প্র জ ন্মে র আ ই ক ন

সাংগঠনিক নৈপুণ্যে একজন

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৩, ১৮:০০
তিনি একজন প্রকৌশলী এবং ব্যবস্থাপক। দেশের শীর্ষস্থানীয় সিরামিক পণ্য নির্মাতা শাইনপুকুরের চিফ অপারেটিং অফিসার তিনি। দেশসেরা মেধাবীদের পীঠস্থান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িেকৗশলে স্নাতক, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করেই দেশের কর্পোরেট জগতে প্রবেশ তার। দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা আর বিনয় তাকে নিয়ে এসেছে দেশের প্রথম সারির কর্পোরেটদের কাতারে। দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে, তারপরই শাইনপুকুরের মাধ্যমে সিরামিক জগতে আসা। পথচলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সুনামের সাথে কাজ করে এসেছেন রিজভী উল কবির। বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের নানাবিধ বিষয় আর নিজের অগ্রযাত্রা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি প্রজন্ম-এর সাথে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। সেই শহর ছেড়ে আসতে হবে ছেলেটাকে। কঠোর প্রতিযোগিতায় যে সুযোগ করে নিয়েছেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে। ভাই-বোন আর বরিশাল জিলা স্কুলের সব বন্ধুদের রেখে চলে এলেন তিনি ক্যাডেটের চার দেয়ালের ভেতর। কিন্তু বাঁধাধরা নিয়মকানুনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর এই জীবন ছেড়েই আর আসতে ইচ্ছে হয়নি। সেই ক্যাডেট রিজভীর শখ ছিল ইঞ্জিনিয়ার হবেন। সেই মাফিক প্রস্তুতিও নিয়েছেন। ভর্তির সুযোগ পান বুয়েটে, তারপর সেই উচ্ছল দিনগুলো পার করে এলেন কর্পোরেট জগতে। যখন যেমন পরিবেশ, সেটার সাথেই মানিয়ে নিয়ে সফল এক অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি আজ। শুনছিলেন শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার রিজভী উল কবিরের বর্ণিল শৈশবের কথা। তাদের সময়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া মানেই বিদেশ চলে যাওয়ার ধুম। রিজভীকে সেই মোহ গ্রাস করতে পারেনি, চেয়েছিলেন দেশেই থাকবেন, এখানেই কিছু করবেন। সময়টা নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে, বুয়েটের ডিগ্রি তার সাথে। লোভনীয় অনেক চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইবিএতে এমবিএ করে ফেললেন। মার্কেটিংয়ে এমবিএ করার পেছনে কারণ কী ছিল একজন প্রকৌশলীর? রিজভী বলেন, ‘যেহেতু তিনি কোনো ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন, তাই মনে হয়েছিল এমবিএর বিষয়গুলো তাকে সাংগঠনিকভাবে অনেক দক্ষ করে তুলবে। তার ভাবনাটা ভুল ছিল না। কাজ করতে এসে সেটা তিনি যথার্থই অনুধাবন করেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতেই বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বৃহত্ পরিসরে কাজ করার সুযোগ হয় তার। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান পাপনের সাহচর্যে অনেক বিষয় শিখতে পেরেছেন হাতে কলমে। তার অনুপ্রেরণাতেই এখানে থেকে গেলেন, ফার্মাসিউটিক্যালকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকল রিজভীর ক্যারিয়ার। এক্সপোর্ট ম্যানেজার, ন্যাশনাল সেলস ম্যানেজার, সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার, হেড অব ইনফিউশন বিজনেস, হেড অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস—এ রকম গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন রিজভী। ব্যবস্থাপনা তাকে যেখানেই নিয়োজিত করেছে, দক্ষতার সাথে, নিজের বুদ্ধিমত্তায় সর্বোচ্চটুকু ঢেলে দিতে চেয়েছেন তিনি সেখানে। আর এই কাজটা তিনি একাই করেননি, বন্ধুবত্সল একটা দল রয়েছে রিজভীর। তাদের সাথে নিয়েই এগিয়ে গিয়েছেন একেক ধাপ। তিনি মনে করেন, কাজ করার পরিবেশটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও তেমন একটা পরিবেশ পেয়েছিলেন, চেয়েছেন সে রকম একটা পরিবেশ তার সহকর্মীদের দিতে। দীর্ঘদিন ফার্মাসিউটিক্যালসে থাকার পর জেনারেল ম্যানেজার পদে আসীন হয়েছিলেন তিনি। ঠিক সে সময়ে শাইনপুকুর সিরামিকসের দায়িত্ব বর্তায় তার উপর। সময়টা ২০০৯ সাল। বৈশ্বিক মন্দার কারণে আন্তর্জাতিক মার্কেট তখন প্রতিকূলে। এ সময় কীভাবে শাইনপুকুরকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন তিনি? শুনতে চেয়েছিলাম সেই গল্পটা। রিজভী জানালেন, প্রথমেই তিনি বাইরের কোন দেশগুলোতে মার্কেটিংয়ের সুযোগ রয়েছে সেইমাফিক একটা ছক তৈরি করেন, সফর করেন বিভিন্ন দেশে। পণ্যের মান তো বটেই, নিজের সাংগঠনিক গুণাবলির জোরেই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সিরামিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মত করে শাইনপুকুরের বাজার সৃষ্টি করেন। নতুন উদ্যমে শাইনপুকুর এগিয়ে যেতে থাকে, ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় অর্ধশত দেশে পৌঁছে যেতে থাকে তাদের তৈরি পণ্য। তারপরই নিজের অফিসটা গুছিয়ে নেন রিজভী—চাইলেন কাজের এমন এক পরিবেশ যেখানে সবাই সবার ভাবনাটা বিনিময় করার সুযোগ পাবে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তার মতো করে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অহেতুক চাপ প্রয়োগ করে কোনো কাজ হয় না। একজন যখন নিজের মনে করে কাজটা করবে, সেটা কিন্তু নিজের জন্যই নয় কেবল, প্রতিষ্ঠানের জন্যও বড় একটা পাওয়া। ঠিক এভাবেই রিজভী উল কবির যখন শাইনপুকুরকে আপন মমতায় গুছিয়ে নিয়েছেন, তখনি দেশের সিরামিক শিল্প পড়ে দারুণ এক সংকটে। গ্যাস আর বিদ্যুত্ সংকটে হুমকির মুখে পড়ে দেশীয় অনেক শিল্প। বছর দুয়েক আগে সেই সময় রিজভী মনোবল না হারিয়ে নিয়মিত ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে, সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে সীমিত জ্বালানিতেই কীভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করেন। রিজভীর দক্ষ পরিচালনাতেই দুর্যোগময় সেই সময়েও শাইনপুকুরের উত্পাদন ব্যাহত হয়নি। এমনকি শাইনপুকুরের প্রতিটি কর্মী তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য অক্লান্ত কাজ করে যাচ্ছেন। তাদেরও সুযোগ-সুবিধার কমতি রাখেননি তিনি। শুধুই উত্পাদন কেন, নজর দেওয়া দরকার যারা পেছনের কারিগর তাদের দিকেও। কেননা সিরামিক শিল্পে শুধুই অটোমেশন নয়, শৈল্পিক দক্ষতারও দরকার রয়েছে কর্মীদের। যাদের হাতে তৈরি পণ্য দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় ব্যবহার হয়, স্মারক হিসেবে থাকে অলিম্পিকের মতো আয়োজনে, কেন তাদেরকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হবে না? এমনই চিন্তাভাবনা কর্মীদের নিয়ে তার। রিজভী উল কবির পাঠকদের জন্য শাইনপুকুর সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু তথ্য জানালেন, ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে গুণগত মান, নজরকাড়া ডিজাইন এবং বিচিত্র পণ্যের সমাহারের কারণে শাইনপুকুর সিরামিক্স টেবিলওয়্যার মার্কেটে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। এই সিরামিক্স বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে। সিরামিক্স রপ্তানির মোট জাতীয় আয়ের ৫৫ শতাংশেরও বেশি শাইনপুকুরের অবদান। এর স্বীকৃতিস্বরূপ শাইনপুকুর সিরামিক্স ৪ বার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি অর্জন করেছে। এ ছাড়াও শাইনপুকুর দেশের প্রথম এবং একমাত্র টেবিলওয়্যার কোম্পানি হিসেবে ‘সুপারব্র্যান্ড’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে। রিজভী আরও বলেন, ‘বর্তমানে এ দেশে উত্পাদিত সিরামিক পণ্য বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদিশিক মুদ্রা রফতানি আয়ে যোগ হচ্ছে। সিরামিকের রফতানি বাজারের ধারণা এ দেশে নতুন নয়। ১৯৫৮ সালে এ দেশে সিরামিকের রফতানি বাজার সৃষ্টি হয়। কিন্তু কোয়ালিটিসম্পন্ন সিরামিক পণ্য উত্পাদন ইতিহাস বেশিদিনের নয়। যার জন্য প্রথমদিকে এ দেশের সিরামিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রচুর সিরামিক পণ্য আমদানি করা হতো এবং এর বিপরীতে রফতানি ছিল খুবই নগণ্য। এ জন্যই পূর্বে আমদানি-রফতানির মধ্যে একটা বিস্তর ফারাক লক্ষণীয় ছিল। কিন্তু এখন আর সেই দুঃসময় নেই। এখন শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়। বর্তমানে এ দেশ থেকে ৪৮টিরও অধিক দেশে সিরামিক পণ্য রফতানি হয়ে থাকে। যার মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, পোল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া, তুরস্ক, রাশিয়া, স্পেন, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্য অন্যতম। সিরামিক পণ্যগুলো তার নিজ সৌন্দর্য এবং ব্যবহারগুণে ভোক্তাদের অধিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে। এর শৈল্পিক নজরকাড়া নকশা সবার কাছেই প্রিয়। এই শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে এর চকচকে রূপ আরও উজ্জ্বল হবে বলেই আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যা জিডিপিতে যোগ করবে কোটি কোটি ডলার এবং বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ০.১৭ শতাংশ থেকে উন্নীত হবে কমপক্ষে ২০ শতাংশে। তাই সংশ্লিষ্ট সব মহল এবং দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে সিরামিক শিল্পে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান জরুরি। দেশ-বিদেশের সিরামিক বিষয়ক বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে রিজভী অনেক সময়ই এই কথাগুলো বলেন। তার হাত ধরেই এ দেশের সিরামিক শিল্প অনেক দূর এগিয়ে যাবে এই বিশ্বাস আমাদের। নতুন প্রজন্মের উপর রিজভীর অনেক আস্থা। তিনি মনে করেন, নতুনরাই তো ভবিষ্যত্, যে সময়ের কথাই বলা হোক, তরুণরাই এগিয়ে এসেছে সর্বাগ্রে। অগ্রজরা হয়তো তরুণদের বুঝতে একটু সময় নেবে। সেটাকে নেতিবাচক করে দেখার কিছু নেই। পারিবারিক জীবনও রিজভীর অনেক আনন্দে কেটে যাচ্ছে এই রাজধানীতে। বাবা গোলাম মাওলা বরিশালের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী, মা জাহানারা মাওলা। স্ত্রী কাজী তানিয়া আহমেদ, দুই কন্যা আর পুত্র শেনীন আর শামীলকে নিয়েই কাটে তার অবসর। প্রতিভাবান এই প্রজন্ম ২০১০ সালে ফাইন্যান্সিয়াল মিরর বিজনেস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। একই বছর তার নেতৃত্বে শাইনপুকুর অর্জন করে সুপারব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড। এই নিয়েই তো চলে যাচ্ছে তার দিন, সেটা সম্ভাবনার পথেই।