ভাল নেই প্রবীণ হিতৈষী সংঘের বাসিন্দারা

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৫০
অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বয়স বাড়িয়ে সদস্য হওয়া, কার্যনির্বাহী কমিটির প্রভাবশালী সদস্যের অর্থ অপব্যবহার, প্রবীণদের সুবিধা হ্রাস করে ডেসকোকে বাড়ি ভাড়া দেয়া, প্রবীণদের টেলিভিশন দেখার কমনরুম তুলে দেয়াসহ নানা অনিয়মে অসহায় জীবনযাপন করছেন প্রবীণ হিতৈষী সংঘের বাসিন্দারা। অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করছেন কার্যনির্বাহী কমিটির কিছু সদস্য। তবে প্রভাবশালীদের সাথে পেরে উঠছেন না বলে জানিয়েছেন তারা। অনেক প্রবীণ সদস্য লিখিত প্রতিবাদ জানিয়ে কোন প্রতিকার না পেয়ে কমিটির সভাও বর্জন করেছেন বলে জানা গেছে। এসকল অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সভাপতি স্থপতি নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন ছোটখাট ভুল থাকলেও সকল অভিযোগ সত্য নয়। যেভাবে চলে এ প্রতিষ্ঠান: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজকল্যাণ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুদানসহ বিভিন্ন অনুদান ও নিজস্ব আয়ে চলছে আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান। ৫৫ বছরের অধিক বয়সের প্রবীণরা দুই হাজার টাকা দিয়ে এই সংঘের আজীবন সদস্য হতে পারেন। সদস্যদের ভোট ২ বছর অন্তর নির্বাচিত হয় কার্যনির্বাহী কমিটি। কমিটির মহাসচিব সকল প্রশাসনিকসহ সার্বিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের কোন আর্থিক সুবিধা নেয়ার বিধান নেই। যেদিন থেকে পথচলা: চিকিত্সক এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ অবসর গ্রহণের পর প্রবীণদের চিকিত্সা দানের সিদ্ধান্ত নেন। সেই উদ্দেশ্যে ধানমন্ডির নিজবাড়িতে প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সা দেয়া চালু করেন। বর্তমানে আগারগাঁওয়ে প্রধান শাখাসহ সারাদেশে ৫৪টি শাখা আছে। ১৯৮১ সালে গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৮৭৫ একর জমি এই প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। যার দলিল আজ অবধি করা হয়নি বলে জানান কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা। জমি বরাদ্দ দেয়ার সময় শর্ত থাকে এখানে কোন ভবন নির্মাণ করলে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে স্থাপত্য বিভাগ ও গণপূর্ত বিভাগ তা সম্পন্ন করবে। অভিযোগ ও অনিয়ম: বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নানা অভিযোগ আছে, তবে প্রবীণ অধিবাসী ও কার্যনির্বাহী সদস্যদের মূল অভিযোগ বরাদ্দের শর্ত না মেনে খালি জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ। এ সম্পর্কে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও প্রতিষ্ঠাতা ডা.এ কে এম আবদুল ওয়াহেদের মেয়ে তৈয়বা খাতুন বলেন, অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্য অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করছে বর্তমান কমিটির মহাসচিবসহ কয়েকজন সদস্য। আর নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে হাসপাতাল উন্নয়নে সরকারের দেয়া অনুদানের টাকা। উল্লেখ্য, সরকারে পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য বছরে ৭৫ লাখ টাকা দেয়া হয় বলেও জানা যায়। তিনি আরো বলেন, ২০১২ সালে গঠিত কমিটিকে তারা কয়েকজন প্রবীণ সদস্য এই নির্মাণ অবৈধ এবং তা বন্ধ করতে মৌখিক ও লিখিতভাবে বলেন। তারা তাদের অভিযোগ আমলে আনেননি। উপরন্তু তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। একই বিষয় কমিটির অন্য সদস্য এডভোকেট হাবিবুর রহমান বলেন, তারা জানতে পেরেছেন নতুন এই স্থাপনা মার্কেট হিসেবে ব্যবহূত হবে এবং দোকান ভাড়া দেয়া ও অগ্রিম ভাড়া নেয়াসহ অর্থ উপার্জন করে লাভবান হবেন গুটি কয়েক সদস্য। একই অভিমত প্রকাশ করে কার্যনির্বাহী কমিটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিষয়টি জানিয়ে তারা সমাজসেবা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি। বর্তমান মহাসচিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি না নিয়েই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এমনও অভিযোগ আছে। ২০০১ সাল থেকে তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধেও বয়স বাড়ানোর অভিযোগ আনেন তারা। প্রবীণদের অভিযোগ: প্রবীণরা বলেন তাদের সাথে প্রতিনিয়তই খারাপ ব্যবহার করা হয়। তাদের একটি কমনরুম ছিল। যেখানে তারা টিভি দেখতেন ও সংবাদপত্র পড়তেন। টিভিটি সরিয়ে নিয়ে তাদের কমনরুমটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। তাদের ন্যূনতম বিনোদন ও দেশ-বিদেশের খবরাখবর জানার সুযোগটিও তারা কেড়ে নিয়েছে। মাঝেমধ্যে সমাজের হূদয়বান ব্যক্তিবর্গ তাদের জন্য বিশেষ আহারের ব্যবস্থা করলে সেখানে তাদের হস্তক্ষেপ হয় এবং তারা পরিমাণ মত খাবার পান না। হাসপাতাল, চিকিত্সক থাকলেও এখানে প্রবীণদের নিয়মিত কোন স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা হেলথ চেকাপের ব্যবস্থা নেই। প্রায়ই কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিংয়ের দিনে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রবীণদের দুপুরের খাবার খেতে সন্ধ্যা গড়ায়। তাদের রুমের ভাড়া বাড়ানো, লিফট ছাড়া বিল্ডিং স্থানান্তরে বাধ্য করাসহ আরো অনেক অভিযোগ আছে প্রবীণদের। অথচ ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটিতে প্রবীণ রোগীর অভাবে বর্তমানে সব বয়সীদেরই চিকিত্সা হচ্ছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রবীণদের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ১০ টাকা, অন্যদের বেলায় ৩০ টাকা নির্ধারিত আছে। ইনস্টিটিউটের প্রবীণ নিবাসে নারী-পুরুষ মিলে ৪২ জন নিবাসী আছেন। ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলা পর্যন্ত ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডকে (ডেসকো) ভাড়া দেয়াতে নিবাসীরা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারছেন না। এদিকে কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, দুয়েক বার মিটিংয়ের জন্য তাদের খাবারের অসুবিধা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে্। টেলিভিশন সরানোর বিষটি তিনি জানেন না। তিনি এ সম্পর্কে ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সব জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের অনুদানের টাকায় প্রতিষ্ঠানটি চালানো কঠিন হয়ে পরেছে। তাই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে এই অর্থ ব্যয়ের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, অধ্যাপক এ এস আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিক নয়, তার দায়িত্ব পালন করার যথাযথ অনুমতিই তাদের কাছে আছে বলে তিনি জানান। এ এস এম আতিকুর রহমান বলেন, তার অস্থায়ীভাবে স্থাপনা নির্মাণ করছেন। এতে কারো অনুমতির প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে তার দায়িত্ব পালনে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, অভিযোগের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।