বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) হূদরোগ চিকিত্সায় অত্যাধুনিক ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে। শংকটাপন্ন রোগীদের জন্য গতকাল সোমবার ৪১ বেডের করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) চালু করা হয়েছে। চালু হচ্ছে ৬০ বেডের অত্যাধুনিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)। হূদরোগীদের সব ধরনের অপারেশন ও চিকিত্সার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এতো বড় পরিসরে হূদরোগের চিকিত্সা ব্যবস্থা জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ছাড়া দেশের আর কোন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নেই।
বিএসএমএমইউ’র অন্য সব বিভাগও আধুনিক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রশাসনের প্রধান যদি সত্ ও নিষ্ঠাবান হন তাহলে সীমিত সম্পদের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটির উন্নতি করা সম্ভব। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের আন্তরিক প্রচেষ্টার কারণে এই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়টি সাধারণ মানুষের চিকিত্সা সেবায় ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। হয়ে উঠেছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম প্রধান বিশেষায়িত চিকিত্সা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
আগে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষায় দুর্নীতি ও সরকার দল সমর্থক নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার ভুরিভুরি অভিযোগ ছিল। ক্রয় ও নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগও কম ছিল না।
বর্তমান প্রশাসনের সময় আটটি ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নিয়ে নেতারা কোন ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। পাওয়া যায়নি কোন দুর্নীতির অভিযোগ।
এই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা প্রতিদিন বিকালে বহির্বিভাগে অল্প টাকায় চিকিত্সা সেবা দিয়ে আসছেন। দেশের খ্যাতনামা নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, মেডিসিনের কিংবদন্তিতুল্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ও হূদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সজল ব্যানার্জির মত চিকিত্সকরাও বহির্বিভাগে নিয়মিত চিকিত্সা সেবা দিয়ে আসছেন। এটা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল নতুন আরো ১৬ বেডের সিসিইউ এবং ৫ বেডের ইনটেনসিভ সিসিইউসহ ২১ বেডের অত্যাধুনিক সিসিইউ চালু হয়েছে। এর আগে বিএসএমএমইউতে ২০ বেডের সিসিইউ ছিল। নতুন করে আরো ২১ বেডের সিসিইউ চালু হওয়ায় শংকটাপন্ন হূদরোগীদের চিকিত্সায় নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। আর এটি হলো দেশের সবচেয়ে বড় সিসিইউ। এর ফলে এ ধরনের রোগী নিয়ে হয়রানি ও দুর্ভোগ অনেক কমে যাবে। আরো ৫শ বেডের পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক সেন্টার চালুর কার্যক্রম চলছে। ২৪ ঘণ্টা হূদরোগীদের জন্য জরুরি চিকিত্সাসেবা চালু হয়েছে। বিএসএমএমইউর বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার পর ৫ বেডের আইসিইউ পেয়েছিল। এটিকে সম্প্রসারণ করে ১৬ বেডে উন্নীত করেছে। ২৫ ভাগ বেড সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সংকটাপন্ন কিংবা মরণাপন্ন রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে কৃত্রিম উপায় শ্বাস-প্রশ্বাসসহ অত্যাধুনিক চিকিত্সা সেবা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার সুবিধা ছিল সীমিত পর্যায়ে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৯৮ ভাগে কোন আইসিইউ নেই। গুরুতর রোগীদের আইসিইউতে বেড পাওয়া যে কতোটা কঠিন বাস্তবে কেউ এই পরিস্থিতিতে না পরলে বোঝা যাবে না। বিএসএমএমইউতে আলাদা পূর্ণাঙ্গ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সজ্জিত ৬০ বেডের আইসিইউ প্রতিষ্ঠা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়। জুলাই মাসের প্রথমদিকে এটি চালু হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানান। আরও নতুন আধুনিক ও সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্মিলিত ২৭টি অপারেশন থিয়েটার চালু করা হয়েছে।
শংকটাপন্ন রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য ৪০ বেডের আলাদা আইসিইউ চালু আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্রেনডেথ রোগী কিংবা মৃত্যু নিশ্চিত এ ধরনের রোগীদের যন্ত্রণামুক্ত রাখার জন্য ১৮ বেডের পলিয়েটিভ বা টার্মিনাল কেয়ার চালু করা হয়েছে। এ রোগীদের বাসায় রেখে পরিচর্যা করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। কষ্ট পেয়ে রোগীর মৃত্যু হওয়ার চেয়ে টার্মিনাল কেয়ারে এ ধরনের রোগীদের ভর্তি করা হলে তারা সুচিকিত্সা পেয়ে যন্ত্রণামুক্তভাবে মারা যেতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান।
গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ব্যবস্থা চালু আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আছে ডিজিটাল লাইব্রেরি। এক সঙ্গে ৪০ জন চিকিত্সক ইন্টারনেট ও কম্পিউটারসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন লাইব্রেরিতে।
গতকাল বিএসএমএমইউর কার্ডিওলজি বিভাগে অত্যাধুনিক সিসিইউ ও ক্যাথল্যাব উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তারা হূদরোগের চিকিত্সা ব্যবস্থা উন্নয়নে বিস্তারিত তুলে ধরেন। কার্ডিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ আবু সিদ্দিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি বিএসএমএমইউর ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লা, প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. মোঃ রুহুল আমিন মিয়া, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোঃ জলুফিকার রহমান খান, বেসিক চিকিত্সা অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. ইকবাল আসর্লান, চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ, কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সজল ব্যানার্জি, অধ্যাপক ডা. কেএমএইচ সিরাজুল হক, বিএসএমএমইউর হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল মজিদ ভুঁইয়া, কার্ডিওলজিস্ট ডা. এসএম মোস্তফা জামান ও ডা. হারিসুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
