আর মাত্র একটা স্কুলে পড়তে পারলেই আধা ডজন স্কুল নামে তিনিও লিখে ফেলতে পারতেন তার শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতাগুলো। বাবার বদলির চিন্তা থাকলেও নাজিম খুব উত্সাহ নিয়েই বসে থাকতেন নতুন শহরে যাবেন, নতুন নতুন বন্ধু হবে এমন ভাবনায়। একসময় এসে বাবার বদলির নৌকা ভিড়ল উত্তরবঙ্গের শিল্পশহর বগুড়ায়। নাজিম এসএসসি আর এইচএসসি দেন বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। তারপর নাজিম ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কথাটা একলাইনে লিখে ফেললেও সেই সময় কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই তাকে সুযোগ করে নিতে হয়েছিল সেখানে। এতদিন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী থাকলেও এবার তার পড়ার বিষয়টা ইংরেজি। অনেকেই হয়তো এরকম অবস্থায় পিছু হটে। কিন্তু নাজিমের কিছুই মনে হয়নি। তার চিন্তা ছিল বিষয় যাই হোক, পড়াশোনাটা ঠিকঠাক হলেই চলবে। জানিয়ে দিই, খুব ভ্রমণপ্রিয় আর আড্ডাবাজ মানুষ তিনি। ছাত্রজীবনেও তেমনটা ছিলেন বলাই বাহুল্য। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানেই জীবন আড্ডায় মুখর থাকবে সব সময়। সবমিলিয়ে ভর্তি হয়েই গেলেন নাজিম। স্নাতক শেষ করেই আইবিএ থেকে এমবিএ করে ফেলেন তিনি। সেটা তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত হলেও এখন বিপণন এবং ব্যবস্থাপনায় অনেক সাহায্য করে সেই অভিজ্ঞতাগুলো। এমবিএ শেষ করে তার মনে হলো হয়তো বিজনেস প্রমোশন অথবা মার্কেটিং নিয়ে কাজ করার দক্ষতাটা তার রয়েছে। চাইছিলেন এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন।
সময়টা ২০০১ সালের দিকে হবে। যোগ্যতা দিয়েই সরাসরি ব্যবসায় শিক্ষার ছাত্র না হয়েও নাজিম সুযোগ পেয়ে গেলেন বেক্সিমকো ফার্মাতে। বেক্সিমকো তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট হাউজগুলোর কাতারে। প্রোডাক্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। বছর দুয়েক সেখানে কাজও করেন। বড় পরিসরের এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার বড় প্রাপ্তি। তেমনি সময়ে বিগত দশকের শুরুর দিকে তিনি চলে এলেন মেটলাইফ আলিকো-তে। এটা আবার ইনসিওরেন্স কোম্পানি। কিন্তু নাজিমের তাতে কিছুই যায় আসে না! অভিযোজন ক্ষমতাটা যে তার দারুণ, সেটা বুঝতে পেরেছেন আগেই। কাজের ক্ষেত্রটা এখানেও মার্কেটিং কেন্দ্রিক। প্রায় তিন বছর নাজিম এখানে মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নাজিমের পরের ক্যারিয়ারটা আরও বর্ণিল। তিনি যোগ দেন ইস্টার্ন ব্যাংকে। ব্যাংকিংয়ে কাজের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এখানে তার অভিজ্ঞতার আলোকে কতটা পথ পাড়ি দিবেন তিনি? সেই সময়ে এই ভাবনাটা যে হয়নি তা না। নাজিম ভেবেছিলেন, ফলাফল নিয়ে ভাবব না, শুধুই সাধ্যের সবটুকু দিয়ে পালন করতে চাই যেকোনো দায়িত্ব। বাহ্যিক দূরদর্শিতা নয়, আস্থা রাখেন তিনি অন্তঃস্থ সামর্থ্যে। এমনই এক পরিস্থিতিতে দেশের প্রথম সারির এই ব্যাংকটার হেড অব মার্কেটিং হয়ে আসেন তিনি। এরপর ২০১০ সালে কার্ড বিভাগের প্রধান। এখন দায়িত্ব পালন করছেন হেড অব বিজনেস হিসেবে। পদবি বিবেচনায় সেটা এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট।
নাজিম এ চৌধুরীর এই পথ পরিক্রমাটাই বলে দেয়, ব্যাংকিং মাধ্যমে এসে কতটা মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন মাধ্যমেই কাজ করেছেন তিনি। এরপরেও বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ব্যাংকেই। কেন এমনটা? হাসতে হাসতে বলেন, কারণ এখানে চ্যালেঞ্জ আছে। সব সময় একটা পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় চলতে হয়। নাজিম এই জিনিসটা উপভোগ করেন বলেই হয়তো দারুণ পালন করতে পারেন দায়িত্বটা। নাজিমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তার কাজের পরিবেশটা তিনি কীভাবে গুছিয়ে নেন? জানালেন প্রথমত, তিনি টিম নিয়ে কাজ করতে স্বাছন্দ্যবোধ করেন, অথবা কাজের খাতিরেই টিমকে গড়ে তুলতে হয় সেভাবে। দ্বিতীয়ত, সরাসরি গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে হয় এ ধরনের কাজে। গ্রাহকদের দেওয়া যেকোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা অথবা অনুরোধ বা অভিযোগ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা খুবই প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নিজের যোগাযোগ দক্ষতাটা খুব পোক্ত হওয়া চাই, সেটা ব্যাংকের একজন কর্মচারী থেকে শুরু করে গ্রাহক হতে আসা ক্লাস টু-এ পড়ুয়া ছেলেটার সাথেও।
নাজিম কথাবার্তাতেই জানান দেন, খুব যে পরিশ্রম করতে হবে তা না, তবে যেটুকু করবেন, সেটা যেন ভালোবাসা থেকে করা হয়। তিনি বলেছেন দক্ষ একটা টিমের সাথে কাজ করতে হয় তাদের। কী যোগ্যতা থাকা দরকার কর্পোরেট টিমের একজন সদস্য হতে গেলে? এটারও কিছু মূল বিষয় আছে, জানালেন নাজিম। প্রথমত, একাডেমিক দিকটাতে খুব ভালো না হোক অন্তত বিষয়গুলোর উপর স্বচ্ছ ধারণা থাকা চাই। দ্বিতীয়ত স্মার্ট হতে হবে খুব। স্মার্টনেসের সংজ্ঞা আসলে কী? সবার একটাই চাওয়া সব ক্ষেত্রেই। এটা আসলে একজনের কথাবলা, চালচলন, বিরূপ পরিস্থিতিতে সামলে নেওয়ার প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব, পণ্য বা সেবাটার সঠিক উপস্থাপন, গ্রাহক সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ দক্ষতা, অর্জিত জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ, কাজের চাপ সামলে নেওয়া সবকিছুর সমন্বয়।
নাজিম মনে করেন, এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি সচেতন, তাদের অনেক জানাশোনা আর কাজ দেখার সুযোগ রয়েছে। একাডেমিক বিষয় আর এই গুণগুলোর সমন্বয় যিনি ঘটাতে পারেন, তার জন্য অনেক সহজ কর্পোরেট দুনিয়ায় পথচলা। সাধারণত কাজ করতে করতেই নিজের দায়িত্ববোধটা জন্ম নেয়, জানা যায় অনেক কিছু। তাদের চাওয়ার সাথে এই প্রজন্মের কাজের ফারাকটা কেমন? জানতে চাইলে নাজিম বলেন, এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় গুণ তাদের গ্রহণ ক্ষমতা অনেক বেশি। প্রযুক্তির যেকোনো বিষয় তারা খুব সহজে বুঝে যায়, আর সেটা এই সময়ে কতটা জরুরি সেটা বোধকরি নতুন করে বলার কিছু নেই।
নাজিম এ চৌধুরী কথার এক পর্যায়ে জানালেন, আন্তর্জাতিক বিবেচনায় ব্যাংকিংটা প্রাথমিক পর্যায়ে এ দেশে। দিনকে দিন আমরা অগ্রসরমান ধাপে যাচ্ছি। আর যতই দিন যাবে, এ ক্ষেত্রে তাই নতুন নেতৃত্বের দরকার হবে। এই প্রজন্মের উপরেই এই জন্য আস্থা রাখতে হবে, সুতরাং কাজের যেমন অপার সুযোগ থাকবে, থাকবে বর্ণিল ক্যারিয়ারের হাতছানিও। শুধুই সত্ভাবে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। খোঁজখবর থাকতে হবে আশপাশের সবকিছুর প্রতি। জানলাম এই বিষয়গুলোর প্রতি প্রজন্মের জোর দেওয়া উচিত, কিন্তু সেটা কীভাবে? নাজিম মনে করেন, কাউকে পড়াশোনাটা শিখিয়ে দেওয়া যায়, নীতিমালাগুলো বুঝিয়ে দেওয়া যায় কিন্তু ব্যক্তিগত গ্রুমিংটা কী আদৌ শেখানো যা কাউকে? তারাই এগিয়ে থাকবে যারা নিজ উদ্যোগে নিজেকে তৈরি করে নেবে। কাজের জগত্টা অনেক প্রতিযোগিতামূলক, কেউ কারও জন্য বসে থাকবে না। সত্যি বলতে কী, প্রতিষ্ঠানটার টিকে থাকার জন্য এ রকম লোকজনকেই দরকার যারা কিনা নিজের মতো করে সেটা চালিয়ে নেবে। আর এগুলোর বিস্তর পড়াশোনার সুযোগ তো রয়েছেই ইন্টারনেটে। সবকিছু যখন হাতের মুঠোয়, বহুদূর স্বপ্ন দেখা নিশ্চয়ই দোষের না।
বহুমাত্রিক গুণের এই মানুষটা কাজের জগতে যতটাই আন্তরিক, তেমনি পারিবারিক জীবনেও। বাবা নাজমুল হক চৌধুরী ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মা আনোয়ারা বেগম একজন গৃহিণী। দুই ভাইয়ের মাঝে তিনি বড়, ছোটজনও কর্পোরেট দুনিয়ার মানুষ। তাদের সবাইকে ছেড়ে বাবা পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। স্ত্রী সামিরা সাঈদ তার ব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি একটি অনলাইন বুটিকের স্বত্বাধিকারী। তাদের একমাত্র সন্তান যায়ান সামি চৌধুরী সানিডেল এ পড়ছে, নার্সারিতে। তাকে নিয়েইও কেটে যায় তার অবসর। সময় পেলেই বাপ-বেটা প্রিয় সাইকেল নিয়ে নেমে আসেন রাস্তায়। দুই প্রজন্মের এই যে মেলবন্ধন আর আত্মার সম্পর্ক, এটা নিঃস্বার্থ। এই স্বপ্নেই তো আমরা হেঁটে চলি সম্ভাবনার পথে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
