আড়াই হাজার কিলোমিটারের বেশি রেলপথ ও রেলওয়ে স্থাপনার নিরাপত্তায় সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আদেশে সকল ডিসি ও এসপিকে দুই ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) কামাল উদ্দিন আহমেদের সই করা আদেশে রেলপথের নিরাপত্তায় জনগণকে সম্পৃক্ত করে যে কোনো নাশকতামূলক কাজের বিরুদ্ধে সজাগ করার জন্য ডিসি-এসপিকে বলা হয়েছে। আর রেল স্টেশনসহ রেলওয়ের যাবতীয় স্থাপনার নিরাপত্তায় আইন-শৃংখলা বাহিনী পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে কেন্দ ীয়ভাবে ও অঞ্চল ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ৯৬টি নাশকতার ঘটনায় রেলওয়ের সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ ১২ কোটি টাকা।
কামালউদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, দেশের ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার রেলপথের নিরাপত্তা শুধু ১৪০০ রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) দিয়ে সম্ভব নয়। এ জন্য পুলিশ ও জনগণকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, রেলওয়ে স্টেশন এবং যাত্রীর নিরাপত্তায় পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আর অঞ্চল ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার কথা বলা হয়েছে। যাতে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটা মাত্রই সাধারণ মানুষ তাত্ক্ষণিক খবর জানাতে পারে। এ জন্য জনগণকে সজাগ করার কথাও বলা হয়েছে। পুলিশকে দ্রুততার সঙ্গে খবরে সাড়া দিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়ের ক্ষতিসাধন সন্ত্রাসমূলক কাজ। এটির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে প্রথম গত ২৭ মার্চ দাঁড়িয়ে থাকা জামালপুর কমিউটার ট্রেনের একটি বগিতে ৭/৮ জন দুর্বৃত্ত আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ট্রেনটির একটি বগি আগুনে পুড়ে যায়। গত মঙ্গলবারও নাশকতার কারণে কুমিল্লায় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথা। কুমিল্লা বিশ্বরোড পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে রেল লাইনের ফিসপ্লেট তুলে ফেলায় ট্রেনের ইঞ্জিনসহ সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়। আহত হন অর্ধশত।
বগুড়ায় করতোয়া রেল সেতুতে হরতাল সমর্থকরা আগুন ধরিয়ে দেয়। আর বগুড়া রেলস্টেশনে মাস্টারের কক্ষ ও টেলিযোগাযোগের যন্ত্রপাতিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
রেল কর্তৃপক্ষের এক হিসাবে দেখা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত শুধু রেলেই ৯৬টি নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। একের পর এক নাশকতার কারণে রেল মন্ত্রণালয় রেল পুলিশ ও নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে থানার পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের যুক্ত করা হচ্ছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল এবং দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল গঠিত। গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলে ৮৩টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৩টি নাশকতার ঘটনা ঘটে। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু মঙ্গলবারই ৭টি বগি ও ইঞ্জিন লাইন থেকে ছিটকে পড়ায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর আগে অন্য ৯৫টি ঘটনায় ক্ষতি হয়েছে অন্তত ১০ কোটি টাকার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ সিল্কসিটি ট্রেনের বগি এবং বগুড়া স্টেশন ভবন ও বামনডাঙ্গা স্টেশন পুড়িয়ে দেয়া হয়। ১৯ মার্চ ভোরে কুলাউড়ায় রেললাইনের ফিসপ্লেট কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এতে ছয়টি কোচ ও ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সিলেটের নয় ঘণ্টা ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। একই দিন সকালে ফৌজদারহাট স্টেশন ভাঙচুর এবং রেললাইনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে। ওই দিনই সকালে মিরসরাইয়ের বড় তাকিয়ায় এবং ব্রাহ্মবাড়িয়ায় রেললাইনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে ১৮ মার্চ নরসিংদীর বাদুয়ারচর এলাকায় রেল সেতুতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
খোদ রাজধানীতেই গত ৪ মার্চ কমলাপুর রেলস্টেশনে নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতে ট্রেনের একটি বগি পুড়ে যায়। আরেকটি বগি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, ফেনী, লালমনিরহাট, সিলেট ও বামনডাঙ্গায় রেল লাইনে আগুন দেয়া, ফিসপ্লেট ও স্লিপার খুলে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে। লাইনচ্যুত হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার মুখে পড়ে মহানগর গোধূলী এক্সপ্রেস। গত ৩ মার্চ হরতালের মধ্যে পার্বতীপুর-খুলনা রুটে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি এলাকায় গাছের গুঁড়ি ফেলে রেললাইন অবরোধ করে জামায়াত কর্মীরা। ওই দিনই মিছিল নিয়ে বগুড়া রেলস্টেশনে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ ও শহরতলীর সাতগ্রাম এলাকায় রেল লাইন উপড়ে ফেললে ওই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে ২৮ ঘণ্টা।
