মূল ফিচার

অস্তিত্বে বাংলা

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৪০
তানিম :মাম্মা, গতকালের হ্যাং আউটটা কিন্তু হেব্বি জোস ছিল! আনিকা :আবার জিগায়! আবীর :ইয়াপ, পুরাই ফাটাফাটি! বিপুল :দূরে গিয়া মর তোরা! আমারে তো ডাকলি না। তানিম :ক্যান, কালকে যখন বললাম, তখন তো খুব পাট নিলি! বন্ধুদের আড্ডার খণ্ডিত এই চিত্রটি কাল্পনিক। তবে তরুণদের ভাষা আজকাল এমনটাই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আড্ডায় কি ফেসবুক চ্যাটিংয়ে নতুন ঘরানার এই শব্দগুলো তরুণদের মুখে মুখে ফিরছে। স্রোতের বিরুদ্ধে চলার চেষ্টা নেহায়েতই বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়, বরঞ্চ স্রোতের দিকে ধাবিত হয়ে স্রোতকে যথার্থ কাজে লাগানোর চেষ্টা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বলছিলাম আমাদের তারুণ্যের বর্তমান হাল সম্পর্কে। ‘স্মার্টনেস’ কিংবা আধুনিকতা যাই বলুন না কেন এর দোহাই দিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে চলছে ভাষার মধ্যে ইংরেজি শব্দ প্রবেশ করানোর প্রবণতা। আজ নিজেরাই নিজেদের কৃষ্টি, সংস্কৃত, ভাষাকে ভুলতে বসেছি। তাই বলে ইংরেজিকে এড়িয়ে চলতে হবে তা না। ইংরেজি শিক্ষার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে, কারণ বিশ্বের দরবারে লড়াইয়ের জন্য অন্যতম অস্ত্রই ইংরেজি এবং ইংরেজি না-জানার দলেরা পিছিয়ে পড়বে। তাই বলে বাংলার আসনে ইংরেজিকে বসিয়ে নয়, বাংলার আসনে বাংলাকে রেখেই ইংরেজি শিখতে হবে। এবং তা যথার্থ স্থানেই প্রয়োগ করতে হবে। বাংলা আমার মায়ের ভাষা অথচ মায়ের কোল থেকে নেমে কিছুদিন পরেই বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েই আধুনিকতার কৃত্রিম চাদরে নিজেদের আবৃত করছি। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। প্রতিটি দেশের মতোই আমাদেরও আছে নিজস্ব সংস্কৃতি। যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু সেই সংস্কৃতি আজ কোন পথে? কোনো স্থানের মানুষের আচার ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্য, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি ইত্যাদি যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে তাই সংস্কৃতি। এগুলোকে দু’ভাবে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ নিত্যদিনের জীবন যাপনের সাথে সম্পর্কিত আর দ্বিতীয় ভাগ জীবন উপভোগের ব্যবস্থা এবং উপকরণের সাথে সম্পর্কিত। মানুষের সার্বিক জীবনকে নিয়েই তো তার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। প্রত্যেক শিশুই সর্বপ্রথম তার সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয় পরিবার থেকে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সংস্কৃতি হুমকির মুখে। আমাদের সংস্কৃতি বিবর্তিত হয়ে কোন পথে এগোচ্ছে তা আলোচনার দাবি রাখে। বাংলা সংস্কৃতির চর্চা থেকে দিন দিনই দূরে সরে যাচ্ছে আমাদের বর্তমান তরুণরা। বাংলায় ভালো করে কথা বলে না। বাংলা উচ্চারণ জানে না। বাংলা গান শোনে না। তাদের পোশাক-আশাকেও এ দেশের সংস্কৃতির ছোঁয়া সেভাবে দেখা যায় না, যেভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ছায়া চোখে পড়ে। বাংলা সংস্কৃতিকে বিদায় জানিয়ে তারা ভিনদেশি সংস্কৃতি চর্চাতেই বেশি অভ্যস্ত। তরুণদের এই বিদেশি সংস্কৃতির বন্দনা একটু একটু করে বাঙালিয়ানা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। উত্সব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী কিন্তু উত্সবের দিনে মানুষ বৃহত্, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহত্, সেদিন সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহত্।’ আসছে পহেলা বৈশাখ, এইদিন পান্তা খাওয়ার জন্য পথে নামবে ফাস্ট ফুড জেনারেশন। চড়া দামে ইলিশ মাছের একটা ছোট টুকরো নিয়ে বাঙালি হওয়ার গর্ব করতে দেখা যায় অনেককেই। ওইদিন ফাস্ট ফুড কিংবা রেস্টুরেন্টগুলোর মেন্যুতে স্পেশাল আইটেম হিসেবে ঠাঁই পাবে পান্তা-ইলিশ। যেন পুরো একদিনের জন্য আমরা সবাই মনে-প্রাণে বাঙালি। যেন এই দিনটি বাঙালিয়ানার মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানোর দিন। বৈশাখ উদযাপনে প্রাণের এ সাড়া, হূদয়ের টানে ছুটে আসার লক্ষ্য যদি এ দেশ, এ মাটি ও এ বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির টানে না হয়ে শুধু একটি হুজুগের বিষয়ে পরিণত হয়, শুধু উত্সব উত্সব খেলা হয়, তবে তা বাংলা সংস্কৃতিকে ধরে রাখা ও তার বিকাশে কোনো অবদানই রাখতে পারবে না। মূলের দিকে ফেরা, নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করা মূল্যবোধগুলো চর্চায় এ উত্সবের কোনো ভূমিকাই থাকবে না। হয়তো বৈশাখ বরণের এ উত্সব আরও বৃহত্ হতে বৃহত্তর হয়ে উঠবে, ফ্যাশন হাউসগুলোয় ভিড় আরও হয়তো বাড়বে, পান্তা-ইলিশের হুজুগে ইলিশের দাম হয়তো আরও আকাশচুম্বী হবে, ব্যবসার আরও স্ফীতি ঘটবে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে বৈশাখ বরণ তা কখনোই পূর্ণতা পাবে না। কারণ বেলুন যতই ফাঁপানো হোক না কেন, তার ভেতরে শুধু বাতাস ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তাই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পাশ কাটিয়ে, মূলের বিকৃতি ঘটিয়ে বৈশাখ নিয়ে যতই মাতামাতি হোক না কেন, তাতে প্রকৃত কোনো মঙ্গল আসবে না। বাংলা সংস্কৃতির উন্নতি চাইলে, নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরতে হলে সেভাবেই বাংলাকে সাজাতে হবে, আত্মস্থ করতে হবে এবং সেভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছে তা উপস্থাপন করতে হবে। বিকৃত বা খণ্ডিত উপস্থাপন তাদের শুধু ভুল আর বিকৃত বিষয়ই শেখাবে, মূল জিনিসের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। হাজারও মানুষের এ মিলনমেলাকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। এখান থেকেই বীজ বপন করতে হবে। বৈশাখ বরণের এ আয়োজন, এ প্রাণের মেলাকে তাই আমরা স্বাগত জানাই, তবে এর মধ্যে কিছু সারবত্তা থাকতে হবে, তাতে প্রকৃত প্রাণের স্পন্দন মেলাতে হবে তবেই এ প্রাণের মেলা, জনতার এই ঢল আর এ উত্সব শুভ-সুন্দর ও কল্যাণময় হয়ে উঠবে। মডেল সায়মন ও রিয়া