নকশাতেই আটকে আছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৩, ২২:৪৮
মহাধূমধামে আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে করানো হয় ‘ গ্রাউন্ড ব্রেকিং ’। ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এতদিনে প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। আর যানবাহন চলাচলের জন্য এটি খুলে দেয়ার কথা ২০১৪ সালের মধ্যে। কিন্তু এসব যেন নিতান্তই কথার কথা। আনুষ্ঠানিক নির্মাণ শুরুর পর দুই বছর কেটে গেলেও প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি একেবারেই শূন্য। নকশা প্রণয়ন ও এলাইনমেন্ট চূড়ান্তকরণের নামে ইতিমধ্যেই খরচ হয়ে গেছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। যদিও নকশা এবং এলাইনমেন্ট গতকাল পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে কেবল চিঠি চালাচালি চলছে। এ অবস্থায় কবে নাগাদ প্রকল্পটির বাস্তব কার্যক্রম শুরু করা যাবে, তা যেন কারোরই জানা নেই। বহুল আলোচিত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের এই হলো বর্তমান চিত্র। এদিকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের এলাইনমেন্ট ও নকশা এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় নির্মাণাধীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের সঙ্গে এটির সমন্বয় সাধনের বিষয়টি নিয়েও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে দফায় দফায় বৈঠক হলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। উল্টো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তরফ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে যে বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের জন্য সরকারের প্রণীত দীর্ঘমেয়াদী পরিবহন মাষ্টারপ্ল্যান (এসিটিপি) এর সঙ্গে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রস্তাবিত রুটের যথেষ্ট অমিল রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয়বহুল ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প শেষ পর্যন্ত আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর ক্রমবর্ধমান যানজট সমস্যা মোকাবেলায় একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (ওড়াল সড়ক) নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয় ২০০২ সালের শেষদিকে। এ নিয়ে সে সময় প্রয়োজনীয় সমীক্ষা এবং অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও সম্পন্ন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে থাইল্যান্ডের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার ইচ্ছা অনুযায়ী ইটাল-থাই পাবলিক লি: কোম্পানি নামের একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই সমীক্ষা পরিচালনা করে। কিন্তু তত্কালীন সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ঘটেনি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি নতুন করে আলোর মুখ দেখে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের প্রেক্ষিতে সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ইটাল-থাই পাবলিক লি: কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় সরকারের সেতু বিভাগ। এতে প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৮ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় হবে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সবমিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া নির্মাণ কাজে সরকার ভিজিএফ (ভ্যায়বিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং) বাবদ ব্যয় করবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে এত টাকা ব্যয় করলেও প্রথম ২৫ বছর সরকার এই অবকাঠামো থেকে কোনো রাজস্ব পাবে না। এর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন থেকে আদায়কৃত টোলের পুরো টাকাই একটানা ২৫ বছর ধরে নেবে নির্মাণকারী ইটাল-থাই পাবলিক লি: কোম্পানি। নতুন কোনো জটিলতার উদ্ভব না হলে ২৫ বছর পর তারা এটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে। অথচ সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগে বাস্তবায়নাধীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার প্রকল্পে সরকার কোনো টাকা খরচ না করেই একই সুবিধা পাবে। অর্থাত্ ২৫ বছর পর ফ্লাইওভারটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইত্তেফাক’কে বলেন, ‘গ্রাউন্ড ব্রেকিং’ এর অর্থ হলো কোনো বৃহত্ অবকাঠামো প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজের শুভ সূচনা। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে এটা করানো হয়েছে। এরপর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির অগ্রগতি কার্যত শূন্য। কারণ, প্রকল্পের প্রাথমিক দু’টি কাজ অবকাঠামোগত নকশা এবং এলাইনমেন্টই এখনো চূড়ান্ত করা যায়নি। এ নিয়ে চলছে চিঠি চালাচালি। এ কারণে মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজও বিলম্বিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল পরিকল্পনায় যথেষ্ট গলদ রয়েছে। এই পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় ঢাকা নগরী সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া হয়নি। আর সে কারণেই এখন নিত্য-নতুন জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়ন করা যাবে কিনা তা নিয়ে তার সংশয় রয়েছে বলে তিনি জানান। এ পরিস্থিতিতে গত ২১ মার্চ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালককে লেখা এক চিঠিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, দফায় দফায় তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের নকশা ও এলাইনমেন্ট পরিকল্পনা কিংবা সুনির্দিষ্ট সমন্বয় প্রস্তাব এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সে কারণে দু’টি প্রকল্প মধ্যে সমন্বয় সাধন বিলম্বিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালক মো. আশিকুর রহমান বলেন, সেতু বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী আমরা ফ্লাইওভার প্রকল্পের অটোক্যাড ড্রয়িংসহ প্রয়োজনীয় সকল নকশা ও এলাইনমেন্ট পরিকল্পনাসহ সবকিছুই সরবরাহ করেছি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অটোক্যাড ড্রয়িং, অবকাঠামো নকশা, এলাইনমেন্ট পরিকল্পনা ও সুনির্দিষ্ট সমন্বয় প্রস্তাবের কিছুই পাওয়া যায়নি। এগুলো না পাওয়া পর্যন্ত দুই প্রকল্পের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে ঢাকা এলিভেডেট এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক কবির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, প্রকল্পের কাজ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে এটা ঠিক। তবে দ্রুত কাজ শুরুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হবে মূলত রেললাইনের ওপর দিয়ে। এ কারণে প্রকল্পের র্যাম্পসমূহ তৈরির জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো স্থানে জমি পাওয়া গেলেও সেখানে বড় বড় অবকাঠামো থাকার কারণে ক্ষতিপূরণসহ সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে প্রকল্পের প্রাথমিক নকশা ও এলাইনমেন্ট পরিবর্তনের প্রয়োজন হচ্ছে। আর সে জন্যই যত বিলম্ব। অবশ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব জটিলতা নিরসনের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।