযৌক্তিক ছিল তা একটি উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য ও বিভাগ পরিবর্তন অনুষদে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩১০০০, ৬০০০, ৮০০০ ও ১৫০০০। যার মধ্যে চান্স পাওয়া তো দূরে থাক ন্যূনতম পাস মার্ক অর্জনে ব্যর্থ হয় যথাক্রমে ১৬০০০, ৪৫০০, ৫০০০ ও ১৩৫০০ জন শিক্ষার্থী। আবার দেখা যায়, উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ৫ না পেয়েও অনেক শিক্ষার্থী মেধা তালিকায় স্থান করে নেয়। একই বোর্ড নিয়ন্ত্রিত পিএসসি, জেএসসি ও সমমান পরীক্ষাতেও আমরা যথেস্ট অসামঞ্জস্যতা দেখিছি। স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বরাবরই ভালো রেজাল্টধারী অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষক-অভিভাবকদের হতবাক করে জিপিএ ৫ পায়নি। আবার তাদের চেয়ে স্কুল পরীক্ষাগুলোতে খারাপ রেজাল্টধারী অনেক শিক্ষার্থীও জিপিএ ৫ পেয়েছে। জিপিএ ৫ না পাওয়া এই শিক্ষার্থীদের অনেকে আবার পরবর্তী সময়ে খাতা রিভিউ করে জিপিএ ৫ পেয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এই মূল্যবান আসনগুলো যেন বছরের পর বছর খালি হয়ে পড়ে না থাকে এবং তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় তার জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এজন্য সকলকে মিলে একসঙ্গে কাজ করা ছাড়া কোনো ভালো সমাধান বের করা সম্ভব নয়। এ সমস্যা সমাধানে কিছু প্রস্তাব ভেবে দেখা যেতে পারে— সকল উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিলিতভাবে একইসঙ্গে ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিতে হবে। পরীক্ষার বিষয়বস্তু হবে উচ্চ মাধ্যমিকে পঠিত সকল বিষয়। এ পরীক্ষার ফলাফল ও বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে একটা জাতীয় মেধা তালিকা তৈরি করতে হবে। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা উল্লেখপূর্বক ভর্তির সার্কুলার দিলে শিক্ষার্থীরা আবেদন করবে এবং জাতীয় মেধা তালিকা, তাদের উচ্চশিক্ষার অধ্যয়ন ইচ্ছুক প্রতিষ্ঠান ও সাবজেক্টের পছন্দক্রমের ওপর ভিত্তি করে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে দ্বিতীয়বার ভর্তির প্রবণতা অনেক কমে যাবে এবং তখন এ প্রথা বাতিল করে দিলেও সেটা বিতর্কিত হবে না। ফলে ভর্তি বাতিলজনিত কারণে মূল্যবান আসনগুলো আর খালি হয়ে পড়ে থাকবে না এবং শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে যাবে। তবে দেশব্যাপী একযোগে এ ধরনের পরীক্ষা নেওয়া একেবারে সহজ হবে না। এক্ষেত্রে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিমত থাকতে পারে এবং দুর্নীতির একটা বড় ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং ও শিক্ষার্থী সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে মতের প্রাধান্য দিতে হবে। দুর্নীতি রোধে প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে। এ বিষয়ে কঠোর আইন ও সেটা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনিবার্য কারণবশত যদি কেউ জাতীয় এ পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারে তবে সে পরবর্তী বছরে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। কিন্তু একবার অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থী কোনোভাবেই দ্বিতীয়বার অংশ নিতে পারবে না। কারণ সেক্ষেত্রে ভর্তি বাতিলের প্রবণতা দেখা যাবে। এ ধরনের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত কখনোই হুট করে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। নতুন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য তাদেরকে যথেষ্ট সময় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে জাতীয় পর্যায়ের কোনো সমস্যা রাতারাতি একবোরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া খুব দুরূহ কাজ। যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে সেগুলোকে একটা সহনীয় পর্যায়ে আনা যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়