হাসপাতালে সেদিন অন্যরকম দৃশ্যের উপস্থিতি। ফুটফুটে একটি কন্যা শিশু এসেছে মায়ের কোলে। নতুন বাবা-মার বুকে সন্তানের জন্য স্নেহ ভালোবাসার কোন কমতি নেই। কিন্তু বাধ সেধেছে চোখের দৃষ্টি। অন্ধ বাবা-মা তাদের মিষ্টি সন্তানের মুখটা দেখে চোখ জুড়াতে পারছে না। আমি যার কথা বলছি তার নাম জয়নাবুন্নেছা রীনা। জন্মান্ধ রীনার বরিশালের হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম। বাবা গ্রাম্য মসজিদের একজন মুয়াজ্জিন। তার ৪ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে ৩ জনই জন্মান্ধ। কিন্তু এই অন্ধত্ব দমিয়ে রাখতে পারেনি তাদেরকে। আঁধার জীবনকে আলোয় আলোকিত করতে ভর্তি হয় বরিশাল সরকারি অন্ধ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশুনার মাধ্যমে সম্পন্ন করে এসএসসি এবং বরিশাল সরকারি হাতেম মিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে।
রীনা বর্তমানে পড়াশুনা করছে সরকারি বেগম বদরুন্নেছা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। অন্ধ জীবনের পথচলায় হাত ধরে জীবনসঙ্গী হতে এগিয়ে আসে আরেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মিজানুর রহমান। অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ না করলেও ১৫- ১৬ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষার সময় চোখে মারাত্মক অসুখে আক্রান্ত হন তিনি। দরিদ্র পরিবারের সর্বস্ব দিয়ে চিকিত্সার চেষ্টা করা হয় একমাত্র আশা এই মেধাবী ছেলেটির চোখ ভাল করার জন্য। শেষ পর্যন্ত ভারতের বিখ্যাত চক্ষু হাসপাতাল শংকর নেত্রানালয়ে চিকিত্সা শেষে জানা যায় বাংলাদেশের চিকিত্সকদের ভুল চিকিত্সার দরুন চোখের অপটিক নার্ভ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে, চিরতরে তার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।
পরে মিজান ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশুনার মাধ্যমে সম্পন্ন করে এসএসসি এবং বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ থেকে এইচএসসি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পাস করেছেন সরকারি বাংলা কলেজ থেকে। বর্তমানে একের পর এক চেষ্টা করে যাচ্ছেন একটি চাকরি পাওয়ার জন্য। মিজান জানান, বর্তমান সরকারের সময় ৩৫জন প্রতিবন্ধীর শিক্ষকতার চাকরি হয়েছে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি করছে ১০জন প্রতিবন্ধী। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীরা কাজ করছে।
দৃষ্টিহীন এ দম্পতি জীবনের সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্ধত্বের দোহাই দিয়ে থেমে যায়নি। মিরপুরের ১ নং সেকশনের নিউ সি ব্লকে ৪ নং রোডে ছোট্ট একটি বাসায় সংসার পেতেছে তারা। প্রাইম ব্যাংক ফাউন্ডেশন এবং সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর থেকে দু’জনের সামান্য কিছু উপবৃত্তির টাকায় কষ্টে-সৃষ্টে বাড়ি ভাড়াটা হয়ে যায়। এরপর টানাপড়েনে চলে তাদের সংসারের বাকি সব খরচ। তারা কারো কাছে ভিক্ষা চায় না। শুধু তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পেলেই কৃতজ্ঞ। তাদের এখন একটাই আশা, কাজ করে তাদের মেয়ে মানহাকে সুন্দরভাবে বড় করা। রীনা-মিজানের দু’চোখ ভরা স্বপ্ন তাদের মেয়ে মানহাকে পড়াশুনা করিয়ে মানুষের মত মানুষ করা। যদি হূদয়বান ব্যক্তিরা এগিয়ে আসেন তবে তাদের এই পথচলা সহজতর হবে। হাজারো প্রতিকূলতাকে পাড়ি দিয়ে এতোদূর তারা এসেছে। এখন আমাদের সময় এসেছে তাদের দিকে মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার। আমাদের সবার বিন্দু-বিন্দু সাহায্য যদি ওদের অন্ধ জীবনের চলার পথটাকে আরেকটু মসৃণ করে দেয় তাহলে এটাই হবে মানুষ হিসাবে আমাদের সার্থকতা।
