আমাদের দেশের মানুষের কাছে অটিজম এখনো সেভাবে পরিচিত না। কোন শিশু অটিজমে আক্রান্ত হলে তার দেখভাল, চিকিত্সা, মানসিক বিকাশ এবং পড়াশুনা ও দৈনিক জীবনাচরণ স্বাভাবিক শিশুদের থেকে কিছুটা আলাদা। আর তাদের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা বন্ধুপ্রতিম না। আগামী ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম দিবসকে সামনে রেখে একজন মা এবং অটিজম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে কাজ করেন এমনই একজন মারুফা হোসেন লিখেছেন এই প্রতিবেদন—
তিন বছরের ফুটফুটে সুন্দর শিশুকে নিয়ে বাবা-মা ঢুকলেন আমার অফিস চেম্বারে। নতুন কোন শিশু আসলে আমার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আমি ফিরে যাই সেই ১৪ বছর আগের দিনগুলোতে যখন ঠিক একইভাবে আমরা অনেক কাগজপত্রসহ আমাদের মেয়েকে নিয়ে কোন ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকতাম কিছু আশার বাণী শোনার আশায়। কেউ কেউ আছেন, নিজে থেকেই অনেক কিছু বলা শুরু করেন। আবার অনেকেই হতবিহ্বল হয়ে বসে থাকেন কিভাবে শুরু করবেন এই ভেবে। আমার ভিতরে সব সময় দুটো সত্তা কাজ করে— প্রথমত আমি একজন মা। দ্বিতীয়ত আমি একজন প্রফেশনাল। আমি টেবিলের দুই প্রান্তে বসে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বা করছি। আমি জানি চেয়ারের (প্রফেশনাল) এ প্রান্তে বসে কথা বলাটা অনেক সহজ কিন্তু মা হয়ে সে কথাগুলো শোনা, বোঝা অনেক অনেক বেশি কষ্টদায়ক। আর এই কারণেই আমার প্রথম চেষ্টাই থাকে ঐ বাবা মাদের সাবলীল হতে সাহায্য করা, যাদের সন্তান মাত্রই ‘অটিজম’ নামক ব্যাপক একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এসেছেন।
মা-বাবা যখন জানতে পারেন তার সন্তান অটিজমে আক্রান্ত তখন তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কী করবেন, কোথায় যাবেন, কোন ওষুধ খাওয়াবেন নানা চিন্তায় পড়তে হয়। অটিজম শনাক্ত হওয়ার পর শুরুতে অবহেলা করেন অনেকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করে থাকেন ‘অটিজম’ হয়নি শুধুমাত্র এ কথাটি শোনার প্রত্যাশায়।
সংসার জীবনের শুরুতে শিশুকে নিয়ে বাবা মায়েদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষায় বাধা পড়ে। অনেক সময়ই দুঃখ আচ্ছন্ন করে ফেলে তাদের স্বাভাবিক কাজ কর্মকে। এর ফলে অনেক সময় দুঃখ, কষ্ট এমন পর্যায়ে যায় যা হতাশা পর্যন্ত গড়ায়। দুঃখ এবং হতাশার মধ্যে পার্থক্য আছে। দুঃখ আমরা পেতেই পারি কিন্তু সেটাকে হতাশা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। কারণ একটি বিশেষ শিশুকে তার সীমাবদ্ধতাকে উতরিয়ে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে একজন মায়ের অবশ্যই শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে শক্ত সামর্থ্য হতে হবে। এমনও লক্ষ্য করা যায় বাবা-মা সন্তানের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিতে সময় নেয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে তা রাগের মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রাগ প্রত্যেকের জীবনেরই সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় শিশু অটিজম বা অন্য কোন প্রতিবন্ধিতার শিকার হলে দুঃখের প্রকাশ ঘটে রাগের মাধ্যমে। আর এই রাগ সব সময়ই হয়ে তাকে সব চাইতে নিজের কোন মানুষ যেমন স্বামী, স্ত্রী, মা, বোন, অন্য ছেলে মেয়ে বা হতে পারে সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর উপর। এই রাগের বহিঃপ্রকাশে দেখা যায় কাউকে মারতে, সামান্য কথায় রেগে যেতে, উত্তেজিত হতে, চিত্কার চেঁচামেচি করতে। তবে পরিবারের অন্যদের বুঝে নিতে বা সহ্য করে নিতে হবে। এটি একটি সাময়িক অবস্থা তাকে তার অস্থিতিশীল, দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত মনকে শান্ত রাখার জন্য সবাইকে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
অনেক সময় লক্ষ্য করা যায় এই সকল শিশুদের পিতা-মাতা শিশুর এই ডায়াগনোসিসকে শুরুতে অগ্রাহ্য করতে চান। এমন বিশ্বাস করতে চান যে তার শিশুর কিছুই হয়নি। অনেক সময় লক্ষ্য করা যায় যারাই তাদের সন্তানের সমস্যার কথা বলছেন তাদেরকে বাবা-মায়েরা উপেক্ষা করছেন। এমনও দেখা যায় ডাক্তার, থেরাপিস্ট, শিক্ষক যা কিছু বলছেন তা তারা শুনেছেন কিন্তু সেটা তাদের জন্য খুবই কঠিন কোন বিষয়। যার কারণে তারা মেনে নিতে চান না যে অন্যরা তাকে কোন সাহায্য করতে চায়। তবে যখন মন শান্ত হয় তখন অবশ্যই চিন্তা করতে হবে যে তাদের আপনজনেরা কেউই তার খারাপ চান না। তাকে সাহায্যের জন্য তারা চেষ্টা করছেন এবং এই সুযোগটুকু হেলায় নষ্ট না করে এবং তার সন্তানের জীবন থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট না করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আবার অনেক সময় দেখা যায় এই রকম পরিস্থিতিতে নিজেকে একা মনে হয়। বাবা মা একাকীত্বে ভোগেন। এ সময় মনে হয় তাদের দুঃখ-কষ্ট অন্যরা কেউ অনুভব করতে পারে না যেহেতু অন্যদের সন্তান স্বাভাবিক। এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখন তথ্য প্রযুক্তির সময় মানুষের হাতের মুঠোয় অনেক কিছু চলে এসেছে। একটু সচেতন হলেই বোঝা যাবে এই পৃথিবীতে কেউ একা নন। অনেক পরিবারেই এমন শিশু আছে যাদের নিয়ে একটি সুষুম সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়া যায়।
সবশেষে সবচাইতে মূল্যবান যে বিষয় আমি লিখবো তা হলো গ্রহণ করার ক্ষমতা। প্রথমেই মনে রাখতে হবে এটা আমার সন্তান। তার সঙ্গে যাই থাকুক না কেন তাকে আমার মেনে নিতে হবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে আমার শিশু, আমার সন্তান। তারপর ভাবতে হবে আমার সন্তানই অটিজমে আক্রান্ত। অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায় একটি পরিবারে অটিজম আক্রান্ত শিশুকে তারা এই প্রথম দেখলেন বা জানলেন সেই ক্ষেত্রে প্রত্যেকের চাওয়া পাওয়া, বোঝা না বোঝার মাত্রা বিভিন্ন হবে। সেই ক্ষেত্রে বাবা-মাসহ প্রত্যেককেই ধৈর্যধারণ করতে হবে। অটিজম সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। শিশুর সবলতা, দুর্বলতা, ভাল লাগা, মন্দ লাগা বিষয়গুলোর উপর খুবই সচেতন ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিশুর সবল দিকগুলো নিয়ে প্রশংসা করতে হবে। পরিবারের একজন মূল্যবান সদস্য হিসাবে তাকে মূল্যায়িত করতে হবে। শিশুকে না বদলিয়ে বদলাতে হবে আমাদের নিজেদেরকে। অনেক সময় মনে হতে পারে শিশুর অটিজমের কারণে তাদের জীবনের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সংসার জীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে তখনই নিজেকে অসহায় লাগতে পারে। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের উন্নতি করার লক্ষ্যে শনাক্তকরণ হওয়ার সাথে সাথে একটি কাঠামোগত ব্যবস্থাপনার আওতায় যত দ্রুত সম্ভব আনা প্রয়োজন। প্রতিটি অটিজম আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের প্রতিভা ও সীমাবদ্ধতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে একটি যথোপযোগী ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে পারলে এই শিশুরা উপকৃত হবে। অটিজমের কোন যাদুকারী চিকিত্সা নেই। সঠিক প্রশিক্ষণ, অকুপেশনাল থেরাপী, স্পীচ থেরাপী, সাইকোলজিষ্ট অটিজম আক্রান্ত শিশুদের সামগ্রিক উন্নতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ও স্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে একটি বিশেষ শিক্ষালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মারুফা হোসেন
পরিচালক, স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন
