এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় উদ্বেগ

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৫
আগামীকাল হইতে শুরু হইতেছে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। অবর্ণনীয় উদ্বেগের মধ্যে ১০ লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীকে অংশগ্রহণ করিতে হইতেছে এই পরীক্ষায়। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নবীন শিক্ষার্থীদের জীবনে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দুইটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। ফলে এই দুইটি পরীক্ষাকে সামনে রাখিয়া তাহারা এমনিতেই অত্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে থাকে। বিনিদ্র রজনী যাপন করিতে হয় তাহাদের অভিভাবকদেরও। কিন্তু এইবারের উদ্বেগের ধরন একেবারেই ভিন্ন। ইহার সহিত পরীক্ষার প্রস্তুতির কোনো সম্পর্ক নাই। বরং সকল কিছুকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইবে কিনা সেই অনিশ্চয়তা। বাহ্যত এই অনিশ্চয়তার কারণ হইল বিরোধী রাজনৈতিক জোটের ঘোষিত হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। উপর্যুপরি হরতালের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হইয়াছে সদ্যসমাপ্ত এসএসসি পরীক্ষা। আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষাকে সামনে রাখিয়া আরও প্রকটাকার ধারণ করিয়াছে সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা। ফলে দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ। উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও। শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষার সময় হরতাল না দেওয়ার অনুরোধ জানাইয়াছেন খোলাখুলি। একই আকুলতা প্রকাশ করিয়াছেন পরীক্ষার্থীরাও। এইসব আবেদন-নিবেদনে যে কোনো কাজ হইবে না তাহা কাহারো অজানা নহে। বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা ইতিমধ্যে তাহা জানাইয়াও দিয়াছেন সুস্পষ্টভাবে। আমাদের দেশে হরতালের মতো সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি যে আকস্মিক নহে—তাহা কে না জানে! যখন যাহারা বিরোধী দলে বা ক্ষমতার বাহিরে ছিলেন সকলেই দিনের পর দিন হরতাল করিয়াছেন। জনমতের কিংবা জনদুর্ভোগের তোয়াক্কা করেন নাই কেহই। স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো স্বাধীন দেশে কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করার কথা ভাবা যায় না। দলমত নির্বিশেষে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সজ্ঞানে এমন কোনো কর্মসূচিও ঘোষণা করা সম্ভব নহে। কারণ ইহা যে আত্মঘাতী একটি পদক্ষেপ তাহা যেমন সুবিদিত, তেমন লক্ষ লক্ষ নবীন শিক্ষার্থীর বিরাগভাজন হইবার ঝুঁকিও কোনো রাজনৈতিক দল গ্রহণ করিবে বলিয়া মনে হয় না। অথচ আমাদের দেশে ঠিক তাহাই ঘটিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং ইহার আগেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হইয়াছে। স্বাধীনতার মতো বৃহত্ অর্জনের স্বার্থে এই ক্ষতি মানিয়া লওয়া যায়। স্বাধীনতার পরেও সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে বারবার ব্যাহত হইয়াছে শিক্ষাজীবন। গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের স্বার্থে স্বৈরশাসনামলের ক্ষতিও মানিয়া লইতে কাহারো আপত্তি থাকিবার কথা নহে। কিন্তু স্বৈরশাসনের অবসানপরবর্তী গত প্রায় দুই যুগ যাবত্ গণতান্ত্রিক রাজনীতির নামে যাহা ঘটিয়া চলিয়াছে তাহাকে আমরা মানিয়া লইব কিভাবে? সর্বোপরি, অর্থনীতিই যেইখানে মুখ থুবড়াইয়া পড়িতেছে, মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইতেছে মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা, সেইখানে শিক্ষার কথা আলাদাভাবে ভাবিবার অবকাশই বা কোথায়? নগর পুড়িলে দেবালয় রক্ষা পাইবে কিভাবে? দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, সর্বব্যাপী এই বিপর্যয় হইতে দেশ ও জাতিকে যাহাদের রক্ষা করিবার কথা—কুম্ভকর্ণের মতোই তাহারা নির্বিকার। সমঝোতা ও সহিষ্ণুতা ছাড়া যে গণতন্ত্র অচল—তাহা সকলেই জানেন। কিন্তু তাহার কোনো আলামত গত দুই যুগে যেমন দেখা যায় নাই, তেমনি এখনও দেখা যাইতেছে না। নিকট ভবিষ্যতেও তেমন কিছু হইবার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। তাহা হইলে গণতন্ত্র সচল থাকিবে কিভাবে আর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বিগ্ন জনগণ ভরসাই বা রাখিবে কোথায়? এইসব লইয়া বিস্তর আবেদন-নিবেদন হইয়াছে বিগত বত্সরগুলিতে। তুলিয়া ধরা হইয়াছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। উপর্যুপরি সতর্ক করা হইয়াছে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার পরিণতি সম্পর্কে। কিন্তু কেহই কর্ণপাত করেন নাই। পরিহার করেন নাই সংঘাতের পথ। এখন ভুক্তভোগী জনগণকেই স্থির করিতে হইবে যে, তাহারা কী করিবেন এবং কীভাবে রক্ষা করিবেন সন্তানের ও দেশের ভবিষ্যত্।