প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর কোনো সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার প্রাথমিকভাবে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন তারই অন্যতম একটি হলো রক্তচাপ বা ব্ল¬াডপ্রেশার মাপা। সাধারণত আমরা এই যন্ত্রটিকে ব্ল¬াডপ্রেশার মেশিন নামে চিনলেও এর মূল বৈজ্ঞানিক নাম ছিল ফিগমোম্যানোমিটার। গ্রিক শব্দ ‘ফিগমোস’-এর অর্থ হলো নাড়ি বা পালস। ধমনীর ভেতর দিয়ে চলতে থাকা রক্ত ধমনীর দেওয়ালে যতটা চাপ দেয় সেটাই হলো রক্তচাপ। ১৭০৮ সালে জীবদেহে রক্তচাপের প্রথম উপস্থিতি আবিষ্কার করেছিলেন স্টিফেন হেলস নামে একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক। ধর্ম চর্চার পাশাপাশি মানবদেহে রক্ত সঞ্চালনের রহস্য নিয়ে তীব্র অনুসন্ধিত্সা ছিল স্টিফেনের। ১৭৩৩ সালে রক্তচাপ মাপার জন্য অদ্ভুত একটা পরীক্ষা করেন স্টিফেন হেলস। একদিক ছোট অন্যদিক প্রায় চলি¬শ ফুট লম্বা ‘ইউ’ আকারের ফাঁপা কাচের নলের ছোট দিকটাকে ছুঁচালো করে ছটফটে এক ঘোড়ার গলার ধমনীতে প্রবেশ করিয়ে দেন তিনি। এতে তিনি দেখলেন এ নলের বিপরীত স্তম্ভ বেয়ে রক্ত উঠে যাচ্ছে ন’ফুট উঁচুতে। তারপর কেটে যায় প্রায় দেড়শ বছর। ১৮৫৩ সালে জার্মান চিকিত্সক কার্ল ভল ভিরোট আবিষ্কার করেন নাড়ির গতি, চাপ আর এ সংক্রান্ত সমস্যা লিপিবদ্ধ করাবার যন্ত্র ‘ফিগমোগ্রাম’। পরের বছরই তিনি রক্তচাপ মাপার একটি যন্ত্রও তৈরি করেন। এ যন্ত্র ব্যবহারে অনেক জটিলতা থাকলেও এটাই পৃথিবীর প্রথম রক্তচাপ মাপার যন্ত্র। অন্যদিকে প্রথম কার্যকর ফিগমোম্যানোমিটার আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় জার্মান চিকিত্সক স্যামুয়েল ভন বাখকে। ডা. বাখের তৈরি যন্ত্রে পাতলা রবারের তৈরি একটা পানি ভরা পানির সঙ্গে জোড়া থাকত কাচের পারদ ভর্তি সরু লম্বা নল বা মার্কারি ম্যানোমিটার। পাতলা বলটাকে রোগীর কনুইয়ে পালসের উপর রেখে চাপ দিতেন ডা. বাখ। অন্য হাত থাকত রোগীর কব্জির রেডিয়াল পালসে। নাড়ির স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে ম্যানোমিটারের পারদের উচ্চতা দেখে বাখ রক্তচাপ মাপতেন। বর্তমানে যে গোলাকার ঘড়ির মতো দেখতে এক কাঁটাওয়ালা যন্ত্র দিয়ে চিকিত্সকরা রক্তচাপ মাপেন সেটার নাম ‘অ্যানিরয়েড ফিগমোম্যানোমিটার’ যার আবিষ্কারক ফরাসি চিকিত্সক প্যিয়ের কার্ল পোঁটে। এ ছাড়া ১৮৯৬ সালে আরও উন্নত ফিগমোম্যানোমিটার তৈরি করেন জার্মান চিকিত্সক সিপিয়ন রিভারোক্কি। এতে ফিতের দু’ভাজ কাঁপড়ের মধ্যে থাকত হাওয়া ভরা একটা আয়তাকার ব্যাগ। এ ফিতে বা ‘প্রেশার কাফ’ জড়ানো হতো রোগীর হাতে। সহজে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় ডা. রিভারোক্কির তৈরি যন্ত্রটি বিভিন্ন দেশের চিকিত্সকদের কাছে পৌঁছে যায়। তবে বাখ ও পোঁটের যন্ত্রের মতো তার যন্ত্রটিও শুধু হূদপিণ্ডের সঙ্কোচনের সময়ের সিস্টোলিক রক্তচাপ মেপে দিত। সিস্টোলিকের সঙ্গে সঙ্গে ধমনীর ডায়স্টোলিক রক্তচাপ মাপার প্রথম যন্ত্র তৈরি করেন রাশিয়ার চিকিত্সক নিকলাই কোরোটকফ। বিংশ শতাব্দীর প্রথমেই ডা. কোরোটকফ এ যন্ত্রটি চিকিত্সকদের হাতে তুলে দেন। এভাবে প্রায় দুশ বছর আগে ধর্মযাজক স্টিফেন হেলস যে রক্তচাপ আবিষ্কার করে মাপতে চেয়েছিলেন তাই আজ নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে রক্তচাপ মাপার যন্ত্র ফিগমোম্যানোমিটার হিসেবে রোগীদের চিকিত্সার কাজে ব্যবহূত হচ্ছে।
