রাত জেগে হরতালে সোচ্চার প্রগতিশীল ২৩ সংগঠন

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০৮
রাত জেগে হরতালে সোচ্চার ছিলেন সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় মশাল জ্বালিয়ে মিছিলের মধ্য দিয়ে যে হরতাল শুরু হয় তা আজ শনিবারও অব্যাহতভাবে চলবে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রেসক্লাবের সামনে যে অবস্থান নিয়েছিলেন হরতালকারীরা সেই অবস্থান থেকে সরে আসেননি তারা। হেফাজতে ইসলামের ঢাকামুখী লংমার্চের প্রতিবাদে এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সারাদেশে হরতালের ডাক দেয় দেশের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল ২৩টি সংগঠন। শুধু ঢাকাতেই নয় হরতাল শুরু হওয়ার পর থেকেই সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় হরতালের সমর্থনে সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের কর্মীরা মিছিল বের করে। বিভিন্ন জেলায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল ও পিকেটিং শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন জেলায় হরতালের কারণে দূরপাল্লার বাস ছাড়েনি। লঞ্চ চলাচল অন্যান্য দিনের চেয়ে কম ছিল। গতকাল ঢাকায় সন্ধ্যা ছয়টায় ২৪ ঘণ্টার হরতাল শুরুর পরপরই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে মশাল মিছিল শুরু হয়। এর আগে হরতালকারীদের খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নেয়। হরতাল আহ্বানকারী একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের এ হরতালে সমর্থন ও সংহতি জানানো ২৩টি সংগঠনের নেতাকর্মীরাও মিছিলে যোগ দেন। আরো আছে সাংগঠনিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের ব্লগার, রাজধানীর বিভিন্ন থিয়েটার কর্মী ও আবৃত্তি সংগঠনের সদস্যরা। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, বাসদ, যুব মৈত্রী, ছাত্র মৈত্রী, কাজী আরেফ ফাউন্ডেশন, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগের নেতাকর্মীরা। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, অধ্যাপক মুহম্মদ সামাদ, পথনাটক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি গণসঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর, কাজী মুকুল প্রমুখ বিশিষ্টজন। এর আগে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে ও হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ঠেকানোর দাবিতে শুক্রবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ (টিএসসি) থেকে মিছিল বের হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিলটি প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে তোপখানা রোড, পুরানা পল্টন মোড় হয়ে ফের প্রেসক্লাবের সামনে ফিরে আসে। সন্ধ্যা ছ’টার পর মশাল মিছিল শুরু হয়। হরতালের সমর্থনে মিছিল হয় শাহবাগ এলাকাতেও। আমরা মুক্তিযুদ্ধের সন্তান ব্যানারে হরতালের সমর্থনে মিছিল করেছে কয়েকশ’ মানুষ। এদিকে, শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২২ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। এছাড়া হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল ২৩টি সংগঠন তাদের আহূত হরতালের সমর্থনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচি পালন করে। আমাদের যশোর অফিস জানায়, হরতালের সমর্থনে গতকাল বিকালে যশোরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। শহরের চিত্রা চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চের সামনে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের যশোর জেলা সভাপতি হারুন-আর-রশিদ। সমাবেশে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও ৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। সমাবেশ শেষে ২৪ ঘণ্টা হরতালের সমর্থনে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। এর আগে হরতাল সফল করার লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন স্থানে মাইকিং ও প্রচারণা চালানো হয়। এদিকে গতকাল সকাল থেকে যশোর-ঢাকা রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সাধারণ যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। একই কারণে হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতাকর্মী লংমার্চে অংশ নেয়ার জন্য ঢাকায় পৌঁছাতেও ব্যর্থ হন। আমাদের রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যায় রাজবাড়ী শহীদ স্মৃতি চত্বরে হরতাল সফল করার জন্য এক সমাবেশ করেছেন সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীরা। এর আগে জোট সংগঠনগুলোর উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা চত্বর থেকে বের হয়ে বাজার প্রদক্ষিণ করে। পরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রাজবাড়ী জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ডাঃ সুনীল কুমার বিশ্বাস, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম রাজবাড়ী জেলা শাখার সভাপতি মোঃ মহসিন উদ্দিন বতু, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিনিধি বাবু মল্লিক প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। আমাদের নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ২৩ সংগঠনের ডাকে ২৪ ঘণ্টা হরতালের শুরুতে গতকাল নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করেন। বিকালে টাউন হল মোড়ে মঞ্চ তৈরি করে সড়ক অবরোধ করে তারা সমাবেশ শুরু করেন। সন্ধ্যার পর হরতালের সমর্থনে শহরে মশাল মিছিল বের করা হয়। শহরের প্রধান সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয় । এ সময় তারা সড়কের মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করেন। আমাদের নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে দূরপাল্লার কোন যানবাহন চলাচল করেনি। তবে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে যোগদানের জন্য অনেকেই টেম্পো এবং মাইক্রোবাস সংগ্রহ করে ঢাকার উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে একটি বিশাল মশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে বের হয়ে সারা শহর প্রদক্ষিণ করে আবার শহীদ মিনারে ফিরে আসে। এখানে এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নূরুল আমিন। আমাদের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হরতালের সমর্থনে সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কের মল্লিকপুরে টায়ার জ্বালিয়ে এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন প্রজন্ম সুনামগঞ্জের নেতাকর্মীরা। গতকাল বিকালে শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের মল্লিকপুরে গিয়ে সেখানে এক ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। এই সময় রাস্তার দুই দিকে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের প্রতিবাদে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামসহ ২৩ সংগঠনের ডাকা হরতাল সমর্থনে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করেছে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডসহ সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতৃবৃন্দ। মশাল মিছিলটি সন্ধ্যায় শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শহরের পোস্ট অফিস মোড়ে শহীদ রীমু চত্বরে এসে শেষ হয়। সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসনে জাহিদ জজ এর সভাপতিত্বে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইনামুল হক বিশ্বাস, অ্যাড. মোস্তফা লুত্ফুল্লাহ, আবুল কালাম আজাদ, ফহিমুল হক কিসলু প্রমুখ। বগুড়া প্রতিনিধি জানান, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ঠেকাতে ডাকা হরতালের সমর্থনে বগুড়ায় মশাল মিছিল ও সমাবেশ করেছেন প্রগতিশীল সকল সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। শুক্রবার সন্ধ্যায় শহরের সাতমাথা প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে বিশাল মশাল মিছিল বের করা হয়। প্রগতিশীল সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিলে অংশ নেন। মিছিলটি কবি নজরুল ইসলাম সড়ক হয়ে নবাববাড়ী সড়ক দিয়ে সার্কিট হাউজের মোড় হয়ে পুনরায় গণজাগরণ মঞ্চের সামনে এসে শেষ হয়। এরআগে বিকালে গণজাগরণ মঞ্চে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশ জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্চের সমন্বয়কারি মাছুদার রহমান হেলালের সভাপাতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, হরতালের সমর্থনে কুমিল্লায় প্রতিবাদী সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে গতকাল বিকালে নগরীর কান্দিরপাড়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি মহানগর শাখার উদ্যোগে একটি মিছিল নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে এবং পরে পূবালী চত্বরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ বক্তারা হেফাজতে ইসলামের লংমার্চকে প্রতিহত করতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ ২৭টি সংগঠনের ডাকা ২৪ ঘন্টার হরতাল যে কোন মূল্যে সফল করার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান। গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের রাজেন্দ পুর রেল স্টেশনে গতকাল সন্ধ্যায় যাত্রীবাহী জামালপুর কমিউটার-টু ট্রেন অবরোধ করেন হরতাল সমর্থকরা। তারা স্টেশন থেকে স্টেশনের মাস্টার ও কর্মচারীদের তাড়িয়ে দেন এবং ট্রেনের চালককে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ট্রেনটিতে এক হাজার হেফাজতে ইসলাম কর্মীসহ প্রায় ২ হাজার যাত্রী ছিলেন। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে স্টেশন অতিক্রমকালে হরতাল সমর্থকরা সিগনাল ক্লিয়ারেন্স না দিলে ট্রেনটি থেমে যায়। হরতাল সমর্থকরা স্টেশনে হামলা করলে কর্তব্যরত স্টেশন মাস্টার শাহাবউদ্দিন ফকির ও অন্যান্য স্টাফ পালিয়ে যান। পরে হরতালকারীরা চালককে ট্রেন থেকে নামিয়ে এনে স্টেশনে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ঘটনাস্থলে শ্রীপুর থানার পুলিশ এসআই রুকনুজ্জামান জানান, স্টেশন মাস্টারকে খোঁজা হচ্ছে। তাকে পাওয়া গেলে ট্রেন ছাড়ার ব্যবস্থা করা হবে। অবরোধের কারণে এ লাইনে বিভিন্ন স্টেশনে ৩টি ট্রেন আটকা পড়ে।