অস্ত্রবাণিজ্য রোধে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত জাতিসংঘে

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৫
প্রথাগত অস্ত্রের বিপুল বাণিজ্যে রাশ টানিয়া ধরিবার পথে যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে নানান হতাশা, নানান ব্যর্থতা, নানান সমালোচনাতে বিদ্ধ বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘে। বুধবার প্রথাগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রস্তাবটির উপরে সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে বিষ্ময়করভাবে ১৫৪টি রাষ্ট্র পক্ষে ভোটদান করিয়াছে। হিংসা-উন্মত্ত সভ্যতার এই যুগে জাতিরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে এহেন সুবিবেচনাবোধের উন্মেষ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইবার ব্যাপারে শান্তিকামী মানুষকে আশাবাদী করিয়া তুলিবে সন্দেহ নাই। প্রস্তাবের বিপক্ষে তিনটি এবং ভোটদানে বিরত থাকিয়াছে ২৩টি রাষ্ট্র। নিয়মানুসারে, জাতিসংঘ এখন জাতিরাষ্ট্রসমূহকে সদ্য-গৃহীত চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করিয়া লইবার জন্য অনুরোধ করিবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ৫০টি রাষ্ট্র চুক্তিটিকে গ্রহণ করিয়া লইলেই ইহা আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা পাইয়া যাইবে। চুক্তিটি কার্যকর হইয়া গেলে, জাতিরাষ্ট্রগুলির প্রত্যেককে নিজ এখতিয়ারভুক্ত প্রত্যেকটি প্রথাগত অস্ত্র বাণিজ্যের হিসাব নিকাশ রাখিতে হইবে। এবং একই সাথে নিশ্চিত করিতে হইবে যে, প্রথাগত অস্ত্রের বাণিজ্যটি শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করিবে না এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন উসকাইয়া দিবে না। এতদিন ধরিয়া পরমাণু, রাসায়নিক ও জীবণু অস্ত্রের উপরে এতদ্ববিধ নজরদারি চালু থাকিলেও, জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাবনাটি বাস্তবায়িত হইলে ক্ষুদ্র অস্ত্র, হালকা মারণাস্ত্র, কামান, সাঁজোয়া যান, সামরিক জেট, রণতরী এবং মিসাইলের মত প্রথাগত অস্ত্রাদিও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলিয়া আসিবে। প্রথাগত অস্ত্রের বাজারটি বিশাল; বত্সরে ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রথাগত অস্ত্রের এই বাণিজ্যের দৌরাত্ম্যে কেবল দেশে-দেশে অগণিত প্রাণহানিই ঘটিতেছে তাহা নহে, এই বাণিজ্য নানান দেশের রাজনীতিকে করিয়াছে কলুষিত, এমনকি কথিত আছে যে, এই বাণিজ্য অনেক দুর্বল রাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল পর্যন্ত ঘটাইয়া ফেলিতে ভূমিকা রাখে। প্রথাগত অস্ত্রের ব্যবহার দ্বারা মানবাধিকারের অবিরাম লঙ্ঘন প্রসঙ্গটিও উল্লেখ্যযোগ্য। প্রথাগত অস্ত্রবাণিজ্যের উপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়টি লইয়া জাতিসংঘ অনেকদিন ধরিয়া চেষ্টা-চরিত্র চালাইয়া যাইতেছিল। কিন্তু শক্তিমান রাষ্ট্রগুলির নানান সমীকরণের কারণে সাফল্যের মুখ দেখিতেছিল না। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনী বত্সরে অস্ত্র-লবির বিরাগভাজন হইবার ভয়ে কাতর ওবামা প্রশাসনের অনীহার মুখে ২০১২ সালের উদ্যোগ মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছিল। এইবার তেমন কিছু হয় নাই। জার্মানী, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের মত বৃহত্ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের মত উদীয়মান অস্ত্র ব্যবসায়ী রাষ্ট্রগুলিও শুভবোধের পরিচয় দিয়াছে। ইরান, সিরিয়া ও উত্তর কোরিয়া এই তিন দেশ জাতিসংঘের প্রথাগত অস্ত্রবাণিজ্যে রাশ টানিয়া ধরিবার প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান লইয়াছে। তবে ইতিমধ্যে জাতিসংঘের নানাবিধ অবরোধের মধ্যে থাকা এই তিন দেশ, এমনকি রাশিয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের ভোটদানে বিরত থাকিবার বিষয়টি বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করিতে পারিবে বলিয়া মনে হয় না। বরং প্রথাগত অস্ত্রের বাণিজ্য রোধের উদ্যোগটিই সারা বিশ্বে নন্দিত হইবে। মানব জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগটির অবশ্য উল্লেখযোগ্য একটি সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে। সীমাবদ্ধতাটি এই যে, প্রথাগত অস্ত্রের বাণিজ্য সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনটি লঙ্ঘিত হইতেছে কিনা তাহা নজরদারি করিবার কোন ক্ষমতা জাতিসংঘের হস্তে থাকিবে না। সীমাবদ্ধতা থাকিলেও ইহা কিন্তু সম্পূর্ণ নিরাশ হইয়া পড়িবার মত বিষয় নহে। কেননা আন্তর্জাতিক আইনটির লঙ্ঘন করা হইলে দেশের ভিতরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কঠোরভাবে সমালোচিত হইবার ভীতি থাকিবে। আশা করা যায় যে, অস্ত্রবাজ-যুদ্ধবাজ শাসকেরা এই ভীতি দ্বারা তাড়িত হইয়া এতদিনকার ন্যায় প্রথাগত অস্ত্রের বাণিজ্যের যথেচ্ছাচার হইতে কিছুটা হইলেও বিরত থাকিতে বাধ্য হইবে।