সহিংসতার টার্গেট এখন রেল

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৩, ২২:২৯
গত ২৭ মার্চ ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা জামালপুর কমিউটার ট্রেনের একটি বগিতে ৭/৮ জন দুর্বৃত্ত আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের একটি দল আগুন নেভানোর আগেই ট্রেনটির একটি বগি পুড়ে যায়। এই ঘটনায় ওই দিন রাতে তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, ময়মনসিংহে বগিতে আগুন দেয়ার ঘটনায় কর্তব্যে অবহেলার জন্য রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর হাবিলদার নৃপেন্দ্র চন্দ্র সাহা ও আনসার সদস্য সেলিম রেজাকে তাত্ক্ষণিক সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। এভাবে ট্রেন ও স্লিপারে আগুন দেয়া হচ্ছে, স্লিপার তুলে ফেলা হচ্ছে, খুলে ফেলা হচ্ছে ফিসপ্লেট- এসব ঘটনায় দু’এক হাবিলদার বা আনসার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেই দায়িত্ব শেষ করছে রেল বিভাগ। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে রেলকে রক্ষা করার ব্যাপারে এখনও তেমন কোন উদ্যোগ নেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবারও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের হরতাল শুরুর প্রাক্কালে নাশকতার কারণে কুমিল্লায় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথা। কুমিল্লা বিশ্বরোড পদুয়ারবাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে ফিসপ্লেট ও রেললাইন তুলে ফেলায় ট্রেনের ইঞ্জিন ও সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়। আহত হয় অর্ধশত । কুমিল্লা রেলস্টেশনের ঊর্ধ্বতন উপ সহকারী প্রকৌশলী হামিদুল হক বলেন, রাতের কোনো এক সময় লাইনের ফিসপ্লেট খুলে পাশের ধানক্ষেতে ফেলে দেয়া হয়। এ কারণেই ইঞ্জিনসহ সাতটি বগি লাইন থেকে বেরিয়ে উল্টে পাশের ধানক্ষেতে গিয়ে পড়ে। গতকালই বগুড়ায় করতোয়া রেল সেতুতে হরতাল সমর্থকরা আগুন ধরিয়ে দেয়। আর বগুড়া রেলস্টেশনে মাস্টারের কক্ষ ও টেলিযোগাযোগের যন্ত্রপাতিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। রেল কর্তৃপক্ষের এক হিসাবে দেখা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত শুধু রেলেই ৯৬টি নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক নাশকতার কারণে রেল মন্ত্রণালয় রেল পুলিশ ও নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে থানার পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের যুক্ত করার কথা বললেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল এবং দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল গঠিত। গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলে ৮৩টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৩টি নাশকতার ঘটনা ঘটে। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু মঙ্গলবারই ৭টি বগি ও ইঞ্জিন উল্টে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনে আগুনের ঘটনার পর ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেছিলেন, ‘বিএনপির উস্কানিতে জামায়াত-শিবির চক্র গত কিছু দিন ধরে সারাদেশে টেনে নাশকতা চালাচ্ছে। নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। এরপরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ সিল্কসিটি ট্রেনের বগি এবং বগুড়া স্টেশন ভবন ও বামনডাঙ্গা স্টেশন পুড়িয়ে দেয়া হয়। ১৯ মার্চ ভোরে কুলাউড়ায় রেললাইনের ফিসপ্লেট কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এতে ছয়টি কোচ ও ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সিলেটের নয় ঘণ্টা ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। একই দিন সকালে ফৌজদারহাট স্টেশন ভাঙচুর এবং রেললাইনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের ট্রেন যোগাযোগ দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে। ওই দিনই সকালে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়ায় এবং ব্রাহ্মবাড়িয়ায় রেললাইনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে ১৮ মার্চ নরসিংদীর বাদুয়ারচর এলাকায় রেলসেতুতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রেলওয়ে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক সোহরাব হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, দীর্ঘ রেল লাইনের প্রতিটি ইঞ্চি পাহারা দেয়া কঠিন। তারপরও রেল পুলিশের পক্ষ থেকে রেল লাইনের নিরাপত্তার সব ব্যবস্থাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবিরে কর্মীরাই এই আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার কথাও বলেন তিনি। খোদ রাজধানীতেই গত ৪ মার্চ কমলাপুর রেলস্টেশনে নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতে ট্রেনের একটি বগি পুড়ে যায়। আরেকটি বগি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড, ফেনী, লালমনিরহাট, সিলেট ও বামনডাঙায় রেল লাইনে আগুন দেয়া, ফিসপ্লেট ও স্লিপার খুলে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে। লাইনচ্যুত হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার মুখে পড়ে মহানগর গোধূলী এক্সপ্রেস। গত ৩ মার্চ হরতালের মধ্যে পার্বতীপুর-খুলনা রুটে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি এলাকায় গাছের গুঁড়ি ফেলে রেললাইন অবরোধ করে জামায়াত কর্মীরা। ওই দিনই তারা মিছিল নিয়ে বগুড়া রেলস্টেশনে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ ও শহরতলীর সাতগ্রাম এলাকায় রেল লাইন উপড়ে ফেললে ওই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে ২৮ ঘণ্টা।