দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনকে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি) ঘোষণার পরই বেশকিছু সংকটে পড়ছে তারা। এই সংকট উতরে মার্কেটে নিজেদের মনোপলি ধরে রাখতে এশিয়ার বাজারে একত্রিত হচ্ছে দুই বৃহত্ টেলিকম কোম্পানি টেলিনর ও আজিয়াটা। গতকাল সোমবার বিষয়টি প্রকাশ করে টেলিনর গ্রুপ। তবে বাংলাদেশে টেলিনরের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন ও আজিয়াটার সহযোগী প্রতিষ্ঠান রবি এই মুহূর্তে একত্রিত না হলেও ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠান দুটি বিভিন্ন ইস্যুতে একসঙ্গেই চলবে। বাংলাদেশ ও ভারতে আজিয়াটার ব্যবসা পৃথক থাকছে। কিন্তু এই দুই জায়গাতেই টেলিনরের ব্যবসার মালিকানা পাচ্ছে আজিয়াটা গ্রুপ। ফলে গ্রামীণফোনের ২৫ শতাংশ মালিকানা চলে যাচ্ছে রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটার হাতে। আবার রবির সহযোগী প্রতিষ্ঠান টাওয়ার কোম্পানি ই-ডটকোর বড় অংশের মালিকানা পাচ্ছে টেলিনর।
এই একীভূতির ফলে বাংলাদেশে কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—জানতে চাইলে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কোনো কর্মকর্তাই মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে একজন কমিশনার ইত্তেফাককে বলেন, ‘বর্তমানে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৭ কোটি ৪০ লাখ, যা দেশের মোট মোবাইল ফোন গ্রহীতার ৪৬ শতাংশের বেশি। আর রবির গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ, যা দেশের মোট গ্রাহক সংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। দুই কোম্পানি মিলিয়ে তাদের শেয়ার ৭৬ শতাংশের বেশি হচ্ছে। ফলে এখানে একত্রিত না হলেও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে দুই অপারেটরই একসঙ্গে লড়বে। ফলে রেগুলেটরের পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। গ্রামীণফোনের মনোপলি ভাঙনে এসএমপি ঘোষণা হয়েছে। এখন সেটা ধরে রাখা কঠিন হবে।’
এ ব্যাপারে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা দুই কারণে হতে পারে বলে আমার মনে হচ্ছে। প্রথমত, রিলায়েন্স জিও বাংলাদেশে বাংলালিংকের মালিকানা নিতে যাচ্ছে এমন খবর আছে। ভারতের বাজারে রিলায়েন্স যেভাবে ব্যবসা করছে তাতে অন্যদের টিকে থাকা কঠিন। সেখানে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে টেলিনর ও আজিয়াটা হয়তো এই মার্জারের দিকে যাচ্ছে। আবার এমন হতে পারে— গ্রামীণফোনকে এসএমপি ঘোষণার পর তারা কিছু সংকটে পড়ছে। সেটা থেকে উত্তরণের জন্য আজিয়াটার সঙ্গে টেলিনর এক হচ্ছে। এই দুই কোম্পানির হাতে যে মার্কেট শেয়ার আছে, তাতে আবারও সেই মনোপলির দিকে যেতে পারে। গ্রাহকদের কম মূল্যে ভালো সেবা পাওয়ার যে বিষয়টি আছে, সেটাও হয়তো আর থাকবে না। তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। ফলে গ্রাহকের স্বার্থ ঠিক রাখা কঠিন হবে।’
গতকাল টেলিনর গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়, চুক্তি চূড়ান্ত হলে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে তারাই হবে নতুন কোম্পানির বড় অংশীদার। আর আজিয়াটার হাতে থাকবে বাকি ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার। নরওয়ের প্রতিষ্ঠান টেলিনর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক। আর গ্রাহক সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মোবাইল ফোন অপারেটর রবির ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ শেয়ারের মালিক মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা গ্রুপ বারহাদ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই কোম্পানির এশিয়ায় ব্যবসা একীভূত হলেও বাংলাদেশে আলাদা কোম্পানি হিসেবে স্বাধীনভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাবে রবি এবং এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে আজিয়াটার হাতে।
জানা গেছে, এই মার্জারের ফলে এশিয়ায় দুই কোম্পানির টেলিকম ব্যবসা ও অবকাঠামো মিলিয়ে নতুন একটি কোম্পানি গঠন করা হবে। সেক্ষেত্রে নয়টি দেশে ৩০ কোটি গ্রাহক নিয়ে নতুন ওই কোম্পানি হবে এশিয়ার টেলিকম খাতের অন্যতম বৃহত্ শক্তি। মার্জার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পাকিস্তান ও মিয়ানমারে টেলিনরের ব্যবসার মালিকানা পাবে আজিয়াটা। যদিও এখন সেখানে আজিয়াটার কোনো ব্যবসা নেই। অন্যদিকে কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে টেলিনরের কোনো ব্যবসা না থাকলেও তারা মালিকানা পেতে যাচ্ছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় দুই কোম্পানি একীভূত হতে যাচ্ছে।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, টেলিযোগাযোগ ব্যবসায় একক আধিপত্য তৈরির পথ বন্ধ করতে গত বছরের শেষ দিকে ‘সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার’ বা এসএমপি প্রবিধানমালা জারি করে বাংলাদেশের টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। এরপর গ্রামীণফোনকে এসএমপি ঘোষণা করা হয়, যার ফলে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রামীণফোনের স্বতন্ত্র ও একক স্বত্বাধিকারের নতুন কোনো চুক্তি করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। এখন এই মার্জারের ফলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে সেটার জন্য অপেক্ষা বাড়ছে।
এদিকে রবির পক্ষ থেকে গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়, টেলিনর ও আজিয়াটা এশিয়ার বাজারে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম একীভূত করার আলোচনা শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। তবে রবি সম্ভাব্য এ প্রক্রিয়ার অংশ নয়। ফলে বাংলাদেশের মোবাইল টেলিকম মার্কেটে কোনো সরাসরি প্রভাব ফেলবে না। রবিতে বর্তমানে আজিয়াটার ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ভারতীয় এয়ারটেলের ২৫ শতাংশ এবং এনটিটি ডোকোমোর ৬ দশমিক ৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
