সামপ্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় শেয়ারবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ২০১০-এ ধসের পর গত কয়েক মাস আগেও শেয়ার দর কিছুটা সহনশীলভাবে ওঠানামা হচ্ছিল। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার তীব্রতায় বর্তমানে বাজারে টানা দরপতনের পাশাপাশি লেনদেন হচ্ছে মাত্র দেড়শ থেকে দুইশ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট তথ্যে দেখা গেছে, দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক গতকাল সোমবার গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দরপতনের সাথে সাথে লেনদেনও ব্যাপকভাবে কমেছে। ১৫ কার্যদিবস ধরে ডিএসইতে লেনদেন হচ্ছে দুইশ কোটি টাকার নিচে। গত জানুয়ারি মাসেও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে টানা ১৮ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে দুইশ কোটি টাকার কম। ২০০৭ সালের পর এ ধরনের নজির আর দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনিতেই বাজারে আস্থা ও তারল্যের সঙ্কটে দীর্ঘদিন ধরে দরপতন হচ্ছে। তার ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট তীব্র হয়ে ওঠেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ধরে রাখার ভরসা পাচ্ছেন না। যা বাজারকে তলানিতে নিয়ে এসেছে। শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমাদের তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানিরই আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতার কারণে কোম্পানিগুলো এ ধরনের প্রবণতা থেকে বেরও হচ্ছে না। যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা এ সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়ে কঠোর হতে হবে।
এদিকে শেয়ারবাজারে বড় দরপতনের প্রতিবাদে গতকাল ডিএসই’র সামনে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করেছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বাজারে তারল্য বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে বিক্ষোভকারীরা বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে আসা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম নির্ধারণসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যর্থতায় বিএসইসির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। এ অবস্থায় বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। শেয়ারবাজার স্থিতিশীল না হলে বিনিয়োগকারীরা আত্মাহুতির হুমকি দেন।
ডিএসই’র তথ্যে দেখা গেছে, গতকাল ডিএসই’র ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) ১৩১ পয়েন্ট কমে ৩ হাজার ৪৫৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। আর সাধারণ মূল্যসূচক ১১১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬১০ পয়েন্টে। যা গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সূচক কমে যাওয়ার পাশাপাশি ডিএসই’র লেনদেনও কমে গেছে। ডিএসইতে গতকাল লেনদেন হয়েছে ১৩৮ কোটি ৪০ লাখ ৯৬ হাজার ৯০৫ টাকা। যা আগের দিনের চেয়ে ২৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা কম। লেনদেনকৃত ২৬৬ টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ১১ টির, কমেছে ২৩৯ টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৬ টি কোম্পানির শেয়ারের। এদিকে ডিএসই’র পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সূচকেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। সিএসই’র গতকাল সার্বিক মূল্যসূচক ৪২৩ পয়েন্ট কমে ১০ হাজার ৭৫৭ পয়েন্টে নেমে এসেছে। আর সিএসই-৩০ মূল্যসূচক কমেছে ৪১১ পয়েন্ট। এ দিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছে মোট ১৮ কোটি ২৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭৩৫ টাকা। লেনদেনকৃত ১৭৮ টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৪টির, কমেছে ১৭৩টির আর অপরিবর্তিত ছিল ১টি কোম্পানির শেয়ারের দর।
আইডিএলসি’র দৈনন্দিন বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গতকাল বাজারে দরপতনের শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাত। এ খাতের কোম্পানিগুলোর দরপতন হয়েছে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দর কমেছে ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর ব্যাংকিংখাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন হয়েছে ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশঙ্কার ফল হিসেবেই এ ধরনের পতন হচ্ছে। তাই বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
