নায়কই হতে চান নাসির

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৩, ২১:৪০
কেউ বলছেন, ভবিষ্যত্ মাইকেল হাসি; কেউ বলছেন, ভবিষ্যত্ ‘দ্য ফিনিশার’ মাইকেল বেভান। আর তার অধিনায়ক স্বয়ং বলছেন, তিনি হবেন বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই ভবিষ্যত্। তিনি নিজে কী হতে চান? ক্যান্ডির পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে আরেকটি ইস্পাতদৃঢ় স্নায়বিক ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে আনার পর মুখে হাজার ভোল্টের আলোকিত হাসি ছড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন—নায়কই হতে চাই। না, শাহাদাত হোসেন রাজীবের মতো চলচ্চিত্রের নায়ক হতে চান না। এরকম একটার পর একটা কঠিন ম্যাচ জিতিয়ে ক্রিকেট মাঠের নায়ক হতে চান নাসির হোসেন! নায়কের মতো ইনিংস খেলেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার আবির্ভাব হয়েছে। একেবারে প্রথম দিন থেকে ক্রিকেট মাঠের আলো কেড়ে নেয়ার অভ্যাস তৈরি করে ফেলা নাসির সম্ভবত তার ক্যারিয়ারের এখন পর্যন্ত সেরা ‘নায়কোচিত’ কাজটা করে ফেললেন বৃহস্পতিবার পাল্লেকেলেতেই। শ্রীলঙ্কা আগে ব্যাট করে ৩০২ রানের বিশাল পুঁজি ছুড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের সামনে। পাল্লেকেলের রেকর্ড এই রানের পেছনে ভালোই ছুটছিল বাংলাদেশ। বৃষ্টি এসে বাগড়া দিল; তখন বাংলাদেশের রান ১ উইকেটে ৭৮। আড়াইঘন্টা বৃষ্টিশেষে খেলা আবার যখন শুরু হল, বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য—২৭ ওভারে ১৮৩। মানে, পরের ১৩.২ ওভারে রান করতে হবে ১০৫। টি-টোয়েন্টিসুলভ এই লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের সব ব্যাটসম্যান যেন ভয়াবহ আতঙ্কে ভুগে একটার পর একটা ভুতুড়ে শট করতে থাকলেন; তাতে কিছু রান আসে, আবার স্রোতের মতো উইকেটও পড়ে। এই পরিস্থিতিতে সত্যিই ‘বেভান’ হয়ে গেলেন নাসির। প্রমোশন পেয়ে পাঁচ নম্বরে উঠে আসা এই তরুণ তুর্কি অন্যপ্রান্তের ব্যাটসম্যানের আচরণ বা বোলারদের থোড়াই পরোয়া করলেন। একটার পর একটা চার, শ্বাসরোধ করা সিঙ্গেল নিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে চললেন টানটান জয়ের দিকে। শেষ পর্যন্ত তিন ওভারে বাংলাদেশের দরকার ছিল ২৩ রান। মালিঙ্গার শেষ ওভারের প্রথম বলটাতে চার মেরে ব্যবধান আরও কমালেন নাসির। প্রান্ত বদলের পর ওই ওভারেই মালিঙ্গা দুই উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচ ঝুঁকিয়ে দিলেন শ্রীলঙ্কার দিকে। শেষ দুই ওভারে বাংলাদেশের দরকার ১৭ রান। নিশান্ত পেরেরার প্রথম চার বলে তিনটি চার মেরে সমীকরণ পকেটে পুরে ফেললেন নাসিরই। নাসির নিজেই বর্ণনা করছিলেন দম আটকানো এই সময়ের, ‘মালিঙ্গার ওই ওভারের পর আমাকে চান্স নিতেই হত। আমি শেষ ওভারের জন্য টেনশন রাখতে চাইনি। তাই পরপর লুজ বল পেয়ে মেরে দিয়েছি।’ পেরেরার পঞ্চম বলটাকেও চারের জন্য কাট করেছিলেন; শেষ পর্যন্ত চার না হলেও জয় নিশ্চিত করেই প্রান্ত বদলালেন। সোহাগের জন্য রেখে এলেন শুধু জয়সূচক রানের অপেক্ষাটা। এই বীরত্বকে নায়োকোচিত বলবেন না তো কী! এই ‘নায়ক’ খেতাবে এতোটুকু আপত্তি নেই নাসিরের। একেবারে ক্যারিয়ারের প্রথম দিন থেকে সংবাদ সম্মেলনে মনের কথা খুলে বলার জন্য খ্যাতি পেয়ে যাওয়া নাসির বললেন, সেই ছোটবেলা থেকে তার ক্রিকেটীয়-নায়কই হওয়ার স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নটা ব্যাটসম্যান হিসেবে সত্যি করতে রান তাড়া করার কোনো বিকল্প নেই। কারণ ‘নায়ক’কে জয়ের সময় মাঠে থাকতে হবে তো! নাসিরের অতি সরল এই জীবন দর্শনটা খুব পরিষ্কার, ‘আমি ছোট বেলায়, মনে হয় ১৩ বছর বয়সে বাচ্চাদের একটা ম্যাচে রান তাড়া করে দলকে জিতিয়েছিলাম। তখন খুব ভালো লেগেছিল। সেই থেকে রান তাড়া করে দলকে জেতাতে, ওই সময় মাঠে থাকতে ভালো লাগে। এখনও আমি রান তাড়া করাটা দারুণ উপভোগ করি। আমার ধারণা আস্কিং রেট যত বাড়তে থাকে, আমি তত ভালো খেলি। এরকম পরিস্থিতিতে আমার সেরা ক্রিকেট বেরিয়ে আসে। আমি বারবার এরকম খেলে দলকে জেতাতে চাই।’ নাসির বারবার এই কাজ করলে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের নতুন ‘ফিনিশার’ হয়ে উঠবেন। তবে আসল লাভটা হবে বাংলাদেশের। ফলে এখন সবারই নাসিরের হয়ে প্রার্থনা করা দরকার—তিনি যেন নায়ক হয়ে ওঠেন।