আটকে আছে ৩ হাজার কোটি টাকার তৈরি পোশাক

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৯
গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। টানা হরতাল এবং ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেকেই যথাসময়ে পণ্য রপ্তানি করতে পারেননি। এ কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন ক্রেতা ইতিমধ্যে তাদের অর্ডার বাতিল করেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক এবং রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, গত দুই মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের রপ্তানিযোগ্য পোশাক আটকে গেছে (রপ্তানির ভাষায় স্টকলট)। যথাসময়ে পণ্য জাহাজীকরণ না করতে পারার কারণে ক্রেতারা কোন কোন ক্ষেত্রে এসব পোশাকের অর্ডার বাতিল করেছেন। এছাড়া কোন কোন ক্ষেত্রে ক্রেতারা ডিসকাউন্টও দাবি করেছেন বলে জানা গেছে। পোশাক রপ্তানিকারকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পোশাক শিল্প হরতালের আওতামুক্ত হলেও এ শিল্পের বাস্তবতা হচ্ছে, একটি অর্ডার সম্পন্ন করতে বস্ত্র কারখানা, এক্সেসরিজ, ওয়াশিং, ডাইং, প্রিন্টিং, প্যাকেজিংসহ সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। কাঁচামাল বন্দর থেকে আনা ও উত্পাদিত পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে হয়। তাই সামান্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী কার্যক্রমই এ শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিঘ্নিত করে। এক ঘণ্টা বিলম্বের জন্য যদি তৈরি পোশাক জাহাজীকরণ করা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে ক্রেতার সাথে চুক্তি অনুযায়ী ডিসকাউন্ট, বিমানযোগে পণ্য পাঠানোসহ অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। এজন্য কিছু উদ্যোক্তা ইতিমধ্যেই স্টকলট পরিস্থিতির (অর্ডার বাতিল হওয়া উত্পাদিত পণ্য) সম্মুখীন হয়েছেন। বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মূর্শেদি বলেন, হরতাল আমাদের জন্য ঠিক ক্যান্সারের মতো। হরতাল হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়। তিনি জানান, তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে অনেক লিংকেজ কারখানা আছে। অনেক খুচরা পণ্য একসাথে করে পোশাক প্রস্তুত করা হয়। হরতালের কারণে একটি পণ্য পাওয়া না গেলে উত্পাদন ব্যাহত হয়। এতে জাহাজীকরণের সময়সীমা ধরা যায় না। বিজিএমইএ’র সাবেক এ সভাপতি আরো বলেন, বড় বড় কারখানাগুলো কোনমতে এখনো পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। কিন্তু ছোট এবং মাঝারি শিল্পগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। ক্রেতারা একবার অর্ডার বাতিল করলে এসব কারখানা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। ৩১ দিনের মার্চ মাসে সরকারি ছুটি আর হরতালের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম বন্ধ ছিলো ২২ দিন। মাস জুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক ছিলো মাত্র নয়দিন। এ কয়েকদিনও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোক্তাদের নানা সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর আগের মাস অর্থাত্ ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে সারা দেশে একই অবস্থা বিরাজ করেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে উত্পাদন ঠিক রাখা এবং উত্পাদিত পণ্য যথাসময়ে জাহাজে পৌঁছানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। রপ্তানিকারকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টানা কয়েকদিন হরতাল এবং নানা রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে অনেকেই তাদের প্রস্তুত করা পণ্য নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি করতে পারেননি। সমুদ্রপথে যেসব পণ্য ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছানোর কথা ছিলো সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় অনেকে জাহাজের সময়সূচি ধরতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তারা আকাশপথে পণ্য পাঠাচ্ছেন। রপ্তানিকারকরা জানান, ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুতও করা হয়েছে। কিন্তু সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় ক্রেতারা যথাসময়ে পণ্য পাঠানোর তাগিদ দিয়েছেন। এজন্য প্রায় ১৭ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসূত্রে জানা গেছে, প্রতিমাসে কার্গো ভিলেজ দিয়ে প্রায় ১০ হাজার টন পণ্য রপ্তানি করা হয়ে থাকে। সামপ্রতিককালে যেভাবে চাপ বেড়েছে তাতে প্রতিমাসে রপ্তানির পরিমাণ ১৫ হাজার টন ছাড়িয়ে যাবে। সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে রপ্তানি পণ্য রাখার তেমন জায়গা নেই। প্রতিনিয়ত এখান দিয়ে পণ্য রপ্তানির হার বাড়ছে। সাথে সাথে সমস্যাও বাড়ছে। বৃষ্টিতে ভিজে পণ্য নষ্ট হচ্ছে হরহামেশাই। এছাড়া পণ্য চুরির ঘটনাও বাড়ছে। একজন উদ্যোক্তা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিকেজি পণ্য রপ্তানি করতে খরচ পড়ে ২০ সেন্টের (১৬ টাকা) কাছাকাছি। আর এখন চাপ থাকায় আকাশপথে প্রতিকেজি পণ্য পাঠাতে খরচ হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন মার্কিন ডলারের (২৮০ টাকা) মতো। অনেকেই অর্ডার বাতিল হবার ভয়ে আকাশপথে নিজ খরচে পণ্য পাঠিয়ে দেন। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ ক্রেতা এবং রপ্তানিকারক উভয়েই নির্বাহ করেন।